২৭ অক্টোবর ২০২০

এমসি কলেজের ঘটনায় দোষ স্বীকার করছে না ধর্ষকরা

৫ দিনের রিমান্ডে তারেক ও মাহফুজ
-

সিলেটের এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে স্বামীকে বেঁধে স্ত্রীকে দলবদ্ধ ধর্ষণ মামলার এজাহারভুক্ত আসামি তারেকুল ইসলাম তারেক (২৮) ও মাহফুজুর রহমান মাসুমের পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। এর ফলে এ দু’জনসহ মামলার এজাহারভুক্ত ছয় আসামির সবাইকেই পাঁচ দিন করে রিমান্ড পেলো পুলিশ। এ দিকে আসামিদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। কেউ এখনো দোষ স্বীকার করেনি। ধর্ষকরা নিজেদের বাঁচানোর জন্য নানা কৌশলের আশ্রয় নিচ্ছে। গৃহবধূ সম্পর্কে করছে বাজে মন্তব্য। প্রধান আসামি সাইফুল আদালতে নিজেকে নির্দোষ দাবি করে এ ঘটনায় আটক তারেক, রাজন ও আইনুদ্দিন জড়িত বলে জানান। গতকাল বুধবার মাহফুজ আদালতে দাবি করেছেন তিনি ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকলেও অপকর্মে ছিলেন না। এ দিকে এই জঘন্য ঘটনার প্রতিবাদে সিলেটে বিভিন্ন সংগঠন নানা কর্মসূচি পালন করছে। তারা দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
সিলেট মহানগরের শাহপরাণ থানা পুলিশ গতকাল তারেকুল ইসলাম তারেককে চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করে। শুনানি শেষে বিচারক আবুল কাশেম পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এ সময় আসামির পক্ষে কোনো আইনজীবী শুনানিতে অংশ নেননি। গত মঙ্গলবার রাতে তারেকুল ইসলাম তারেককে সুনামগঞ্জের দিরাই থেকে গ্রেফতার করে র্যাব-৯। এর আগে মামলার এজাহারভুক্ত আসামি মাহফুজুর রহমান মাসুমের পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন একই আদালত। দুপুরে শাহপরাণ থানা পুলিশ তাকে আদালতে হাজির করে। এ সময় মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ইন্দ্রানীল ভট্টাচার্য আদালতে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। পরে শুনানি শেষে আদালতের বিচারক পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। তবে ওই সময় আদালতে আসামির পক্ষে কোনো আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন না।
গত সোমবার সিলেট জেলা ডিবি ও কানাইঘাট থানা পুলিশের যৌথ অভিযানে জৈন্তাপুর উপজেলার হরিপুর এলাকা থেকে মাহফুজুর রহমান মাসুমকে গ্রেফতার করা হয়।
উপস্থিত থাকলেও অপকর্মে জড়িত নই : আদালতে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন মাহফুজ। তিনি ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকলেও এ ঘটনায় জড়িত নন বলে দাবি করেছেন। গতকাল তার রিমান্ড শুনানিকালে রাষ্ট্রপক্ষের সহায়তাকারী আইনজীবী দেবব্রত চৌধুরী লিটন জানান, নিজেকে নির্দোষ দাবি করে মাহফুজ আদালতে বলেছেন, ফোনে খবর পেয়ে মোটরসাইকেল নিয়ে আমি ছাত্রাবাসে গিয়েছিলাম। তবে ধর্ষণের সাথে আমি জড়িত নই। লিটন বলেন, মাহফুজ নিজের পক্ষে সাফাই গাওয়া শুরু করলে আদালত তাকে থামিয়ে দেন।
গৃহবধূকে নিয়ে কটূক্তি : গৃহবধূকে ধর্ষণের ঘটনায় এ পর্যন্ত ৮ আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। কিন্তু এদের কেউই ধর্ষণে নিজের সম্পৃক্ত থাকার কথা স্বীকার করছে না। তারা একেক সময় একক তথ্য দিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে নিজেদের রক্ষার অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। প্রধান আসামি সাইফুর, অর্জুন ও রবিউলকে গত সোমবার আদালতে হাজির করে তাদের রিমান্ড শুনানিকালে এক আসামি জানায়, ঘটনার সাথে তাদের সম্পুক্ততা নেই। তারা ঘটনা জানে না। এ ঘটনা ঘটিয়েছে রাজন, তারেক ও আইনুদ্দিন। ওই দিন আদালত থেকে বেরিয়ে এসে আইনজীবীরা জানান, গ্রেফতারকৃত আসামিদের মধ্যে অনুশোচনা নেই। লোমহর্ষক ঘটনা ঘটিয়েও তারা বিব্রত নয়। পরদিন আদালতে হাজির করা হয় আসামি শাহ মাহবুবুর রহমান রনি, রাজন ও আইনুদ্দিন আইনুলকে। এ সময় আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের শতাধিক আইনজীবী ছিলেন। শুনানির একপর্যায়ে আত্মপক্ষ সমর্থনের বক্তব্যকালে আসামি রাজন ‘গৃহবধূকে নিয়ে কটূক্তি করে। তার এ কটূক্তিতে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেন আইনজীবীরা। সব আইনজীবী একসাথে প্রতিবাদ জানান। আইনজীবীরা বলেন, ঘটনাটিকে ভিন্ন দিকে প্রবাহিত করতে আসামিরা এ ধরনের মন্তব্য করছে। আসামিদের রিমান্ড শুনানি শেষে বেরিয়ে এসে সিনিয়র আইনজীবী হাবিবুর রহমান হাবিব বলেন, ওদের দম্ভোক্তি কমেনি। তারা ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহের চেষ্টা করছে। এতে আমরা প্রতিবাদ করেছি। তিনি বলেন, এমসি কলেজ হচ্ছে আমাদের প্রাণের কলেজ। ঐতিহ্যবাহী এই বিদ্যাপীঠের ঐতিহ্যে আঘাত করেছে আসামিরা। সুতরাং আমাদের জেলা বারের কোনো আইনজীবীই ধর্ষকদের পক্ষে দাঁড়াবে না।
আসামি শাহ রনি, রাজন ও আইনুদ্দিনকে গ্রেফতার করেছিল র্যাব। গ্রেফতারের পর তাদেরকে র্যাব প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ করে। সংবাদমাধ্যমে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে র্যাব জানিয়েছিল, আসামিদের কাছ থেকে চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। র্যাবের হাতে গ্রেফতার হওয়া আইনুদ্দিন সিলেটের আলোচিত মজিদ ডাকাতের নাতি। সে এলাকায় ইয়াবা ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত। তার নেতৃত্বে বালুচর পয়েন্ট থেকে টুলটিকর পর্যন্ত ইয়াবা ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ হয়। ছাত্রলীগ রঞ্জিত গ্রুপের সক্রিয় নেতা হিসেবে পরিচিত সে। সোমবার রাতে উল্লিখিত তিন আসামিকে শাহপরাণ থানা পুলিশে হস্তান্তরের পর আসামিরা ধর্ষণের ঘটনা নিয়ে নানা নাটকীয়তার আশ্রয় নেয়। তারা পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে নিজেদের নির্দোষ দাবি করে। পুলিশ জানায়, গ্রেফতারের পর আসামিরা ধর্ষণের শিকার হওয়া গৃহবধূর ওপর দোষ চাপাতে চাচ্ছে। ফলে পুলিশ তাদের কথা বিশ্বাস করছে না। পুলিশের ধারণা ঘটনাটিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে আসামিরা চালাকি করছে।
ল’ইয়ার্স কাউন্সিল নিন্দা : গৃহবধূকে গণধর্ষণের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন বাংলাদেশ ল’ইয়ার্স কাউন্সিল সিলেটের নেতারা। এ ঘটনায় জড়িত সব অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানান তারা। এক বিবৃতিতে ল’ইয়ার্স কাউন্সিল সিলেটের সভাপতি অ্যাডভোকেট মো: আলিম উদ্দিন ও সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আব্দুর রব, সহসভাপতি অ্যাডভোকেট মো: সিরাজুল ইসলাম, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট জামিল আহমদ রাজু ও অ্যাডভোকেট তৌহিদুল ইসলাম সোহাগ, সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট মো: আব্দুল খালিক, সহসাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট ইয়াসীন খান, সহসাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আজিম উদ্দিন, অ্যাডভোকেট দিলওয়ার হোসেন শামীম ও অ্যাডভোকেট রেজাউল করিম প্রমুখ নেতা বলেন, এমসি কলেজ ছাত্রাবাসের মতো স্থানে স্বামীর কাছ থেকে স্ত্রীকে কেড়ে নিয়ে গণধর্ষণের ন্যক্কারজনক ঘটনায় সিলেটবাসী মর্মাহত। এই নিকৃষ্ট কর্মকাণ্ডে শুধু এমসি কলেজের ইতিহাস কলুষিত হয়নি, গোটা সিলেটের ইতিহাস ঐতিহ্যে আঘাত এসেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সর্বোচ্চ প্রচেষ্টায় ইতোমধ্যে সব আসামি গ্রেফতার হয়েছে। সিলেটের বিজ্ঞ আইনজীবীরা ধর্ষকদের পক্ষে আদালতে না দাঁড়িয়ে এক অনন্য নজির স্থাপন করেছেন।


আরো সংবাদ