২২ জানুয়ারি ২০২১
`
আপিল বিভাগের রায়

যাবজ্জীবন মানে ৩০ বছর জেল

রায়ে আমৃত্যু কারাদণ্ড দিলে আসামিকে বাকি জীবন জেলে থাকতে হবে; আমৃত্যু সাজা যদি থাকে তাহলে জেলখানায় ওল্ডহোম করতে হবে : খন্দকার মাহবুব হোসেন
-

আদালতের রায়ে আমৃত্যু কারাদণ্ড উল্লেখ না থাকলে যাবজ্জীবন সাজা মানে ৩০ বছর কারাদণ্ড। যাবজ্জীবনের প্রাথমিক অর্থ দণ্ডিতের বাকি জীবন হলেও দণ্ডবিধি ও ফৌজদারি কার্যবিধির আওতায় সাজা হয় ৩০ বছর। তবে আদালত নির্দিষ্ট করে আমৃত্যু কারাদণ্ড বলে দিলে আসামিকে বাকি জীবন জেলেই কাটাতে হবে বলে রায় দিয়েছেন দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ।
সাভারের একটি হত্যা মামলায় ‘যাবজ্জীবন কারাদণ্ড মানে আমৃত্যু কারাদণ্ড’ বলে আপিল বিভাগের রায় পুনর্বিবেচনা চেয়ে আবেদন সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতে নিষ্পত্তি করে গতকাল মঙ্গলবার রায় দিয়েছেন সর্বোচ্চ আদালত। আসামিপক্ষে পুনর্বিবেচনা আবেদন নিষ্পত্তি করে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন সাত বিচারকের ভার্চুয়াল আপিল বেঞ্চ গতকাল এ রায় দিয়েছেন।
সংক্ষিপ্ত রায়ে আদালত বলেছেন, প্রাথমিক অর্থে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের মানে হলো- দণ্ডিত ব্যক্তি তার স্বাভাবিক জীবনের বাকি সময় কারাভোগ করবেন।
দণ্ডবিধির ৪৫ এবং ৫৩ ধারার সাথে দণ্ডবিধির ৫৫, ৫৭ ধারা এবং ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৫(ক) মিলিয়ে পড়লে যাবজ্জীবনের সাজা কমে ৩০ বছর কারাদণ্ডের সমতুল্য হয়।
তবে আদালত, ট্রাইব্যুনাল অথবা ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে গঠিত ট্রাইব্যুনাল যখন কোনো আসামিকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেয়, তিনি কার্যবিধির ৩৫(ক) ধারার (রেয়াতি) সুবিধা পাবেন না।
রায় ঘোষণার সময় আসামিপক্ষে আদালতে যুক্ত ছিলেন প্রবীণ আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন ও আইনজীবী শিশির মনির। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন।
রায়ের পর আসামিপক্ষের আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, যাবজ্জীবন মানে কতদিন, আসামিকে কতদিন সাজা ভোগ করতে হবে এ নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছিল। আমরা সে ব্যাপারে রিভিউ পিটিশন করেছিলাম। আজকের রায়ে আপিল বিভাগ বলেছে, যাবজ্জীবন বলতে একজন মানুষের স্বাভাবিক জীবন যতদিন, ততদিন। কিন্তু আইন অনুযায়ী যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত একজন আসামির ৩০ বছরের সাজা ভোগ করতে হবে। যদি আদালত বা ট্রাইব্যুনাল বিশেষভাবে আদেশ দেন, তাহলে আমৃত্যু জেলখানায় থাকতে হবে।
খন্দকার মাহবুব বলেন, রায়ে আমরা মোটামুটি সন্তুষ্ট। তবে আমৃত্যু সাজাটা মানবতাবিরোধী এবং আমৃত্যু সাজা যদি থাকে, তাহলে জেলখানায় ওল্ডহোম করতে হবে। একটি মানুষ যখন অত্যন্ত বৃদ্ধ হয়ে যাবে, তখন তার চলাফেরার শক্তি থাকবে না। তখন তার সেবা-শুশ্রƒষার বিষয়টিও আদালতকে বিবেচনা করতে হবে।
তিনি বলেন, আমি এখনো মনে করি, আমৃত্যু সাজার প্রশ্ন যখন আসবে, আদালত থেকে এমন একটা আদেশ আসবে একসময়, যখন প্যারোলের বিধান থাকবে। একটি লোক যখন অথর্ব হয়ে যাবে, বৃদ্ধ হয়ে যাবে, চলাফেরায় অক্ষম হয়ে যাবে, সেক্ষেত্রে বর্তমানে যে বিধান রয়েছে, সরকার তাকে মুক্তি দিতে পারে। কিন্তু এ রায়ের পর যখন আমৃত্যু সাজা হবে, সেখানে সরকারের সেই ক্ষমতাও (প্যারোলে মুক্তি দেয়ার ক্ষমতা) থাকবে না। তাই এটাকে প্রয়োজনবোধে আবার পুনর্বিবেচনার জন্য দ্বিতীয়বার আবেদন করতে পারি।
রায়ের পর অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন বলেন, যাবজ্জীবন মানে আসামিকে সর্বোচ্চ ৩০ বছর সাজা খাটতে হবে। তবে আদালত যদি আমৃত্যু সাজা দেয়, তাহলে সেটাই গণ্য করতে হবে উল্লেখ করে রিভিউ রায় দিয়েছেন আপিল বিভাগ।
যাবজ্জীবনে ৩০ বছর- এ নিয়ম আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মামলায় দণ্ডিত আসামিদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না বলেও স্পষ্ট করেন অ্যাটর্নি জেনারেল। একটি হত্যা মামলায় ‘যাবজ্জীবন অর্থ আমৃত্যু কারাদণ্ড’ ঘোষণা করে আপিল বিভাগের দেয়া রায় পুনর্বিবেচনা (রিভিউ) চেয়ে আবেদনের ওপর পুনরায় শুনানি হয়। শুনানি শেষে এ বিষয়ে ১ ডিসেম্বর রায়ের দিন ধার্য করেন আপিল বিভাগ।
এই মামলায় চারজন অ্যামিকাস কিউরি আদালতে এ বিষয়ে অভিমত দেন। তারা হলেন, ব্যারিস্টার রোকন উদ্দিন মাহমুদ, এ এফ হাসান আরিফ, আব্দুর রেজাক খান ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি এ এম আমিন উদ্দিন।
এর আগে গত বছরের ১১ জুলাই প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে পূর্ণাঙ্গ আপিল বেঞ্চে শুনানি শেষে রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হয়। তখন শুনানিতে আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভারতসহ বিভিন্ন দেশের নজির উপস্থাপন করে আপিল বিভাগের রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশে ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন। আমৃত্যু কারাদণ্ডের রায় আমাদের বর্তমান প্রচলিত আইনের পরিপন্থী। দণ্ডবিধিতে আমৃত্যু কারাদণ্ড নামে কোনো দণ্ড নেই। আর যাবজ্জীবন অর্থ আমৃত্যু কারাদণ্ড হলে ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৫-এ এবং জেল কোডের সংশ্লিষ্ট বিধান অকার্যকর হয়ে যায়। এ ছাড়া যাবজ্জীবন অর্থ আমৃত্যু কারাদণ্ড হলে ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১, ৪০২ এবং দণ্ডবিধির ৫৫ ধারায় প্রদত্ত সরকারের ক্ষমতা খর্ব হবে। তিনি বলেছিলেন, যাবজ্জীবন সাজার একটি নির্দিষ্ট মেয়াদ থাকতে হবে। আমাদের আইনে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হিসেবে ৩০ বছর বলা আছে; যা রেয়াত পাওয়ার পর সাড়ে ২২ বছর হয়। উন্নত বিশ্বেও সাজার মেয়াদ বলে দেয়া হয়। সেখানে প্যারোল ব্যবস্থাও রয়েছে।
প্রসঙ্গত, সাভারে ২০০১ সালে জামান নামে এক ব্যক্তিকে হত্যার অভিযোগে করা মামলায় নিম্ন আদালত ও হাইকোর্টে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বহাল থাকা আসামি আতাউর রহমানের সাজা কমিয়ে আপিল বিভাগ যাবজ্জীবন সাজা দেন। ২০১৭ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন চার বিচারপতির আপিল বিভাগের বেঞ্চ সাভারের জামান হত্যা মামলায় দুই আসামির আপিলের রায় প্রদানের সময় বলেন, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড অর্থ ৩০ বছর নয় বরং আমৃত্যু কারাদণ্ড। স্বাভাবিক মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত জেলে থাকতে হবে। তখন প্রধান বিচারপতি বলেছিলেন, আইনের ব্যাখ্যা দিয়ে দেখাবেন ৩০ বছর না। যাবজ্জীবন মানে আমৃত্যু কারাদণ্ড। বিশেষ করে আদালত যদি এ মর্মে আদেশ দেন যে, আমৃত্যুই থাকতে হবে। এই রায় পুনর্বিবেচনা চেয়ে রিভিউ আবেদন করেন আতাউর।



আরো সংবাদ