২৮ অক্টোবর ২০২০

ড্রাইভার থেকে শত কোটি টাকার মালিক মালেক

জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার
ড্রাইভার থেকে শত কোটি টাকার মালিক মালেক -

স্বাস্থ্য অধিদফতরের গাড়িচালক আবদুল মালেক ওরফে মালেক ড্রাইভার অবৈধভাবে গড়ে তুলেছেন শত কোটি টাকার সম্পদ। রিমান্ডে র্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে তিনি শত কোটি টাকার সম্পদের কথা স্বীকার করেছেন।
র্যাবের মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক লে. কর্নেল আশিক বিল্লাহ বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে মালেক জানান, তিনি পেশায় স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিবহন পুলের একজন ড্রাইভার এবং তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারী। ১৯৮২ সালে প্রথম সাভার স্বাস্থ্য প্রকল্পে ড্রাইভার হিসেবে যোগদান করেন। পরে ১৯৮৬ সালে স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিবহন পুলে ড্রাইভার হিসেবে চাকরি শুরু করেন। বর্তমানে তিনি প্রেষণে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা অধিদফতরে কর্মরত।
জানা গেছে, মালেকের স্ত্রীর নামে দক্ষিণ কামারপাড়ায় দু’টি সাততলা বিলাসবহুল ভবন আছে। ধানমন্ডির হাতিরপুল এলাকায় ৪.৫ কাঠা জমিতে একটি নির্মাণাধীন ১০ তলা ভবন আছে এবং দক্ষিণ কামারপাড়ায় ১৫ কাঠা জমিতে একটি ডেইরি ফার্ম আছে। এ ছাড়াও বিভিন্ন ব্যাংকে নামে-বেনামে বিপুল পরিমাণ অর্থ গচ্ছিত আছে বলেও জানা যায়।
মালেক ড্রাইভার দু’টি বিয়ে করেছেন। প্রথম স্ত্রী নার্গিস আক্তারের নামে তুরাগের দক্ষিণ কামারপাড়া রমজান মার্কেটের উত্তর পাশে ছয় কাঠা জায়গার ওপর সাত তলার দু’টি আবাসিক বিল্ডিং রয়েছে। যাতে মোট ২৪টি ফ্ল্যাট রয়েছে । এ ছাড়া আনুমানিক আরো ১০-১২ কাঠার প্লট রয়েছে। বর্তমানে সপরিবারে এই ভবনেরই তৃতীয় তলায় বসবাস করেন মালেক। বাকি ফ্ল্যাটগুলোর কয়েকটি ভাড়া দেয়া রয়েছে।
জানা গেছে, ড্রাইভার মালেকের মেয়ে বেবির নামে দক্ষিণ কামারপাড়ায় ৭০, রাজাবাড়ি হোল্ডিংয়ে প্রায় ১৫ কাঠা জায়গার ওপর ইমন ডেইরি ফার্ম নামে একটি গরুর খামার রয়েছে। সেখানে প্রায় ৫০টি বাছুরসহ গাভী রয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালকের (শিক্ষা) গাড়ি চালানোর দায়িত্ব ছিল মালেকের। কিন্তু দীর্ঘ দিন তিনি গাড়িটি ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করেছেন। রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে একাধিক বাড়ি-গাড়িসহ শত কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে তার। শুধু তাই নয়, দীর্ঘ দিন ধরে অধিদফতরের বিভিন্ন বিষয় নিয়ন্ত্রণ করে আসছেন মালেক। বিশেষ করে অধিদফতরের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর নিয়োগ-বদলি বাণিজ্য তার প্রধান কাজ। কোনো কর্মকর্তা যদি তার সুপারিশ না শুনতেন তাহলে তাকে ঢাকার বাইরে বদলি করাসহ শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার ঘটনাও ঘটিয়েছেন একাধিকবার।
মালেকের বিরুদ্ধে র্যাব অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানতে পারে, তিনি তার এলাকায় সাধারণ মানুষকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে শক্তির মহড়া ও দাপট দেখিয়ে ত্রাসের রাজত্ব সৃষ্টি করেছেন এবং জনজীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছেন। তিনি দীর্ঘ দিন ধরে এলাকায় চাঁদাবাজি, অবৈধ অস্ত্র ব্যবসা এবং জাল টাকার ব্যবসা করে আসছেন। তিনি দীর্ঘ দিন ধরে অবৈধ অস্ত্র ও জালনোট ব্যবসাসহ অস্ত্রের মাধ্যমে ভীতি প্রদর্শনপূর্বক সাধারণ মানুষের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন।
সূত্র জানায়, একজন সামান্য গাড়িচালক হয়েও প্রভাব খাটিয়ে অধিদফতরকে দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত করেছিলেন মালেক। সরকারি ড্রাইভার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মালেক। সভাপতি থাকাকালিন প্রচুর টাকার মালিক হয়েছেন।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের একটি সূত্র জানায়, অধিদফতরের পাজেরো গাড়িটি দিয়ে মালেক নিজের ডেইরি ফার্মের দুধ নিয়ে আসত। অফিসে ঢুকানোর আগে গাড়ি থেকে মালামাল নামিয়ে পরে অফিসে আসত সে। এই ঘটনা অফিসের প্রায় সবাই জানে। কিন্তু কেউ মুখ খোলে না। কারণ বড় কর্মকর্তাদের খুব কাছের মানুষ মালেক। সূত্র জানায়, শুধু মহাপরিচালকের গাড়িই নয়, আবদুল মালেক স্বাস্থ্য অধিদফতরের একটি পিকআপ (ঢাকা মেট্রো-ঠ-১৩-৭০০১) নিজের গরুর খামারের দুধ বিক্রির কাজে ব্যবহার করে থাকেন। এই গাড়িটি চালায় মাহবুব নামে একজন চালক। এ ছাড়াও স্বাস্থ্য অধিদফতরের একটি মাইক্রো (ঢাকা মেট্রো-চ-৫৩-৬৭৪১) পরিবারের সদস্যদের জন্য ব্যবহার করতেন আবদুল মালেক।
সূত্র জানায়, এই ক্ষমতা নিয়েই মালেক অধিদফতরের চিকিৎসকদের বদলি, পদোন্নতি ও তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী নিয়োগ বাণিজ্যে জড়িত ছিল। একজন পরিচালক তার বিরুদ্ধে অডিটের চেষ্টা করলে সেটিও তিনি করতে পারেননি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কারণে। যে কারণে আবদুল মালেক কোন গাড়ি ব্যবহার করত, কিভাবে তেল খরচ করত তা নিয়ে কেউ কোনো কথা বলতেন না। চিকিৎসকদের বিশাল অংশ যারা স্বাস্থ্য অধিদফতরে কাজ করেন, তারা মূলত প্রভাবের কারণে ড্রাইভার আবদুল মালেকদের সমীহ করে চলত।
সূত্র জানায়, স্বাস্থ্য অধিদফতরে ড্রাইভার্স অ্যাসোসিয়েশন নামে একটি সংগঠন তৈরি করে নিজে সেই সংগঠনের সভাপতি হয়েছেন। এই পদের ক্ষমতাবলে তিনি স্বাস্থ্য অধিদফতরের ড্রাইভারদের ওপর একচ্ছত্র আধিপত্য কার্যক্রম করেছেন। ড্রাইভারদের নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতির নামে তিনি বিপুল পরিমাণ অর্থ আদায় করতেন। এ ছাড়া তিনি স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক প্রশাসনকে জিম্মি করে বিভিন্ন ডাক্তারদের বদলি ও পদোন্নতি এবং তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী নিয়োগের নামে বিপুল পরিমাণ অর্থ আদায় করেছেন।


আরো সংবাদ