১৯ জানুয়ারি ২০২১
`

ফরাসি পণ্য বর্জনের ডাকে বদলে গেছে আরবের শপিংমলের চিত্র

পণ্য বর্জন না করার অনুরোধ ফ্রান্সের
-

মহানবী সা:-এর ব্যঙ্গচিত্র প্রদর্শনের পক্ষে প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর অবস্থানের প্রতিবাদে ফরাসি পণ্য বর্জনের যে ডাক দেয়া হয়েছে, তা রোধ করার জন্য মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর প্রতি অনুরোধ জানিয়েছে ফ্রান্স। ফ্রান্সের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ‘পণ্য বর্জনের এসব ডাক তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ হওয়া উচিত, পাশাপাশি আমাদের দেশের বিরুদ্ধে আক্রমণও বন্ধ হওয়া উচিত।’
আরব দেশগুলোর শপিংমলগুলোতে থরে থরে সাজানো থাকত ফ্রান্সের নানা পণ্য, তা এখন ফাঁকা। কুয়েত, জর্দান ও কাতারের কিছু দোকান থেকে ফরাসি পণ্য সরিয়ে ফেলা হয়েছে। ইতোমধ্যে লিবিয়া, সিরিয়া ও গাজা ভূখণ্ডে প্রতিবাদ হয়েছে।
রোববার জর্দান, কাতার ও কুয়েতের শপিংমলগুলোতে যেখানে ফরাসি পণ্য দিয়ে সুন্দর করে সাজানো থাকত, তা দেখা গেছে খাঁখাঁ করছে। চুলের প্রসাধনী এবং অন্য সব রকম প্রসাধনী উদাহরণ হিসেবে দেখা গেছে, তাক থেকে উধাও হয়ে গেছে। ফরাসি পণ্য অনেক বেশি আমদানি করে কুয়েত। সেখান থেকে এবার ফরাসি পণ্য বর্জনের ডাক দেয়া হয়েছে। সেখানকার ইউনিয়ন অব কনজুমার কো-অপারেটিভ সোসাইটি বলেছে, মহানবী হজরত মুহাম্মদ সা:কে নিয়ে বারবার অবমাননা করার প্রতিবাদে তারা পণ্য বর্জনের ডাক দিয়েছে। তবে ফরাসি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, পণ্য বর্জনের বিষয়টি তারা জানতে পেরেছে। পণ্য বর্জনের এই ডাক ভিত্তিহীন। অবিলম্বে এই পণ্য বর্জন বন্ধ করা হবে বলেও তারা আশা প্রকাশ করেছে। একই সাথে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে যেকোনো রকম আক্রমণ বন্ধ করতে বলা হয়েছে। আরো বলা হয়েছে, এসব ব্যবস্থা নিচ্ছে উগ্রপন্থী একটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়। সৌদি আরবসহ আরবের অন্য দেশগুলোতে ফরাসি পণ্য বর্জনের একই রকম ডাক দেয়া হয়েছে অনলাইনে। লিবিয়া, গাজা উপত্যকা এবং সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ হয়েছে।
ফ্রান্সে ইতিহাসের এক শিক্ষক ক্লাসে মহানবী সা:-এর ব্যঙ্গচিত্র দেখানোর কারণে হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার ঘটনায় দেশজুড়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ার পর ম্যাক্রোঁ কথিত মৌলবাদী ইসলামের বিপরীতে দেশের ধর্মনিরপেক্ষ মূল্যবোধ সমুন্নত রাখা নিয়ে দৃঢ়কণ্ঠে কথা বলেন। অথচ একই সাথে ‘ফ্রান্স ব্যঙ্গচিত্র দেখানো বন্ধ করবে না’ বলেও জানান তিনি। তার এসব মন্তব্যে বিশ্বজুড়ে মুসলিমদের মধ্যে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। ইসলামী বিধানে মহানবী সা: ও আল্লাহর কোনো ছবি প্রদর্শন স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ। এ ধরনের কোনো কিছু মারাত্মক অপরাধ বলে গণ্য হয়। অপর দিকে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে রাষ্ট্রকে পৃথক রাখার রীতি বা ধর্মনিরপেক্ষতা ফ্রান্সের জাতীয় পরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দু। ফ্রান্স বলছে, কোনো একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের অনুভূতিকে সুরক্ষা দিতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে দমন করা হলে তাতে তাদের জাতীয় ঐক্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
রোববার ফরাসি এই মূল্যবোধের পক্ষে ফের টুইট করে ম্যাক্রোঁ বলেছেন, ‘আমরা কখনোই হস্তক্ষেপ করব না’। অপর দিকে ‘বিশ্বাসের স্বাধীনতার’ প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন না করার জন্য ও ফ্রান্সের লাখ লাখ মুসলিমকে অবজ্ঞা করার জন্য ম্যাক্রোঁর তীব্র সমালোচনা করেছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোগান ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান।
উপসাগরীয় অঞ্চলসহ মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ফরাসি পণ্যসামগ্রী বর্জনের ডাক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রেন্ডে পরিণত হয়েছে।
প্রথমেই আসে খাদ্যশস্যের কথা । বিশ্বে শস্যের অন্যতম প্রধান রফতানিকারক দেশ ফ্রান্স। দেশটির কয়েকটি বৃহত্তম বাজার রয়েছে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ কিছু দেশে। ফ্রান্সের খামার মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, ফ্রান্সের কৃষিপণ্য রফতানির দশম বৃহত্তম বাজার আলজেরিয়া। গত বছর উত্তর আফ্রিকার এই দেশটিতে ফ্রান্স অন্তত ১৪০ কোটি ইউরোর কৃষিপণ্য রফতানি করেছে। মহানবী হজরত মুহাম্মদ সা:-এর কার্টুন প্রকাশ করায় ফ্রান্সের নিন্দা জানিয়েছে উত্তর আফ্রিকার আরেক মুসলিম দেশ মরক্কো। এই দেশটিতেও গত বছর ফ্রান্স ৭০০ মিলিয়ন ইউরো মূল্যের কৃষিপণ্য রফতানি করেছে। ফ্রান্সের কৃষিপণ্য রফতানির ১৭তম বৃহত্তম বাজার মরক্কো।
তারপর আসে সুপারমার্কেট প্রসঙ্গ। সৌদিতে বর্জনের অন্যতম টার্গেটে পরিণত হয়েছে ফরাসি সুপার মার্কেট চেইন ক্যারেফোর। ফরাসি এই সুপার মার্কেট চেইনের পণ্য বর্জনের ডাক সৌদি আরবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রেন্ড হয়েছে। ভোক্তাদের এই মার্কেটের পণ্য কেনা থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানাচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। ফরাসি এই খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান মধ্যপ্রাচ্য এবং দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে অংশীদারদের সাথে ফ্রাঞ্চাইজি ব্যবস্থার ভিত্তিতে ব্যবসা পরিচালনা করছে। মরক্কো, লেবানন, পাকিস্তান, বাহরাইনসহ আরো বেশ কিছু দেশে এই প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসায়িক কার্যক্রম রয়েছে।
তা ছাড়া ফ্রান্সের জ্বালানি জায়ান্ট প্রতিষ্ঠান টোটাল বিশ্বের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অনেক দেশে উপস্থিত রয়েছে। মহানবী হজরত মুহাম্মদ সা:-এর বিতর্কিত কার্টুন প্রকাশের জেরে যে কয়েকটি মুসলিম দেশে ব্যাপক প্রতিবাদ শুরু হয়েছে, সেই বাংলাদেশ, পাকিস্তান এবং তুরস্কে টোটালের পেট্রো-কেমিক্যাল এবং পেট্রোলিয়াম পণ্যের বড় বাজার রয়েছে। সৌদি আরবসহ আরব উপসাগরীয় বেশ কয়েকটি দেশে জ্বালানি অনুসন্ধান, উৎপাদন এবং পরিশোধনে টোটালের বিশাল বিনিয়োগ রয়েছে।
ফ্যানেসর ফ্যাশন ও বিলাসী পণ্যেরও বাজার রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে। রোববার কুয়েতের রাজধানী কুয়েত সিটিতে একটি দোকান পরিদর্শন করেছেন রয়টার্সের প্রতিনিধি। এ সময় তিনি ফরাসি কোম্পানি লরিয়েলের উৎপাদিত প্রসাধনী ও রূপচর্চার বিভিন্ন পণ্য দোকানের তাকে দেখতে পাননি। দোকানের মালিক বলেছেন, ফরাসি এই প্রতিষ্ঠানের পণ্য তারা সরিয়ে ফেলছেন। কুয়েতি এই দোকানের অন্তত ৭০টি আউটলেট রয়েছে; দেশটিতে তারা লরিয়েলের পণ্য বিক্রি বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যদিও ফরাসি ফ্যাশন খাতে লরিয়েলের অবদান অন্যান্য ব্র্যান্ডের তুলনায় সীমিত।
এশিয়া, ইউরোপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় মধ্যপ্রাচ্যে ফ্রান্সের প্রধান প্রধান ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলোর বাজার খুব বেশি বড় নয়। ফরাসি অন্যতম ব্র্যান্ড এলভিএমএইচের মালিকানায় রয়েছে লুইস ভিটন। সৌদি আরব, দুবাইসহ মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে এই ব্র্যান্ডের স্টোর রয়েছে। দেশের বাইরে ভ্রমণে যাওয়ার সময় মধ্যপ্রাচ্যের সম্পদশালীদের বিলাসবহুল পণ্যসামগ্রী কেনার প্রবণতা রয়েছে।
ঝুঁকিতে পড়বে ফ্রান্সের সামরিক পণ্যেরও রফতানি। বিশ্বে অন্যতম প্রধান অস্ত্র রফতানিকারক দেশ ফ্রান্স। দেশটির থ্যালেস কোম্পানি বিশ্বের বেশ কিছু মুসলিম দেশে অস্ত্র, অ্যারোনটিকস প্রযুক্তি ও গণপরিবহন ব্যবস্থার ব্যবসা রয়েছে। কোম্পানিটির ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, তুরস্ক ও কাতার থ্যালেসের অন্যতম ক্রেতা। থ্যালেসের কাছ থেকে রাফাল সামরিক যুদ্ধবিমান থেকে শুরু করে ডাসল্টও কিনে মিসর ও কাতার; এই অঞ্চলে থ্যালেসের অন্যতম বিশাল দুই বাজার। এ ছাড়া আরো কিছু দেশ থ্যালেসের ক্রেতা।



আরো সংবাদ