০৪ ডিসেম্বর ২০২০
নৌবাহিনীর কর্মকর্তাকে মেরে রক্তাক্ত, স্ত্রীকে তুলে নেয়ার হুমকি

হাজী সেলিমের ছেলে গ্রেফতার

বাসায় দিনভর অভিযানে অবৈধ অস্ত্র, গুলি, মদ-বিয়ার, হ্যান্ডকাফ-ওয়াকিটকি উদ্ধার : এক বছরের কারাদণ্ড
এমপি হাজী সেলিমের ছেলে মোহাম্মদ এরফান সেলিমকে ধরতে তার বাসায় র্যাবের অভিযান এবং অভিযানে অস্ত্রসহ উদ্ধারকৃত সরঞ্জাম : নয়া দিগন্ত -

নৌবাহিনীর কর্মকর্তা ও তার স্ত্রীকে মারধরের অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছেন ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ নেতা সংসদ সদস্য হাজী সেলিমের ছেলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মোহাম্মদ এরফান সেলিম ও তার এক বডিগার্ড। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা হাজী সেলিমের চকবাজার দেবীদাস ঘাট লেনের বাসায় তল্লাশি চালিয়ে আগ্নেয়াস্ত্র, মদ-বিয়ার এবং হ্যান্ডকাফ ও ওয়াকিটকি উদ্ধার করেছেন। গতকাল সোমবার দিনভর ওই বাসায় অভিযান চালায় র্যাব-পুলিশ। এর আগে গত রোববার সন্ধ্যায় ধানমন্ডির কলাবাগান এলাকায় এরফান সেলিম ও তার বডিগার্ডরা নৌবাহিনীর ওই কর্মকর্তাকে মারধর করে রক্তাক্ত করে। তারা কর্মকর্তার দাঁত ফেলে দেয়। ওই কর্মকর্তার স্ত্রীর গায়েও হাত দেয় তারা এবং তাকে তুলে নেয়ার হুমকি দেয়। এই ঘটনায় গতকাল সকালে ধানমন্ডি থানায় একটি মামলা দায়ের করেন ওই কর্মকর্তা। কাউন্সিলর এরফানের শ^শুরও ক্ষমতাসীন দলের একজন সংসদ সদস্য।
সকালে নৌবাহিনীর লেফটেন্যান্ট ওয়াসিফ আহমদ খান বাদি হয়ে থানায় মামলা দায়ের করেন বলে থানার ওসি ইকরাম আলী মিয়া সাংবাদিকদের জানান। থানা পুলিশ জানায়, ‘নৌবাহিনীর লেফটেন্যান্ট ওয়াসিফ আহমদ খান বাদি হয়ে ভোরে মামলাটি করেছেন। মামলায় চারজনের নাম উল্লেখ এবং অজ্ঞাত আরো দুই-তিন জনকে আসামি করা হয়েছে।’ আসামিরা হলেন, এরফান সেলিম, তার বডিগার্ড মোহাম্মদ জাহিদ, হাজী সেলিমের মদিনা গ্রুপের প্রটোকল অফিসার এ বি সিদ্দিক দিপু এবং গাড়িচালক মিজানুর রহমানসহ অজ্ঞাত আরো ২-৩ জন। গাড়িচালক মিজানুর রহমানকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলেও জানায় থানা পুলিশ।
জানা যায়, গত রোববার রাতে কলাবাগানের ট্রাফিক সিগন্যালে হাজী সেলিমের একটি গাড়ি থেকে দুই-তিন ব্যক্তি নেমে ওয়াসিফ আহমদ খানকে ফুটপাথে ফেলে এলোপাতাড়ি মারধর করে। পরে ট্রাফিক পুলিশ এসে তাকে উদ্ধার করে।
পথচারীরা এই দৃশ্য ভিডিও করেন, যা মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায়। ধানমন্ডি থানা পুলিশ এসে ঘটনাস্থল থেকে গাড়িটি থানায় নিয়ে যায়। বর্তমানে গ্রেফতার মিজানুর ও গাড়ি ধানমন্ডি থানায় রয়েছে।
ওয়াসিফ আহমদ এজাহারে উল্লেখ করেন, তিনি নীলক্ষেত থেকে বই কিনে মোটরসাইকেলে মোহাম্মদপুরের বাসায় ফিরছিলেন। সাথে তার স্ত্রীও ছিলেন। ল্যাবএইড হাসপাতালের সামনে তার মোটরসাইকেলটিকে পেছন থেকে একটি গাড়ি ধাক্কা দেয়। ওয়াসিফ আহমদ মোটরসাইকেল থামিয়ে গাড়িটির গ্লাসে নক করে নিজের পরিচয় দিয়ে ধাক্কা দেয়ার কারণ জানতে চান। তখন এক ব্যক্তি বের হয়ে তাকে গালিগালাজ করে গাড়ি চালিয়ে কলাবাগানের দিকে আসেন। মোটরসাইকেল নিয়ে ওয়াসিফ আহমদও তাদের পেছনে পেছনে আসেন। কলাবাগান বাসস্ট্যান্ডে গাড়িটি থামলে ওয়াসিফ মোটরসাইকেল নিয়ে গাড়ির সামনে দাঁড়ান। তখন তিন-চার জন লোক গাড়ি থেকে নেমে বলতে থাকে, ‘তোর নৌবাহিনী/সেনাবাহিনী বাইর করতেছি, তোর লেফটেন্যান্ট/ক্যাপ্টেন বাইর করতেছি। তোকে আজ মেরেই ফেলব। এই বলে তাকে কিলঘুষি দিতে থাকে। এরপর তারা পালিয়ে যায়।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পথচারী নয়া দিগন্তকে বলেন, মোটরসাইকেল আরোহী ওই ব্যক্তির পরিচয় সম্পর্কে পথচারীরা তখনো নিশ্চিত ছিলেন না। পথচারীরা দেখতে পান ওই ব্যক্তিকে ধরে কয়েকজন লোক বেদম মারধর করছে। তখন পথচারীরা প্রতিবাদ করলে আক্রমণকারীরা পথচারীদের দিকেও তেড়ে যায়। এ সময় পথচারীরা প্রতিবাদী হয়ে উঠলে আক্রমণকারীরা গাড়িটির নম্বর প্লেট নিজেরাই ভেঙে রেখে স্থান ত্যাগ করে। তখন পথচারীদের কাছে ওয়াসিফ নিজের পরিচয় ব্যক্ত করে বলেন, দুর্বৃত্তরা তার স্ত্রীকেও মারধর করেছে। মেরে তার দাঁত ভেঙে ফেলেছে। একটি ভিডিওতে তাকে বলতে শোনা যায়, ‘আল্লাহর কাছে শোকরিয়া আমি নিজেকে সেফ করতে জানি। নাহলে আমাকে মেরেই ফেলত।’ তাকে বলতে শোনা যায়, ‘আমি জানি না আমাকে এভাবে কেন মেরেছে। আমি আমার পেশাগত পরিচয় দিয়েছি। আমি বলেছি, আমি সশস্ত্রবাহিনীর সদস্য। তারপরও মেরেছে।’
বেশ কিছুক্ষণ পর পুলিশ আসে। তখন পর্যন্ত গাড়িটি আটকে রাখেন পথচারীরা। পরে পুলিশ এসে গাড়ি এবং গাড়ির চালক মিজানুর রহমানকে থানায় নিয়ে যায়। পরে জানা যায় কালো রঙের ল্যান্ড রোভার ওই গাড়িটির মালিক সংসদ সদস্য হাজী সেলিম। গাড়ির নম্বর ঢাকা মেট্রো ঘ-১১-৫৭৩৬। গাড়িতে সংসদ সদস্যের স্টিকার লাগানো ছিল।
রাতের বেলায় এই ঘটনা ঘটলেও গতকাল সকালে ওয়াসিফ থানায় গিয়ে মামলা দায়ের করেন। দুপুরের দিকে র্যাব-পুলিশের বিশাল বহর চকবাজারের হাজী সেলিমের পৈতৃক বাড়ি ২৬ দেবীদাস ঘাট লেনের ‘দাদার বাড়ি’তে অভিযানে যায়। তারা ওই বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করে দিনভর অভিযান চালায়। এ সময় চকবাজার মোড় থেকে হাজী সেলিমের বাড়ি পর্যন্ত শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদেরকেই দেখা যায়। র্যাবের কয়েক শ’ সদস্য অভিযানে অংশ নেন। র্যাবের এই অভিযান দেখতে সেখানে হাজার হাজার উৎসুক মানুষ জড়ো হন। হাজী সেলিমের বাড়িতে এভাবে অভিযান চলছে এ দৃশ্য দেখে অনেকেই বিস্মিত হন। এর আগে সকালের দিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল তার বাসভবনে সাংবাদিকদের বলেন, হামলাকারী যতই ক্ষমতাশীল হোক না কেন রেহাই পাবে না।
অভিযানের এক পর্যায়ে সেখানে পৌঁছান র্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম। তার উপস্থিতি দেখে সবাই বুঝতে পারেন ভিতরে নিশ্চয় এমন কোনো অবৈধ জিনিস মিলেছে যার কারণে র্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে আসতে হয়েছে। পরে জানা যায় ওই বাড়ি থেকে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র এবং মাদকদ্রব্য উদ্ধার হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যে ওয়াকিটকি ও হ্যান্ডকাফ ব্যবহার করে সেসবও বাড়ি থেকে উদ্ধার করা হয়। একপর্যায়ে গণমাধ্যম কর্মীদেরকেও বাড়ির ভেতরে নিয়ে এসব অবৈধ দ্রব্য দেখানো হয়। র্যাব সদস্যরা বাড়ির প্রতিটি কক্ষ তল্লাশি করেন।
প্রায় আড়াই ঘণ্টা অভিযান শেষে র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার প্রধান লেফটেন্যান্ট কর্নেল আশিক বিল্লাহ গণমাধ্যমকে জানান, হাজী সেলিমের ছেলে এরফান সেলিম ও তার সহযোগী জাহিদকে তাদের হেফাজতে নেয়া হয়েছে। তিনি বেলা ৩ টার দিকে গণমাধ্যমকে জানান, অভিযানে র্যাব-৩, র্যাব-১০, গোয়েন্দা শাখার সদস্য এবং নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট অংশ নেন।
র্যাব জানায়, হাজী সেলিমের ওই বাসা থেকে ৩৭টি ওয়াকিটকি ও পাঁচটি ভিপিএস মেশিন উদ্ধার করেছে র্যাব; যা দিয়ে পাঁচ থেকে ১০ কিলোমিটার দূরত্বের নেটওয়ার্কে কথা বলা যায়। এ ছাড়া এক জোড়া পুলিশের হ্যান্ডকাফ, একটি একনলা বন্দুক, একটি বিদেশী পিস্তল উদ্ধার করা হয়। পিস্তলের ম্যাগজিনে গুলিও লোড করা ছিল। সেই সাথে একটি ব্রিফকেস উদ্ধার করা হয়, যা ভিআইপি নিরাপত্তায় নিয়োজিত এসএসএফ সদস্যরা ব্যবহার করে থাকেন। এ সময় বিয়ার ১২ ক্যান ও ১২ বোতল বিদেশী মদ উদ্ধার করা হয়।
এ দিকে এরফানকে মদপান ও ওয়াকিটকি রাখার পৃথক অভিযোগে র্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ছয় মাস করে মোট এক বছরের কারাদণ্ড প্রদান করেন। আগ্নেয়াস্ত্র ও গুলিসহ অন্যান্য অবৈধ দ্রব্য উদ্ধারের ঘটনায় তার বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা করা হবে বলে র্যাব জানায়। রাত ৯টায় এ রিপোর্ট লেখার সময় এরফানকে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়।

 


আরো সংবাদ

সৌদি আরবে ইমাম হোসাইন মসজিদটি ভেঙে ফেলার নির্দেশ (১০৭২৭)অপশক্তি মোকাবেলা করে ইসলামের বিজয় নিশ্চিত করতে হবে : মামুনুল হক (৯১৪৮)রাজধানীতে সমাবেশের অনুমতি পায়নি সম্মিলিত ইসলামী দলগুলো (৮৩৫৮)ভাস্কর্যের নামে মূর্তি স্থাপন কোনোক্রমে মেনে নেয়া যায় না : সম্মিলিত ইসলামী দলসমূহ (৫৯৯৭)স্টেডিয়ামগুলোকে জেলে রূপান্তরের অনুমতি না দেয়ায় কেজরিওয়ালের ওপর ক্ষুব্ধ মোদি (৫৬৯৯)দেশের প্রয়োজনে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারের নির্দেশ সেনাপ্রধানের (৫৪১৬)আওয়ামী লীগের আপত্তি, মামুনুল হকের মাহফিল বাতিল (৫২৩৭)কোনো মুসলিম হিন্দু নারীকে বিয়ে করতে পারে কিনা (৪৯৫৯)বাবার ডাকে বাড়ি ফিরে বড় ভাইয়ের হাতে খুন (৪৬০৮)পাঠ্যসূচিতে থাকলেও গুরুত্ব হারাচ্ছে ইসলাম শিক্ষা (৪০৩৯)