২৮ অক্টোবর ২০২০

এমসি কলেজে গণধর্ষণ ৫ দিনের রিমান্ডে ৩ ধর্ষক

-

সিলেট সরকারি এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে স্বামীকে বেঁধে রেখে স্ত্রীকে গণধর্ষণের মামলার প্রধান আসামি সাইফুর রহমান, অর্জুন লস্কর ও রবিউলকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। এ মামলায় র্যাব ও পুলিশ এ পর্যন্ত এজাহারভুক্ত চারজনসহ মোট ছয়জনকে গ্রেফতার করেছে।
গতকাল সোমবার দুপুরে সিলেট মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সাইফুর রহমানের আদালতে অর্জুন ও সাইফুরকে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করা হলে শুনানি শেষে বিচারক পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
রিমান্ড শুনানিকালে এই দুই আসামির পক্ষে কোনো আইনজীবী উকালতনামা আদালতে দাখিল করেননি। শুনানিকালে বিচারক সাইফুর ও অর্জুনের পক্ষে কোনো আইনজীবী না পেয়ে তাদের বক্তব্য জানতে চাইলে তারা আদালতকে জানায়, ছাত্রাবাসের ঘটনার সাথে আমরা জড়িত নই। আমরা কোনো অপরাধ করিনি। এই ঘটনা ঘটিয়েছে রাজন, তারেক ও আইনউদ্দিন।
এর আগে বেলা ১১টা ৪০ মিনিটে কড়া পুলিশ প্রহরায় প্রিজন ভ্যানে করে আদালতে নিয়ে আসা হয় সাইফুর রহমান ও অর্জুন লস্করকে। আদালত চত্বরে হাজির করার পর পুলিশি নিরাপত্তার মধ্যেই বিক্ষোভ করেন উপস্থিত জনতা। এই দুই আসামিকে নিয়ে আসার পর আদালতে চত্বরে শতাধিক লোক জড়ো হন। তারা দুই আসামিকে দেখা মাত্রই ‘ফাঁসি চাই, ফাঁসি চাই’ সেøাগান শুরু করেন। কেউ কেউ ‘মার, মার’ বলেও হাঁক দেন। তবে পুলিশ তৎপর থাকায় কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। এ ছাড়া মামলার ৪ নম্বর আসামি ও কলেজ শাখা মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের সভাপতি রবিউল ইসলামকেও পাঁচ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। গতকাল বেলা সাড়ে ৩টার দিকে সিলেট মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট দ্বিতীয় আদালতের বিচারক সাইফুর রহমান এই রিমান্ড মঞ্জুর করেন। আদালত সূত্র জানায়, তিন আসামিকেই আদালতে হাজির করে সাত দিন করে রিমান্ড চাওয়া হয়েছিল। আদালত তাদের পাঁচ দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
এ দিকে এমসি কলেজে তরুণীকে ধর্ষণের ঘটনায় রাজন মিয়া ও মো: আইনুদ্দিন নামের দু’জনকে রোববার মধ্যরাতে সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ থেকে গ্রেফতার করে র্যাব। সোমবার দুপুরে এই দুইজনকে গ্রেফতারের কথা স্বীকার করেছে র্যাব। র্যাবের গণমাধ্যম শাখা থেকে প্রেরিত এক খুদে বার্তায় রাজন মিয়া ও আইনুদ্দিনকে গ্রেফতারের তথ্য জানানো হয়।
গত শুক্রবার রাতে এমসি কলেজের ছাত্রাবাসে ধর্ষণের ঘটনায় শনিবার নির্যাতিতার স্বামী নগরের শাহপরান থানায় যে মামলা করেন তাতে ছয়জনের নাম উল্লেখ করে ৯ জনকে আসামি করা হয়। যাদের নাম উল্লেখ করা হয় তাদের মধ্যে রাজন ও আইনুদ্দিনের নাম ছিল না। তবে ধর্ষণের পর থেকেই আলোচিত হতে থাকে এ দুইজনের নাম। গতকাল প্রধান আসামি সাইফুর রহমান আদালতেও এই দুইজনের সম্পৃক্ততার কথা জানিয়েছে।
উল্লেখ্য, গত শুক্রবার বিকেলে ওই তরুণী তার স্বামীকে নিয়ে নিজস্ব কারে এমসি কলেজে ঘুরতে আসেন। এ সময় ছাত্রলীগের ছয় ক্যাডার তাদের জিম্মি করে ছাত্রাবাসে নিয়ে যায়। সেখানে মারধরের পর স্বামীকে বেঁধে তরুণীকে ধর্ষণ করে। রাত সাড়ে ১০টার দিকে ওই দম্পতিকে ছাত্রাবাস থেকে উদ্ধার করে পুলিশ। পরে ধর্ষণের শিকার তরুণীকে সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ওসিসি সেন্টারে ভর্তি করা হয়।
সাইফুরের যত অপকর্ম : বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর ছাত্রলীগ সিলেটে বেপরোয়া হয়ে উঠে। প্রতিপক্ষ ছাত্র সংগঠনগুলোকে ক্যাম্পাসছাড়া করে তারা সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। বিশেষ করে ঐতিহ্যবাহী এমসি কলেজ ও সংলগ্ন টিলাগড় এবং আশপাশ এলাকা ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আস্তানায় পরিণত হয়। তারা এ পর্যন্ত অসংখ্য অপকর্মের ঘটনা ঘটিয়েছে, যার শিকার বেশির ভাগই প্রাণের ভয়ে তা প্রকাশ করেননি। স্থানীয় কিছু আওয়ামী লীগ নেতার প্রত্যক্ষ মদদে সন্ত্রাসীদের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। তারা প্রায়ই নিজেরা সশস্ত্র সঙ্ঘাতে লিপ্ত হয়। এ পর্যন্ত ১২ জনেরও বেশি নেতাকর্মী নিহত হয়েছে নিজেদের মারামারিতে। এমসি কলেজ কেন্দ্রিক সন্ত্রাসীদের সংখ্যা অনেক। বর্তমানে বেশি অপকর্মে যারা লিপ্ত তাদের অন্যতম হচ্ছে ধর্ষণ মামলার প্রধান আসামি সাইফুর রহমান। এমসি কলেজ ও ছাত্রাবাসে সংঘটিত সব অপকর্মে সে জড়িত। ছাত্রাবাসে অবৈধ সিট দখল, সিট বাণিজ্য, খাবারের টাকা না দেয়া, ক্রীড়া সামগ্রীর জিনিসপত্র বিক্রি করে দেয়া, সাধারণ ছাত্রদের হয়রানি, মারধর, গালাগাল, মিছিল-মিটিংয়ে যাওয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করা, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের লাঞ্ছিত করা ছিল তার নিত্যনৈমিত্তিক কাজ। ছাত্রাবাসের পাশের বাজার বালুচরে দোকান থেকে মালামাল নিয়ে কখনো টাকা পরিশোধ করত না। ছাত্রলীগের নাম ভাঙিয়ে সে দলবল নিয়ে রেস্টুরেন্টে ও বিভিন্ন দোকানে খাওয়া-দাওয়া করত। এমসি কলেজ রিপোর্টার্স ইউনিটির সাধারণ সম্পাদক আজহার উদ্দিন শিমুল তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে উল্লেখ করেছেন, কলেজ ক্যাম্পাসে সাধারণ ছাত্রীদের ইভটিজিং করা ছিল তার নেশা। তার ভয়ে এমসি কলেজের এক ছাত্রী দেড় বছর পর্যন্ত ক্যাম্পাসে না আসার নজির রয়েছে। স্ট্যাটাসে বলা হয়, মেয়েদের ওড়নায় টান দেয়া ছিল তার খুব সাধারণ একটি কাজ। সাইফুরের বিরুদ্ধে প্যান্টের বেল্ট খুলে মারধরের অভিযোগ রয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ছাত্র জানান, ২০১৮ সালে তিনিসহ তার বন্ধুরা মিলে আড্ডা দিচ্ছিলেন কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ ভবনের সামনে। এ সময় সাইফুর এসে তাদের সাথে থাকা মেয়ে বন্ধুটিকে উত্ত্যক্ত করে। এর প্রতিবাদ করায় সাইফুর সবাইকে বেধড়ক প্যান্টের বেল্ট দিয়ে পেটাতে থাকে। ঘটনা শুনে মেয়েটির গরিব অভিভাবক তাড়াহুড়ো করে মেয়ের বিয়ে দিয়ে দেন।
এক সংবাদকর্মী তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, ‘২০১৪ সালের ১৬ অক্টোবর। দিনটি ছিল বৃহস্পতিবার। ঘড়িতে তখন সময় বেলা সাড়ে ১২টা। আমার সমাজবিজ্ঞান ডিপার্টমেন্টের ভবনের সামনের বরই তলায় বন্ধুরা আড্ডা দিচ্ছিল। ক্লাস ছিল না সেদিন। তাই আমি দেরিতে ক্যাম্পাসে যাই। মূলত, ডিপার্টমেন্ট অফিসে জমা দেয়া ইন্টারমিডিয়েটের মূল ট্রান্সক্রিপ্ট তুলতেই যাওয়া। বড়ইতলায় বন্ধুদের সাথে কিছুক্ষণ আড্ডা দেই। পরে জোহরের আজান হয়ে যাওয়াতে সবাই চলে যায়। তখনো আমার কাজিনসহ আরো তিন-চারজন মেয়ে বন্ধু কেন্দ্রীয় মিলনায়তনের সামনের সিঁড়িতে বসে গল্প করছিল। তাদের সেখানে দেখতে পেয়ে আমিও সেখানে যাই। অনুমানিক দেড়টার দিকে তাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে যখনই ডিপার্টমেন্টে ফিরছিলাম তখনই পেছন থেকে সাইফুরের ডাক। এই দাঁড়া। আমি ফিরতে না ফিরতেই সাইফুর, অভিসহ ছয়-সাতজন ছাত্রলীগ ক্যাডার হামলে পড়ে আমার ওপর। কোনো কিছু বুঝার আগেই তারা আহত করে আমাকে। এমনকি এই সাইফুর আমার গলায় পা দিয়ে পাড়া দেয়। আমার মাস্টার্স শেষ হয়েছে ২০১৮তে। এ ঘটনার পেরিয়েছে ছয় বছর। সময়ের পরিবর্তনে ক্যাম্পাস আর হোস্টেলে বড় নেতা হয়ে গেছে সাইফুর। এই সাইফুররা একদিনে তৈরি হয়নি। তাদের তৈরি করা হয়েছে। শুধু আমি নই, তার বিরুদ্ধে ক্যাম্পাসে তারই দলের কর্মীকে ছুরিকাঘাত করে মৃত ভেবে ফেলে রাখার অভিযোগ আছে। আছে ক্যাম্পাসে আগত দর্শনার্থীদের হয়রানি, ছিনতাই, চাঁদাবাজিসহ নানা অভিযোগও। এমন সাইফুর তৈরির পেছনের কারিগরদেরও মুখোশ উন্মোচন করে শাস্তির আওতায় আনা প্রয়োজন।’
জানা যায়, এমসি কলেজ ছাত্রাবাসকে কেন্দ্র করে সাইফুর একটি টর্চার সেল গড়ে তুলে। হোস্টেল সুপারের বাংলো দখল করে থাকত সাইফুর। ভয়ে অন্যত্র থাকতেন হোস্টেল সুপার জামাল উদ্দিন। হোস্টেলের নতুন ভবনের ২০৫ নম্বর কক্ষ ও বাংলাতে সাইফুরের নেতৃত্বে বসানো হয় ‘শিলং তীর জুয়া’র আসর। এ ছাড়া প্রতিদিন রাতে বসত মাদকের আসর। করোনা পরিস্থিতির কারণে হোস্টেল বন্ধ থাকায় নিজের দখলে থাকা হোস্টেলের রুমকে মাদক সেবন ও ইয়াবা ব্যবসার আখড়ায় পরিণত করে সাইফুর। গণধর্ষণের ঘটনার পর শুক্রবার রাতে সাইফুরের দখলে থাকা হোস্টেলের ২০৫ নম্বর রুম থেকে আগ্নেয়াস্ত্র, ধারাল ও দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় সাইফুরের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে মামলাও হয়েছে। ২০১৩ সালে কলেজে নতুন শিক্ষার্থী ভর্তির সময় চাঁদাবাজি শুরু করে সাইফুর ও তার সহযোগীরা। এতে বাধা দেয়ায় নিজ দলের কর্মী ছদরুল ইসলামের বুকে ছুরিকাঘাত করে সাইফুর। গুরুতর আহত ছদরুলকে সিলেট থেকে নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকা পঙ্গু হাসপাতালে। পরে নেতাদের চাপে ছদরুল বাধ্য হয় মামলায় আপস করতে।


আরো সংবাদ