৩০ নভেম্বর ২০২০

সামাজিক অবক্ষয় ও অস্থিরতা চরমে

-

দেশে সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, অসন্তোষ ও অস্থিরতা চরম আকার ধারণ করেছে। একের পর এক খুন, হত্যা, ধর্ষণ, মারামারি, হানাহানি, সংঘর্ষসহ সমাজে নানা অনাচার-অত্যাচার লেগেই আছে। বিশেষ করে দুর্বলের ওপর সবলের আঘাত এখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। যুবকদের বড় একটি অংশ মদ, গাঁজা, ফেনসিডিল, ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদকাসক্ত হয়ে পড়েছে। বখাটের খাতায় নাম লেখাচ্ছে উঠতি বয়সের কিশোর ছাত্ররা। প্রায় প্রতিটি পাড়া-মহল্লøায় গড়ে উঠেছে কিশোর গ্যাং; যাদের ভয়ে নারী ও শিশুরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। অভিভাবকরাও তাদের সন্তান নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় দিনযাপন করছেন। প্রতিহিংসার রাজনীতির শিকার হয়ে আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি অনেকেই ভিটেমাটি ছাড়া হচ্ছেন।
তেমনই একজন প্রতিহিংসার শিকার সিরাজ ইসলাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্মান ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করা সিরাজের স্বপ্ন ছিল উদ্যোক্তা হওয়ার। যেখানে শুধু সিরাজই স্বাবলম্বী হবে এমনটা নয়, ভবিষ্যতে অনেকেই তার হাতে গড়া প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে সংসার চালাবে। কিন্তু গ্রাম্য মোড়লদের রোষানলে পড়ে সব হারিয়ে এখন পথে বসেছেন তিনি। নওগাঁ জেলার ধামাইরহাট উপজেলার নিজ গ্রামেই ধারকর্জ করে ১৩ বিঘা জমির ঘেরে মাছ চাষ শুরু করেন সিরাজ। মাছ বেশ বড় হয়েছে; কিন্তু এরই মধ্যে গত সোমবার গভীর রাতে পুকুরে বিষ ঢেলে দেয় দুর্বৃত্তরা। এক দিন না যেতেই ঘেরের সব মাছ মরে ভেসে উঠেছে। এতে প্রায় ২০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। সিরাজ এখন দিশেহারা, তার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে কিভাবে ধারদেনা পরিশোধ করবে আর ভবিষ্যতে সে কী করবে?
নোয়াখালীর একলাশপুরে গৃহবধূকে বিবস্ত্র করে নির্যাতনের রেশ কাটতে না কাটতেই গত মঙ্গলবার ভোরে জেলার চাটখিলে বসতঘরে ঢুকে চাচীকে ধর্ষণ এবং ধর্ষণের দৃশ্য ভিডিও করে প্রতিবেশী ভাসুরের ছেলে শরীফ বাহিনীর প্রধান ও ইউনিয়ন যুবলীগ সভাপতি মজিবুর রহমান শরীফ ও তার লোকজন। একই দিনে সাতক্ষীরা সদর উপজেলার শিমুলবাড়িয়া পূর্বপাড়া গ্রামে দ্বিতীয় শ্রেণীর ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগে পঞ্চম শ্রেণীর এক মাদরাসাছাত্রকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। মঙ্গলবার নীলফামারীর ডিমলায় ১০ বছরের এক ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগে শাহজামাল (২৫) নামের এক যুবককে গ্রেফতার করেছে থানা পুলিশ। একই দিনে জয়পুরহাট সদর উপজেলার ভাদসা পার্বতীপুর গ্রামে ৯ বছরের এক কন্যাশিশুকে ধর্ষণ চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। ওই ঘটনায় থানায় একটি মামলা হয়েছে।
গত ৬ অক্টোবর নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলা চরজব্বর ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডে মা নুরজাহান বেগম তার ছেলের হাতে নির্মমভাবে খুন হয়েছেন। রাতে পূর্বপরিকল্পিতভাবে হত্যার পর পাঁচ টুকরা করে পাশের ধানক্ষেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখে নিহতের ছেলে হুমায়ুন ও তার সহযোগীরা। গত বুধবার পারিবারিক বিরোধের জের ধরে সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার খলিসা গ্রামে বড় ভাই-ভাবী এবং ভাতিজা ও ভাতিজিকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে ছোট ভাই রায়হানুল। গত ১১ অক্টোবর নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার আদমপুর এলাকায় মাদক কারবারি ও অবৈধ গ্যাস সংযোগের সংবাদ প্রকাশ করায় সাংবাদিক ইলিয়াস শেখকে কুপিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে স্থানীয় সন্ত্রাসী তূর্য, তুষার ও তাদের সহযোগীরা। শুধু নোয়াখালী, জয়পুরহাট, সাতক্ষীরা, নওগাঁ, নারায়ণগঞ্জে নয়, দেশের প্রায় প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় এ ধরনের নির্মম ও পৈশাচিক অপরাধ কর্মকাণ্ড সংঘটিত হচ্ছে। কোনোটার খবর গণমাধ্যমে আসছে আবার প্রত্যন্ত অঞ্চলের বেশির ভাগ খবর গণমাধ্যমে আসছে না। যার হিসাব হয়তো থানা পুলিশের রেকর্ডেও থাকছে না। অপরাধী প্রভাবশালী হলে তো কথাই নেই। ক্ষমতার দাপটে অথবা টাকার প্রভাবে ঘটনা ধামাচাপা পড়ে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটছে অহরহ।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্যমতে, জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গত ৯ মাসে দেশে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৯৭৫ জন নারী, ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে ২০৪ জনকে, ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৪৩ জনকে এবং ধর্ষণের পর আত্মহত্যা করেছেন ১২ জন। পারিবারিক কলহের জেরে স্বামীর হাতে ১৮৩ জন স্ত্রী নিহত হয়েছেন, স্বামীর পরিবারের মাধ্যমে ৫২ জন নারী নিহত হয়েছেন, নিজ পরিবারের মাধ্যমে নিহত হয়েছেন ৪৪ জন নারী এবং আত্মহত্যা করেছেন ৭৪ জন। গত ৯ মাসে ৩২টি গৃহকর্মী নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে, এর মধ্যে ১৭ জন গৃহকর্মী মারা গেছেন। যৌতুকের দাবিতে নির্যাতনের ঘটনায় মারা গেছেন ৬৬ জন নারী, নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে ৭৩টি এবং এ ঘটনায় কেস ফাইল হয়েছে ১১৫টি। সারা দেশে এসিড সন্ত্রাসের শিকার হয়েছে ২১ জন নারী ও শিশু। গত ৯ মাসে ৪৪৫ জন শিশু নির্মম হত্যার শিকার হয়েছে, যার মধ্যে ২১১টি কেস ফাইল হয়েছে এবং ১০৭৮ জন শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে, যার মধ্যে ৬৪৮টি কেস ফাইল হয়েছে। সারা দেশে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ১৬১ জন নারী এবং পুরুষ নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৮৪ জন। এর মধ্যে ১২ জন নারী আত্মহত্যা করেছেন। দেশে ১০৭টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। এসব ঘটনায় ২৫ জন নিহত ও এক হাজার ২২৬ জন আহত হয়েছেন। এসব শুধু মূলধারার কয়েকটি পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা আসকের প্রতিবেদন। ধারণা করা হচ্ছে, উল্লেখিত সংখ্যার চেয়ে প্রকৃত সংখ্যাটা কয়েক গুণ বেশি চিত্র আরো ভয়াবহ।


আরো সংবাদ