১৭ জানুয়ারি ২০২১
`

সরকারিভাবে বিজয়ী বাইডেন ক্ষমতা হস্তান্তরে সম্মত ট্রাম্প

৬ মন্ত্রীর নাম ঘোষণা
-

অবশেষে নবনির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরে সম্মত হয়েছেন দেশটির বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সোমবার বাইডেন শিবিরের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শুরুর জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অনুমতি দিয়েছেন তিনি। মার্কিন কর্মকর্তারা এ খবর জানিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রে বিদায়ী ও আসন্ন প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয়ের কাজটি করে থাকে জেনারেল সার্ভিসেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (জিএসএ)। তারাই পুরনো প্রশাসনের কাছ থেকে নুতন প্রশাসনকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দেয়ার কাজটি করে থাকে। নির্বাচনে নিজের পরাজয়ের বিষয়ে চ্যালেঞ্জ অব্যাহত রাখার কথা বললেও ট্রাম্প জানিয়েছেন, জিএসএ-এর কাজে তিনি প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে চান না। তিনি বলেছেন, জেনারেল সার্ভিসেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (জিএসএ)-এর যেটি করণীয় তারা সেটিই করবে।
পজনারেল সার্ভিসেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (জিএসএ) জানিয়েছে, তারা বাইডেনকে ‘আপাত বিজয়ী’ হিসেবে স্বীকৃতি দিচ্ছে। মিশিগানে বাইডেনের জয় আনুষ্ঠানিকভাবে সার্টিফায়েড হওয়া ছিল ট্রাম্প শিবিরের জন্য একটি বড় ধাক্কা। মূলত এরপরই বাইডেনকে ‘আপাত বিজয়ী’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার কথা জানায় জিএসএ। সে অনুযায়ী, আগামী ২০ জানুয়ারি নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে বাইডেনের অভিষেকের বিষয়ে প্রস্তুতি শুরু করেছে তারা। জিএসএ-র এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে বাইডেন টিম। বিবিসি, আল জাজিরা ও রয়টার্স, সিএনএন ও গার্ডিয়ান।
বাইডেন টিমের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, জিএসএ-এর এ সিদ্ধান্ত একটি চূড়ান্ত প্রশাসনিক পদক্ষেপ। আমাদের জাতির সামনে যেসব চ্যালেঞ্জ রয়েছে সেগুলো মোকাবেলার জন্য আজকের সিদ্ধান্তটি একটি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। মহামারী নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং আমাদের অর্থনীতিকে ট্র্যাকে ফিরিয়ে আনার মতো চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলায় এর প্রয়োজন ছিল।
জিএসএ-র ঘোষণার পরপরই পেন্টাগন জানিয়েছে, তারা বাইডেন শিবিরকে সব ধরনের সহযোগিতায় প্রস্তুত। বাইডেন শিবিরের ট্রানজিশন ওয়েবসাইটও সরকারি ডোমেইন নেম পেয়েছে। সোমবার বাইডেন তার পররাষ্ট্রনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তা দলের নামও ঘোষণা করেছেন; এসব দলে ওবামা প্রশাসনের অনেক কর্মকর্তাই স্থান পেয়েছেন।
এর আগে ক্ষমতায় টিকে থাকতে বিভিন্ন রাজ্যে ট্রাম্প শিবিরের মামলার সমালোচনা করেন বাইডেন। তিনি বলেন, ট্রাম্পের আইনি ব্যবস্থার হুমকিতে কিছুই থেমে থাকবে না। কোনো কিছুই ক্ষমতা হস্তান্তরকে আটকে রাখতে পারবে না। যাই ঘটুক না কেন, ২০ জানুয়ারি নতুন সরকার গঠনের প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে কাদের দায়িত্ব দেয়া হবে; সে ব্যাপারে এরইমধ্যে পর্যালোচনা শুরু হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের নির্বাচনের ফল মেনে না নেয়া বিব্রতকর।
জিএসএ কখন সরকার বদলের এ প্রক্রিয়া শুরু করবে সে ব্যাপারে আইনে সুনির্দিষ্ট করে কিছু বলা নেই। তবে বাইডেন শিবির বলছে, তাদের বিজয় পরিষ্কার। ফলে এখানে বিলম্ব বা কালক্ষেপণ করার কোনো সুযোগ নেই। রয়টার্স-ইসপোস পরিচালিত জরিপে দেখা গেছে, ট্রাম্প নির্বাচনে জালিয়াতির অভিযোগ তুললেও যুক্তরাষ্ট্রের বেশির ভাগ মানুষ এটি বিশ্বাস করে না। জরিপে অংশগ্রহণকারীদের প্রায় ৮০ ভাগই বাইডেনকে পরবর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে মেনে নিয়েছেন। এই ৮০ ভাগের মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টির সমর্থক।
মন্ত্রিসভার ৬ সদস্যের নাম ঘোষণা বাইডেনের : যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন আনুষ্ঠানিকভাবে তার সম্ভাব্য মন্ত্রিসভার ছয় সদস্যের নাম ঘোষণা করেছেন। এদের মধ্যে সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তা রয়েছেন।
পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক দীর্ঘ দিনের উপদেষ্টা অ্যান্টনি ব্লিনকেনকে নতুন প্রশাসনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে বেছে নিয়েছেন তিনি। বারাক ওবামা প্রশাসনের শেষ সময়ে বছর দুয়েক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করা ব্লিনকেন ফ্রান্সে পড়াশোনা করেছেন। সঙ্গীত এবং ফুটবলের প্রতি তার আকর্ষণ প্রবল। দায়িত্ব পাওয়ার পর তাকে প্যারিস জলবায়ু চুক্তি, ইরান পরমাণু চুক্তি ও জাতিসংঘের যেসব সংস্থা থেকে ডোনাল্ড ট্রাম্প বেরিয়ে এসেছিলেন সেগুলোতে পুনঃপ্রবেশ এবং বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও মানবাধিকার নিশ্চিতে যুক্তরাষ্ট্রের চ্যাম্পিয়ন মর্যাদা ফিরিয়ে আনতে ভূমিকা রাখতে হবে।
নভেম্বরের নির্বাচনে জয়ী বাইডেন তার নতুন প্রশাসনে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরিকে তার জলবায়ু বিষয়ক বিশেষ দূত হিসেবে বেছে নিয়েছেন। হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের প্রধান হিসেবে মনোনয়ন দিয়েছেন কিউবায় জন্ম নেয়া আইনজীবী আলেহান্দ্রো মায়োরকাসকে। নিয়োগ পেলে তিনিই হবেন এ পদে প্রথম ল্যাটিনো।
সিআইএর সাবেক উপপরিচালক অ্যাভ্রিল হেইনসকে ন্যাশনাল ইন্টিলিজেন্সের পরিচালক মনোনয়ন দিয়েছেন বাইডেন। কাজ শুরু করতে পারলে অ্যাভ্রিলই হবেন গুরুত্বপূর্ণ এ প্রতিষ্ঠানের প্রথম নারী পরিচালক। নতুন প্রশাসনে মন্ত্রী পদমর্যাদায় জাতিসঙ্ঘে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পেতে যাচ্ছেন লিন্ডা থমাস-গ্রিনফিল্ড। বাইডেন তার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে জ্যাক সুলিভানকে দায়িত্ব দিয়েছেন; বাইডেন ভাইস প্রেসিডেন্ট থাকাকালে সুলিভান তার নিরাপত্তা উপদেষ্টা ছিলেন।
নতুন প্রশাসনের জন্য বাইডেন এখন পর্যন্ত যে কর্মকর্তাদের বেছে নিয়েছেন তারা প্রায় সবাই ২০০৯-২০১৭ সাল পর্যন্ত ওবামা-বাইডেন প্রশাসনেও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন। কেরি ২০১৩ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন; ২০১৫ সালে তিনিই যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। ট্রাম্প পরে ওই চুক্তি থেকে বেরিয়ে যান। নতুন প্রশাসনের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদেও কেরি সদস্য থাকবেন বলে জানিয়েছে বাইডেনের কার্যালয়। এমনটা হলে যুক্তরাষ্ট্রের এ কাউন্সিল প্রথমবার জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত একজন বিশেষজ্ঞ পাবে। যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ও অভিবাসন সেবা বিভাগের সাবেক পরিচালক মায়োরকাস পরে ওবামা আমলে হোমল্যান্ড সিকিউরিটির সহকারী মন্ত্রীরও দায়িত্ব পালন করেছেন।
সুলিভান ছিলেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পলিসি প্ল্যানিং স্টাফের পরিচালক এবং হিলারি ক্লিনটন পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকার সময় তার ডেপুটি চিফ অব স্টাফ। ইরান পরমাণু চুক্তি নিয়ে শুরুর দিকের আলোচকদেরও একজন ছিলেন তিনি। নিজের বেছে নেয়া কর্মকর্তাদের প্রসঙ্গে বিবৃতিতে বাইডেন বলেছেন, জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতির প্রশ্নে নষ্ট করার মতো সময় আমাদের হাতে নেই। এরা একইসাথে অভিজ্ঞ ও পরীক্ষিত এবং উদ্ভাবনী ও ধী শক্তির অধিকারী। বাইডেন বলেন, ‘আমি এমন একটি টিম নিয়ে কাজ করতে চাই যারা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্রের মর্যাদা পুনরুদ্ধার করতে আমাকে সাহায্য করবেন। যাতে আমি বিশ্বের সামনে থাকা বৃহৎ চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করতে পারি।’
বাইডেনকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের আমন্ত্রণ : নবনির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের এক বৈঠকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। সোমবার এক ফোনালাপে তাকে এ আমন্ত্রণ জানান ইউরোপীয়ান কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট চার্লস মাইকেল। আগামী বছর বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। টুইটারে দেয়া এক পোস্টে চার্লস মাইকেল নিজেই বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
টুইটারে দেয়া পোস্টে চার্লস মাইকেল বলেন, মাত্রই নবনির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সাথে কথা হয়েছে। তাকে আগামী বছর ব্রাসেলসে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিশেষ বৈঠকে আমন্ত্রণ জানিয়েছি। কোভিড-১৯, জলবায়ু, নিরাপত্তা ও বহুপাক্ষিকতা নিয়ে একযোগে কাজ করার সময় এসেছে। আসুন ফের একটি শক্তিশালী ইইউ-যুক্তরাষ্ট্র জোট গড়ে তুলি।

 



আরো সংবাদ