২৮ অক্টোবর ২০২০

অস্ত্র আইনে সাহেদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড

-

অস্ত্র আইনের মামলায় রিজেন্ট গ্রুপ ও রিজেন্ট হাসপাতাল লিমিটেডের চেয়ারম্যান সাহেদ করিম ওরফে মোহাম্মদ সাহেদকে দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করেছেন আদালত। আদালত গতকাল ঢাকার মহানগর দায়রা জজ কে এম ইমরুল কায়েস এক জনাকীর্ণ আদালতে এ দণ্ডাদেশ দেন।
১৮৭৮ সালের অস্ত্র আইনের ১৯ (এ) ধারায় করা মামলায় সাহেদকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড ও অস্ত্র আইনের ১৯ (এফ) ধারায় তাকে সাত বছরের কারাদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন আদালত। উভয় সাজা একসাথে চলবে বলে আদালত রায়ে উল্লেখ করেন। সাহেদের আইনজীবী মনিরুজ্জামান বলেন, ‘এ রায়ে আমরা সন্তুষ্ট হতে পারিনি। রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে যাবো।’ রায়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করে ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর রায় ঘোষণার পর রাষ্ট্রপক্ষের পাবলিক প্রসিকিউটর আব্দুল্লাহ আবু বলেন, ‘সাহেদ যে অপরাধী তা মামলার রায়ে প্রমাণিত হয়েছে। এ রায় সমাজে দৃষ্টান্ত হিসেবে থাকবে।’
রায়ের পর্যবেক্ষণে বিচারক উল্লেখ করেন, ‘আমাদের সমাজে সাহেদের মতো ভদ্রবেশে অনেক লোক রয়েছে। এ মামলার রায় এর দৃষ্টান্ত হিসেবে কাজ করবে। সাহেদ ২০ লাখ টাকা লোন নিয়ে গাড়িটি ক্রয় করেন; কিন্তু তিনি আদালতের কাছে তা স্বীকার করেননি। সাহেদ তা জানা সত্ত্বেও আদালতের কাছে মিথ্যা তথ্য দেন। সাহেদ অত্যন্ত চালাক ও ধুরন্ধর ব্যক্তি। সাহেদ গাড়িতে অস্ত্র রাখার বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ায় তিনি আদালতের কাছে কোনো অনুকম্পা পেতে পারেন না।’ এ দিন রায় ঘোষণার আগে সাহেদকে কারাগার থেকে আদালতে হাজির করা হয়। মামলায় ১৪ সাক্ষীর মধ্যে বিভিন্ন সময়ে ১১ জন আদালতে সাক্ষ্য দেন।
গত ৬ জুলাই রিজেন্ট হাসপাতালের উত্তরা ও মিরপুর শাখায় অভিযান চালায় রথ্যাব। অভিযানে ভুয়া করোনা পরীক্ষার রিপোর্ট, করোনা চিকিৎসার নামে রোগীদের কাছ থেকে অর্থ আদায়সহ নানা অনিয়ম উঠে আসে। এ ঘটনার পর পালিয়ে যান সাহেদ। ১৫ জুলাই সাহেদকে সাতক্ষীরার সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে গ্রেফতার করে রথ্যাব। পরে তাকে হেলিকপ্টারে সাতক্ষীরা থেকে ঢাকায় আনা হয়। করোনা পরীক্ষার নামে ভুয়া রিপোর্টসহ বিভিন্ন প্রতারণার অভিযোগে দায়ের করা মামলায় ১৬ জুলাই সাহেদকে ১০ দিনের রিমান্ডে নেয়া হয়। এরপর ১৯ জুলাই তাকে নিয়ে উত্তরার বাসার সামনে অভিযান চালায় ডিবি পুলিশ। সেখানে সাহেদের নিজস্ব সাদা প্রাইভেট কার থেকে পাঁচ বোতল বিদেশী মদ, ১০ বোতল ফেনসিডিল, একটি পিস্তল এবং একটি গুলি উদ্ধার করা হয়। এরপর উত্তরা পশ্চিম থানায় অস্ত্র ও মাদক নিয়ন্ত্রণ আইনে দু’টি মামলা করা হয়। ৩০ জুলাই ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে সাহেদের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনের মামলায় চার্জশিট দাখিল করা হয়। এরপর ২৭ আগস্ট তার বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করেন আদালত। ২০ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষের যুক্তি উপস্থাপন শেষে রায় ঘোষণার জন্য ২৮ সেপ্টেম্বর দিন ধার্য করেন ঢাকা মহানগর দায়রা জজ কে এম ইমরুল কায়েশ। মামলাটির আট কার্যদিবসে বিচারিক কার্যক্রম শেষ করা হয়।
রায়ে যা বলা হয়েছে : রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আব্দুল্লাহ আবু আদালত চত্বরে সাংবাদিকদের বলেন, অস্ত্র আইনে তাকে দু’টি ধারায় কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। একটি ধারায় মোহাম্মদ সাহেদকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়। আর অন্য একটি ধারায় দেয়া হয় সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড।
আদালতের পর্যবেক্ষণ উল্লেখ করে তিনি জানান, যে বিচারক বলেছেন, তার মতো ভদ্রবেশী প্রতারক সমাজে মানুষের ক্ষতি করেছে। সে আদালতের অনুকম্পা পাওয়ার যোগ্য নয়।
সাহেদের আইনজীবী মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান জানিয়েছেন, এই রায়ে তারা অসন্তুষ্ট। তিনি বলেছেন, তারা উচ্চ আদালতে আপিল করবেন। রিজেন্ট হাসপাতালের মালিককে গ্রেফতারের পর তার বাড়িতে অভিযান চালিয়ে মদ, ফেনসিডিল, অস্ত্র ও গুলি উদ্ধার করার পর তার বিরুদ্ধে অস্ত্র ও মাদক নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা করা হয়েছিল। তিরিশে জুলাই করা মামলায় আগস্টের শেষের দিকে অভিযোগ গঠন করা হয়। সেপ্টেম্বরে আদালতে আট কার্যদিবস শুনানি শেষে এই রায় দেয়া হলো।
করোনাভাইরাস শনাক্তের পরীক্ষায় জালিয়াতি, প্রতারণা ও অনিয়মের বহুল আলোচিত ঘটনায় বেশ ক’টি মামলা হয়েছে। তবে সাহেদের বিরুদ্ধে প্রথম রায় হলো অস্ত্র আইনের মামলায়।
ওই হাসপাতালে প্রায় ১০ হাজার মানুষের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হয়েছিল। অভিযানের পর র্যাবের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল যে এর মধ্যে ৪,৫০০টি পরীক্ষা ফলাফল ভুয়া ছিল। নমুনা পরীক্ষা না করেই রোগীদের ভুয়া ফলাফল দেয়া হয় বলে তারা জানিয়েছিল।
নানা টকশোতে বক্তব্য দেয়া মোহাম্মদ সাহেদ আরো বেশি আলোচনায় আসেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা ও শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তাদের সাথে তার বহু ছবি ফেসবুকে প্রকাশের পর।


আরো সংবাদ