২২ জানুয়ারি ২০২১
`

এইচএসসিতেও বিভাগ থাকছে না

মাধ্যমিকের পাঠ্যসূচিতে পরিবর্তন
-

দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তনের জন্য কাজ শুরু করেছে সরকার। সর্বস্তরে ২০২২ সাল থেকে নতুন আঙ্গিকে শুরু হবে পড়াশোনা। এ সিদ্ধান্তের আলোকে প্রাথমিক, মাধ্যমিক পর্যায়ে কী পরিবর্তন আসবে সে বিষয়ে ইতোমধ্যে জানানো হয়েছে। মাধ্যমিকে কোনো বিভাগ থাকছে না। এবার উচ্চমাধ্যমিকেও মানবিক, বিজ্ঞান ও বাণিজ্য বিভাগ থাকছে না বলে জানানো হয়েছে। এ দিকে মাধ্যমিকের পাঠ্যসূচিতেও ব্যাপক পরিবর্তন আনা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণীতে বিভাগ বিভাজন ছাড়াই পড়বেন শিক্ষার্থীরা। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) জাতীয় শিক্ষাক্রম রূপরেখায় এ প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে উচ্চশিক্ষায় প্রবেশে পছন্দের বিষয় ভর্তি ইচ্ছুকদের জন্য উন্মুক্ত। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি আরো সহজ হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। রূপরেখায় উল্লেখ করা পাঁচটি ধাপে রয়েছে প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক এবং উচ্চশিক্ষা। এ ছাড়া প্রস্তাবিত কারিকুলাম অনুযায়ী মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীরা সব ধরনের বিষয় নিয়ে পড়বে দশম শ্রেণী পর্যন্ত। এ স্তরের শিক্ষাক্রমে বিজ্ঞান, ব্যবসায় শিক্ষা ও মানবিক বিভাগ থাকবে না।
রূপরেখায় একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণীতে আবশ্যিক বিষয়ের জন্য বরাদ্দ থাকবে মোট শিখন সময়ের ২৫ শতাংশ। আর নৈর্বাচনিক তিনটি বিষয়ের জন্য শিখন সময়ের ৭৫ শতাংশ সময় বরাদ্দ থাকবে। পাশাপাশি একটি ঐচ্ছিক প্রায়োগিক বিষয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় আলাদা সময় বরাদ্দ করবে। এ বিষয়ে এনসিটিবির সদস্য (শিক্ষাক্রম) প্রফেসর মো: মশিউজ্জামান গণমাধ্যমকে বলেন, একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণীতে বিজ্ঞান, বাণিজ্য ও মানবিক বিভাগের বিভাজন থাকবে না। তবে শিক্ষার্থীরা বিষয়গুলো পড়তে পারবে। আগের মতো গ্রুপ চিহ্নিত করা হবে না। শিক্ষার্থীরা আবশ্যিক তিনটি বিষয় নিয়ে পরে নৈর্বাচনিক ও ঐচ্ছিক কোনো বিষয় নির্বাচন করতে পারবে।
এতে বিজ্ঞান, ব্যবসা কিংবা মানবিক বিভাগের যে বিষয় পড়বেন, সে পথ উন্মুক্ত থাকবে জানিয়ে তিনি বলেন, উচ্চশিক্ষায় প্রবেশের লক্ষ্যেও বিষয় নির্বাচন করতে পারবেন শিক্ষার্থী। উচ্চমাধ্যমিক ও পরবর্তী সময়ে বিশেষায়িত ক্ষেত্রে জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা পেশাগত প্রস্তুতি গ্রহণ করবে বলেও জানান তিনি।
পরিবর্তন হচ্ছে মাধ্যমিকের পাঠ্যসূচি : এ দিকে মাধ্যমিকের পাঠ্যসূচিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। পরিবর্তিত এই পাঠ্যসূচি ২০২২ শিক্ষাবর্ষ থেকেই কার্যকরের চিন্তা করা হচ্ছে। সূত্র মতে, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) ২০২২ সাল থেকে নতুন পাঠ্যসূচিতে শিক্ষাদানের লক্ষ্য নিয়ে এই পাঠ্যক্রম নিয়ে এখন প্রস্তুতির কাজ করছে এবং এর অংশ হিসেবেই যুক্ত করা হচ্ছে নতুন নামের কয়েকটি বিষয়। তবে নতুন বিষয়গুলো নামের দিক থেকে নতুন হলেও বিষয়বস্তুর দিক থেকে পুরোপুরি নতুন নয় বলেও জানান সংশ্লিষ্টরা। এনসিটিবি ইতোমধ্যেই জানিয়েছে, নতুন পাঠ্যসূচিতে সব শিক্ষার্থীকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত দশটি বিষয় পড়তে হবে। আর এসএসসি পরীক্ষা হবে দশম শ্রেণীতে এবং শুধুমাত্র দশম শ্রেণীর পাঠ্যসূচির আলোকে। সেই সাথে এসএসসিতে শুধু পাঁচটি বিষয়ের ওপর খাতা-কলমে পরীক্ষা নেয়ার সুপারিশ করেছে এনসিটিবির এ সম্পর্কিত কমিটি। অর্থাৎ দশম শ্রেণীতে ১০টি বিষয় পড়ানো হলেও এসএসসি পরীক্ষা হবে পাঁচটি বিষয়ের ওপর। সেগুলো হলোÑ বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান ও সামাজিক বিজ্ঞান।
অন্য দিকে ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা, জীবন ও জীবিকা, ডিজিটাল প্রযুক্তি, ভালো থাকা এবং শিল্প ও সংস্কৃতি এই পাঁচটি বিষয়ে খাতা-কলমে কোনো পরীক্ষা নেয়া হবে না। যদিও এই পাঁচটির মধ্যে তিনটিই নতুন বিষয়। এনসিটিবি বলছে, নতুন কারিকুলাম প্রণয়নের আগে দশজন শিক্ষাবিদকে নিয়ে ‘কারিকুলাম ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড রিভিশন কোর কমিটি’ গঠন করা হয়েছিল। ওই কমিটিই নতুন পাঠ্যক্রমে কি কি পড়ানো হবে তার রূপরেখা প্রণয়ন করে এনসিটিবির কাছে জমা দেয় এবং পরে এনসিটিবি তাদের ওয়েবসাইটে সেটি প্রকাশ করে মতামত গ্রহণের জন্য। এনসিটিবির সদস্য (শিক্ষাক্রম) অধ্যাপক ড. মশিউজ্জামান এ প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি জানান, পরীক্ষার ভার কমিয়ে শিক্ষণ প্রক্রিয়াকে শিশু-কিশোরদের উপযোগী করা ও বৈশ্বিক মানের কথা বিবেচনা করেই সব কার্যক্রম চলছে।
‘জীবন ও জীবিকা বিষয়টি হবে অকুপেশনাল বা পেশাভিত্তিক। এখন ভোকেশনাল কোর্স হিসেবে যা পড়ানো হচ্ছে এখন সেটাকে সংশোধন ও পরিমার্জন করে সফট স্কিলস নিয়ে জ্ঞান আহরণের সুযোগ বাড়ানো হবে। একজন রোগীর সেবা কিভাবে হবে কিংবা হোটেল ম্যানেজমেন্টের মতো আইডিয়াগুলো এখানে থাকবে। সাথে থাকবে কিছু হার্ড স্কিলসের বিষয়। তবে সেটিও কোনো ভারী যন্ত্রপাতির বিষয় নয়। পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের নবম ও দশম শ্রেণীতে এখন যে পাঠ্যপুস্তক তালিকা আছে তাতে ক্যারিয়ার এডুকেশনকে পাঠ্যপুস্তক হিসেবে রাখা আছে। নতুন কারিকুলামে ভালো থাকা বিষয়টিতে শারীরিক শিক্ষা, স্বাস্থ্য সম্পর্কিত বিষয়, খেলাধুলার সাথে মানসিক স্বাস্থ্য, পরিচ্ছন্নতা সম্পর্কিত এবং প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়কে যুক্ত করা হবে বলেও জানান তিনি।
প্রসঙ্গত, এখন নবম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের জন্য শারীরিক শিক্ষা, স্বাস্থ্য বিজ্ঞান ও খেলাধুলা নামে পাঠ্যপুস্তক আছে। এ ছাড়া শিল্প ও সংস্কৃতি বিষয়ে আগের চারু ও চারুকলার বিষয়ের সাথে সংযুক্ত করা হবে নৃত্য ও সঙ্গীতের মতো বিষয়গুলো। এনসিটিবির কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন কারিকুলামে সব শিক্ষার্থীকে জীবন ও জীবিকা, ডিজিটাল প্রযুক্তি, ভালো থাকা, ধর্ম শিক্ষা এবং শিল্প ও সংস্কৃতি বিষয়ে পরীক্ষা না নিয়ে পুরোটাই ধারাবাহিক মূল্যায়ন করা হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৫ সালে এই পদ্ধতিতে এসএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। বর্তমানে নবম ও দশম শ্রেণীর পাঠ্যসূচি মিলিয়ে এসএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। আর একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণী শেষে পাবলিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। তবে একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণীর সম্মিলিত ফলের ভিত্তিতেই চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করা হবে। বর্তমানে একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণী শেষে একটি পাবলিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। এই স্তরে ৩০ শতাংশ ধারাবাহিক মূল্যায়ন ও ৭০ শতাংশ পরীক্ষার মাধ্যমে মূল্যায়ন হবে।



আরো সংবাদ