০২ ডিসেম্বর ২০২০

আজ পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী সা:

-

কত কবি কতভাবে তাঁর আগমনের ছবি এঁকেছেন। তাকে নিয়ে রচিত হয়েছে কত পঙ্ক্তিমালা। তাঁর চরিত্র ছিলো অনুপম। যাঁর আগমনে এই ধরাধামে অনুরণিত হয়েছিল শান্তির বারতা। পশু পক্ষীকুল, সবুজ পত্র পল্লব, নির্ঝরণী, ঊষর মরু দুলে উঠেছিল যাঁর আগমন ধ্বনিতে। তিনি জগতের শ্রেষ্ঠতম মহামানব প্রিয়নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সা:। আজ ১২ রবিউল আউয়াল। মানবতার মহান দিশারি বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ সা:-এর জন্ম এবং ওফাত দিবস। সাধারণভাবে আমাদের দেশে যা ঈদে মিলাদুন্নবী সা: হিসেবে পরিচিত। আজ সরকারি ছুটির দিন। এই উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো: আবদুল হামিদ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাণী দিয়েছেন।
প্রায় দেড় হাজার বছর আগে ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দের এই দিনে তিনি পবিত্র মক্কা নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন। জীবনের শেষ ২৩ বছর নবুয়তের দায়িত্ব পালন শেষে আবার এ মাসেরই ১২ তারিখে ৬৩ বছর বয়সে দুনিয়া থেকে বিদায় নেন তিনি। পবিত্র মদিনায় মসজিদে নববী সংলগ্ন সবুজ মিনারের ছায়ায় শায়িত আছেন ইসলামকে পূর্ণতা দানকারী মানবতার এই মুক্তিদূত। প্রতিদিন লাখো মুসলমান দরুদ ও সালাম পেশ করেন তাঁর রওজায়। নামাজ ও নামাজের বাইরে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মুসলমানরা প্রতিনিয়ত দরুদ পাঠ করেন তাঁর উদ্দেশে। পবিত্র আল কুরআনে তাঁকে তামাম পৃথিবীর মানুষের জন্য রহমত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তাকে বলা হয়েছে দেদীপ্যমান আলোকবর্তিকা বা সিরাজাম মুনিরা।
মহানবী হজরত মুহাম্মদ সা: বিশ্বের তাবৎ বিশ্বাসী মুসলমানের কাছে প্রিয়তম নবী। এমনকি যারা ইসলামে বিশ্বাস করেন না এমন মনিষীরাও তাঁর অনুকরণীয় আদর্শবাদিতা ও সত্যবাদিতা নিয়ে নিঃসন্দেহ। কখনো কখনো পাপিষ্ঠ পাপাচারী মূক ও বধির কিছু মানুষরূপী তাকে নিয়ে নিন্দনীয় মন্তব্য করলেও ইতিহাসের কষ্টিপাথরে তা টেকেনি কোনো কালে। তিনি উদ্ভাসিত হয়েছেন আলোকবর্তিকা হিসেবে। পৃথিবী আলোকিত হয়েছে তাঁর আগমনে। পারস্যের কবি শেখ সাদী তাঁকে উৎসর্গ করে লিখেছেন, ‘বালাগাল উলা বি কামালিহী। কাশাফাদ্দুজা বে জামালিহী। হাসুনাত জামিউ খিসালিহি। সাল্লু আলাইহি ওয়ালিহি।’ আল্লামা ইকবাল লিখেছেন, ‘ইয়ে তেরে মে’রাজ থি জু লওহে কলম তক পোঁহচা,আওর মেরে মেরাজ হ্যায় জু ম্যায় তেরে কদম তক পোঁহচা।’ আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছেন, ‘মোহাম্মদের নাম জপেছিলি বুলবুলি তুই আগে। তাই কিরে তোর কণ্ঠেরও গান এতই মধুর লাগে...।’ কবি ফররুখ আহমদ লিখেছেন, ‘কে আসে কে আসে সাড়া পড়ে যায়। কে আসে কে আসে নতুন সাড়া। জাড়ে সুষুপ্ত মৃত জনপদ, জাগে শতাব্দী ঘুমের পাড়া।’ কবি জসীম উদ্দিন লিখেছেন, ‘রাসূল নামের কে এলোরে মদীনায়। ওরে আকাশেরও চন্দ্র কে রে আনল দুনিয়ায়।’
জাহেলিয়ার যুগে অনাচার-পাপাচারে নিমজ্জিত আরবে ইসলামকে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বিশ্ববাসীর সামনে ইসলামের মডেল উপস্থাপনের এক মহান দায়িত্ব পালন করেন মুহাম্মদ সা:। তাঁর মাধ্যমেই ইসলাম মহান আল্লাহ তায়ালার মনোনীত পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। তখন অশান্ত আরবে শান্তির সুবাতাস বয়ে যায়। পরবর্তীতে ক্রমেই ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আসে প্রায় পুরো বিশ^।
তাই মহানবী সা:-এর আগমনের দিনকে খুশির দিন হিসেবে ঈদে মিলাদুন্নবী সা: নামে পালন করেন উপমহাদেশের ধর্মপ্রাণ মানুষ। মাসব্যাপী রাসূল সা:-এর প্রতি দরুদ পাঠ, তার জীবনী ও আদর্শ আলোচনা, আনন্দ মিছিল, স্বাগত মিছিল প্রভৃতি কর্মসূচি পালন করা হয়। সারা বিশ্বেও মহানবীর জীবন ও আদর্শ স্মরণের মধ্য দিয়ে পালিত হয় ১২ রবিউল আউয়াল।
নবী মুহাম্মদ সা:-কে দুনিয়ায় পাঠানো হয়েছিল একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের জন্য। তা ছিল দুনিয়ায় প্রচলিত সব বিধিবিধান ও ব্যবস্থার ওপরে আল্লাহর দেয়া দ্বীন বা জীবনব্যবস্থাকে রাষ্ট্র ও সমাজে বিজয়ী আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।
মানুষের কল্যাণ সাধনই ছিল রাসূল সা:-এর সব কাজের লক্ষ্য। মানুষের কল্যাণচিন্তায় পবিত্র মক্কার হেরা পাহাড়ের গুহায় ধ্যানরত অবস্থায়ই তার ওপর প্রথম ওহি নাজিল হয়। ৪০ বছর বয়সে সেই ওহি প্রাপ্তির মাধ্যমেই নবুয়ত লাভ করেন তিনি। তাঁর ওপর নাজিলকৃত ওহির সমষ্টিই ইসলামের মহাগ্রন্থ আল কুরআন।
মহানবী সা: ছিলেন পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ সংস্কারক। তিনি তখনকার আরবে আর্থসামাজিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয়, প্রশাসনিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনেন, তার নজির পৃথিবীতে নেই। তিনি ধর্মের নামে অনাচার, ব্যভিচার ও কুসংস্কারের অবসান ঘটিয়ে সুস্থ-সুন্দর একটি মানবিক ব্যবস্থা মানবজাতিকে উপহার দেন। সমাজে ন্যায়, ইনসাফ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে যে সংস্কার করেন, তা ছিল অনন্য-অসাধারণ।
রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর বাণী
রাষ্ট্রপতি মো: আবদুল হামিদ তার বাণীতে বলেছেন, ধর্মীয় ও পার্থিব জীবনে মহানবী হজরত মুহাম্মদ সা:-এর শিক্ষা সমগ্র মানবজাতির জন্য অনুসরণীয়। পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী সা: উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি বিশ্ববাসীসহ মুসলিম উম্মাহকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও মোবারকবাদ জানান।
তিনি বলেন, হজরত মুহাম্মদ সা:-এর জন্ম ও ওফাতের স্মৃতি বিজড়িত পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী সা: বিশ্ববাসী বিশেষত মুসলমানদের জন্য অত্যন্ত পবিত্র ও মহিমান্বিত দিন। মহান আল্লাহ তায়ালা হজরত মুহাম্মদ সা:-কে ‘রহমাতুল্লিল আলামিন’ তথা সমগ্র বিশ্বজগতের রহমত হিসেবে প্রেরণ করেন। দুনিয়ায় তাঁর আগমন ঘটেছিল ‘সিরাজুম মুনিরা’ তথা আলোকোজ্জ্বল প্রদীপরূপে। পবিত্র কুরআনে তাঁর জীবনকে বলা হয়েছে ‘উসওয়াতুন হাসানাহ’ অর্থাৎ সুন্দরতম আদর্শ।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঈদে মিলাদুন্নবীর সা: পবিত্র দিনে দেশ, জাতি ও মুসলিম উম্মাহ তথা বিশ্ববাসীর শান্তি ও মঙ্গল কামনা করে তাদেরকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও মোবারকবাদ জানিয়েছেন।
বাণীতে তিনি বলেন, মহান আল্লাহ আমাদের প্রিয়নবী সা:-কে এ পৃথিবীতে প্রেরণ করেছেন, ‘রাহমাতুল্লিল আলামিন’ তথা সারা জাহানের জন্য রহমত হিসেবে। পাপাচার, অত্যাচার, মিথ্যা, কুসংস্কার ও সঙ্ঘাতে জর্জরিত পৃথিবীতে তিনি মানবতার মুক্তিদাতা ও ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন। শেখ হাসিনা বলেন, আমার দৃঢ়বিশ্বাস, মহানবী সা:-এর সুমহান আদর্শ অনুসরণের মধ্যেই মুসলমানদের অফুরন্ত কল্যাণ, সফলতা ও শান্তি নিহিত রয়েছে। করোনা মহামারীসহ আজকের দ্বন্দ্ব-সঙ্ঘাতময় বিশ্বে প্রিয় নবী সা:-এর অনুপম শিক্ষার অনুসরণ ও ইবাদতের মাধ্যমেই বিশ্বে শান্তি, ন্যায় ও কল্যাণ নিশ্চিত হতে পারে।
টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর সমাধি কমপ্লেক্সে ঈদে মিলাদুন্নবী সা: উদযাপন : গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধি কমপ্লেক্সে পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী সা: উপলক্ষে পবিত্র কুরআনখানি ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হবে
ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কর্মসূচি : পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী সা: উপলক্ষে সারা দেশে ইসলামিক ফাউন্ডেশন বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার বাদ মাগরিব ইসলামিক ফাউন্ডেশন বায়তুল মোকাররম মিলনায়তনে পক্ষকালব্যাপী অনুষ্ঠানমালার উদ্বোধন করা হয়। এতে রয়েছেÑ
১৫ দিনব্যাপী ওয়াজ ও মিলাদ মাহফিল : এর আগে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে ১৫ দিনব্যাপী বাদ মাগরিব ও বাদ এশা দেশবরেণ্য আলেম-ওলামার ওয়াজ মাহফিল অনুষ্ঠিত হতো। বর্তমান করোনা পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যঝুঁকির আশঙ্কা থাকায় দেশবরেণ্য এই ওয়াজ জুম, ফেসবুক ও ইউটিউবে সরাসরি প্রচার করা হবে। এ ছাড়া প্রতিদিন বাদ মাগরিব বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের সম্মেলন কক্ষে স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে সীমিত সংখ্যক দর্শকের উপস্থিতিতে মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টরের মাধ্যমে এই ওয়াজ মাহফিলের ব্যবস্থা করা হবে।
বেতারের সাথে যৌথ প্রযোজনায় সেমিনার : বাংলাদেশ বেতারের সাথে যৌথ প্রযোজনায় সপ্তাহব্যাপী মহানবী সা:-এর জীবন ও কর্মের ওপর সেমিনার অনুষ্ঠিত হবে। ইসলামিক ফাউন্ডেশন বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের সম্মেলন কক্ষে সীমিতসংখ্যক দর্শকের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠান আয়োজন করা হবে।
ইসলামী সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা : স্কুল, কলেজ, আলিয়া ও কওমি মাদরাসা ও বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রছাত্রীদের অংশগ্রহণে জুম অ্যাপসের মাধ্যমে ইসলামী সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হবে। প্রতিযোগিতার বিষয়গুলো হচ্ছে কিরাত, হামদ-নাত, উপস্থিত বক্তৃতা ও জুমার খুতবা লিখন।
কিরাত মাহফিল, হামদ-নাত ও স্বরচিত কবিতা পাঠের আসর : বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের সম্মেলন কক্ষে জুম অ্যাপসের মাধ্যমে কিরাত মাহফিল, হামদ-নাত ও স্বরচিত কবিতা পাঠের আসর আয়োজন করা হবে। এখানে দেশের প্রখ্যাত কারি ও শিল্পীরা অংশগ্রহণ করবেন।


আরো সংবাদ