০৯ মার্চ ২০২১
`

ক্যাপিটল ভবনে ধারাল কাঁটাতারের বেড়া

যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে একুশ সহস্রাধিক নিরাপত্তা কর্মী মোতায়েন ; শপথের আগেই হোয়াইট হাউজ ছাড়বেন ট্রাম্প ; ট্রাম্পের কাছে ‘সামরিক শাসন’ জারির প্রস্তাব
-

নবনির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের শপথ অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। আবারো উগ্রপন্থী ট্রাম্প সমর্থকদের সহিংসতার আশঙ্কা থাকায় যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে বিপুল সেনা মোতায়েন করা হয়েছে। ক্যাপিটল ভবনের নিরাপত্তায় বসানো হয়েছে কাঁটাতারের বেড়া। এ দিকে আগামী বুধবার শপথের দিন সকালে হোয়াইট হাউজ ত্যাগ করবেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। খবর নিউ ইয়র্ক টাইমস, রয়টার্স ও সিএনএনের।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের উগ্রবাদী সমর্থকদের হুমকি থাকায় বাইডেনের শপথ অনুষ্ঠান নির্বিঘœ করতে ওয়াশিংটন ডিসিসহ যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে স্মরণকালের নিñিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। ইরাক-আফগানিস্তানে মোতায়েন থাকা সেনার চেয়েও বেশিসংখ্যক বিভিন্ন বাহিনীর সদস্য এখন পাহারা দিচ্ছে রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিসহ অঙ্গরাজ্যগুলোর পার্লামেন্ট ভবন। সব গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ঘিরে রেখেছে ২১ হাজারের বেশি ন্যাশনাল গার্ড বাহিনীর সদস্য।
ট্রাম্পের টালমাটাল রাজত্বের সমাপ্তি আর ৪৬তম মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে জো বাইডেনের অভিষেক অনুষ্ঠানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা তদারকি করছেন বিদায়ী ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স। মাইক পেন্স বলেন, ‘নিয়মতান্ত্রিক ও নিরাপদ ক্ষমতা হস্তান্তরে আমরা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস-ঐতিহ্য এবং জনগণের ভোটাধিকারের মর্যাদা সমুন্নত রাখতে জো বাইডেন ও কমলা হ্যারিসের শপথ অনুষ্ঠান যেন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়, তা নিশ্চিত করাই এখন আমাদের প্রধান কাজ।’
ক্যাপিটল ভবনে তাণ্ডবের পর ধরপাকড় অব্যাহত রেখেছে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই। উগ্রপন্থীদের কড়া বার্তা দিয়েছেন সংস্থাটির প্রধান। এফবিআইর পরিচালক ক্রিস রে বলেন, ‘যারা আবারো সহিংসতার ইচ্ছা পোষণ করছেন, আগের অপরাধীদের পরিণতির কথা মাথায় রাখবেন। এফবিআইর হাত থেকে কোনো উগ্রপন্থীই রেহাই পায়নি। শপথ অনুষ্ঠান বানচালের অপচেষ্টা রুখে দিতে আগ্রাসী ভূমিকায় থাকবে এফবিআই।’
বাইডেনের শপথ গ্রহণের আগে লকডাউন থাকবে গোটা ওয়াশিংটন ডিসি। মহামারীর কারণে আগের মতো জাঁকজমকপূর্ণ হচ্ছে না বাইডেনের অভিষেক। বাতিল করা হয়েছে ঐতিহ্যবাহী প্যারেড অনুষ্ঠান ও মহড়া। সীমিত অনুষ্ঠানে প্রথমবারের মতো কবিতা পাঠ করবেন কবি আমান্ডা গোরম্যান। জাতীয় সঙ্গীত শোনা যাবে জনপ্রিয় গায়িকা লেডি গাগার কণ্ঠে। সুরের মূর্ছনায় মাতাবেন আরেক বিখ্যাত শিল্পী জেনিফার লোপেজ।
বাইডেন শপথ নেয়ার আগেই হোয়াইট হাউজ ছাড়বেন ট্রাম্প : মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে জো বাইডেন শপথ নেয়ার আগেই হোয়াইট হাউজ ছাড়বেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এ ছাড়া শপথ অনুষ্ঠানেও ট্রাম্প থাকছেন না। একজন কর্মকর্তা শুক্রবার এ কথা জানিয়েছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা আরো জানান, আগামী বুধবার নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্টের শপথের দিন সকালেই ট্রাম্প হোয়াইট হাউজ ছাড়বেন। যদিও এর আগে তিনি শপথের আগের দিন মঙ্গলবারই ওয়াশিংটন ডিসি ছাড়ার পরিকল্পনা করেছিলেন।
সূত্রটি আরো বলেছে, ট্রাম্প তার বিদায়ী অনুষ্ঠান ওয়াশিংটনের বাইরের ঘাঁটি জয়েন্ট বেইজ অ্যান্ড্রুজে করার পরিকল্পনা করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে বহনকারী উড়োজাহাজ এয়ারফোর্স ওয়ানের সদর দফতর এই ঘাঁটিতে। জয়েন্ট বেইজ অ্যান্ড্রুজে বিদায়ী অনুষ্ঠান শেষে ট্রাম্প ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের পাম বিচে উড়ে যাবেন। সেখানে মার-এ-লাগো রিসোর্টে তিনি তার পরবর্তী জীবন শুরু করবেন।
এ দিকে রীতি অনুযায়ী হোয়াইট হাউজের ওভাল অফিসে জো বাইডেন ও তার স্ত্রী জিল বাইডেনকে চা চক্রে আমন্ত্রণ জানানোর প্রটোকলও ভাঙতে যাচ্ছেন ট্রাম্প। তবে শপথ নেয়ার আর মাত্র পাঁচ দিন বাকি থাকতে বিদায়ী ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স নতুন ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিসকে শুক্রবার টেলিফোনে অভিনন্দন জানিয়েছেন। নির্বাচনের দুই মাসেরও বেশি সময় পর কমলা হ্যারিসকে অভিনন্দন জানিয়েছেন পেন্স এবং তাকে সহায়তারও আশ্বাস দিয়েছেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বাইডেন প্রশাসনকে প্রথম দিন থেকেই বহুবিধ সঙ্কট মোকাবেলা করতে হবে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হোঁচট খাওয়া জাতীয় টিকাদান প্রকল্প, ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনরুদ্ধার এবং সিনেটে ট্রাম্পের অভিশংসন প্রক্রিয়া চালিয়ে নেয়া। হোয়াইট হাউজের নতুন প্রেস সেক্রেটারি জেন পাসাকি শুক্রবার সাংবাদিকদের বলেছেন, কেবিনেটের নিয়োগ নিশ্চিতের পাশাপাশি অভিশংসন প্রক্রিয়া চালিয়ে নিতে সিনেট সক্ষম।
ট্রাম্পের কাছে ‘সামরিক শাসন’ জারির প্রস্তাব : মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থক এক ব্যবসায়ী হোয়াইট হাউজে তার সাথে দেখা করতে যাওয়ার সময় কি সামরিক শাসন জারির প্রস্তাব নিয়ে যাচ্ছিলেন? ওয়াশিংটন পোস্টের একজন স্টাফ ফটোগ্রাফার এই ব্যবসায়ীর হাতে ধরা কাগজপত্রের যে ছবি তুলেছেন, সেটি দেখে সোশ্যাল মিডিয়ায় সে রকম আলোচনাই চলছে। সব বড় বড় মার্কিন সংবাদপত্রে আজ এ খবরটি বেশ ফলাও করে প্রকাশিত হয়েছে। খবর বিবিসির।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাথে দেখা করতে যাওয়া এই ব্যবসায়ীর নাম মাইকেল লিন্ডেল। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ‘মাই পিলো’ বলে একটি কোম্পানির প্রধান নির্বাহী। এটি মূলত বিছানা ও বালিশ বিক্রির একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। গত শুক্রবার মাইকেল লিন্ডেল হোয়াইট হাউজে যান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাথে সাক্ষাৎ করতে। তিনি যখন ওয়েস্ট উইংয়ের দিকে যাচ্ছেন, তখন তার ছবি ধরা পড়ে ওয়াশিংটন পোস্টের স্টাফ ফটোগ্রাফার জ্যাবিন বটসফোর্ডের ক্যামেরায়।
ছবিতে লিন্ডেলের হাতে ধরা কাগজপত্রে যেসব কথাবার্তা লেখা, তার পাঠ উদ্ধার করে অনেকে আঁতকে উঠেছেন। টুইটারে অনেকে এমন মন্তব্য করেছেন যে, লিন্ডেলের হাত ধরা নোট পড়ে মনে হচ্ছে তিনি যেন যুক্তরাষ্ট্রে সামরিক শাসন জারির প্রস্তাব করতে যাচ্ছেন। উল্লেখ্য, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ক্ষমতা শেষ হয়ে যাচ্ছে তিন দিন পরেই, তার জায়গায় ২০ জানুয়ারি নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেবেন জো বাইডেন। ট্রাম্প এখনো সমানে দাবি করে যাচ্ছেন যে, তিনিই নির্বাচনে জিতেছেন এবং কারচুপির মাধ্যমে জো বাইডেনকে জয়ী দেখানো হচ্ছে।
গত ৬ জানুয়ারি তার ডাকে যে হাজার হাজার সমর্থক ওয়াশিংটন ডিসিতে এক সমাবেশে যোগ দিয়েছিলেন, সেখান থেকে ক্যাপিটল ভবনে সহিংস হামলার পর ট্রাম্প এখন বেশ বেকায়দায় আছেন। তাকে এরই মধ্যে কংগ্রেস দ্বিতীয়বারের মতো অভিশংসন করেছে।
মাইকেল লিন্ডেল হচ্ছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের একজন কট্টর সমর্থক। গত শুক্রবারও তিনি তার ফেসবুক পাতায় পোস্ট দিয়েছেন : ‘সবাই বিশ্বাস রাখুন! আমরা আরো চার বছর ডোনাল্ড ট্রাম্পকে আমাদের প্রেসিডেন্ট হিসেবে পাবো।’
ওথয়াশিংটন পোস্টের ফটোগ্রাফারের তোলা ছবিতে তার হাতে ধরা নোটের যেসব লেখা পড়া যাচ্ছে, তার একটি হচ্ছে ‘মার্শাল ল ইফ নেসেসারি’ (প্রয়োজনে সামরিক শাসন)। আরেক জায়গায় লেখা ‘মুভ ক্যাশ প্যাটেল টু সিআইএ একটিং’ (ক্যাশ প্যাটেলকে সিআইএর ভারপ্রাপ্ত...)।
ক্যাশ প্যাটেল হচ্ছেন ট্রাম্পের বিশ্বস্ত একজন কর্মকর্তা, যাকে নির্বাচনের পর প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে বদলি করা হয়। সেখানে তিনি জো বাইডেনের টিমের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের কাজে বাধা সৃষ্টি করছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছিল।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নির্বাচনে পরাজিত হলে সে ক্ষেত্রে সামরিক শাসন জারির পক্ষে মত দিয়েছিলেন এর আগেও কোনো কোনো সমর্থক। এদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন রজার স্টোন।
সিএনএনের হোয়াইট হাউজ সংবাদাদতা জিম একোস্টা জানিয়েছেন, তিনি লিন্ডেলের সাথে কথা বলেছেন। লিন্ডেল নিশ্চিত করেছেন যে, তিনি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং এসব কাগজপত্র ট্রাম্প হোয়াইট হাউজে তার স্টাফদের কাছে জমা দিতে বলেন। তবে তিনি তার নোটে ‘মার্শাল ল’ লেখা ছিল বলে যে দাবি করা হচ্ছে, তা অস্বীকার করেন।



আরো সংবাদ