২০ অক্টোবর ২০২০

ধর্ষক সাইফুর ও অর্জুন সীমান্ত থেকে গ্রেফতার

এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে গণধর্ষণ
দাড়ি কামিয়ে ভারতে পালানোর সময় আটক এমসি কলেজে গণধর্ষণ মামলার প্রধান আসামি সাইফুর ও আরেক আসামি অর্জুন লস্কর (ইনসেটে বাঁয়ে) : নয়া দিগন্ত -

সিলেট সরকারি এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে স্বামীকে বেঁধে রেখে তরুণী স্ত্রীকে গণধর্ষণের ঘটনায় দায়ের করা মামলার প্রধান আসামি ছাত্রলীগ নেতা সাইফুর রহমান ও আরেক আসামি অর্জুন লস্করকে গতকাল রোববার সীমান্ত এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে। দু’জনই ভারতে পালিয়ে যেতে চেয়েছিল। গ্রেফতার এড়াতে একজন ছদ্মবেশও ধারণ করেছিল। এ দিকে ঘটনার শিকার গৃহবধূ গতকাল আদালতে সে রাতের ঘটনার জবানবন্দী দিয়েছেন। এই জঘন্য ঘটনায় জড়িত সব আসামিকে গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি অব্যাহত রয়েছে। সিলেট জেলা আওয়ামী লীগ কলেজ হোস্টেল সুপার ও অধ্যক্ষের পদত্যাগ দাবি করেছে। সিসিক মেয়র ও কাউন্সিলররা গণধর্ষণের প্রতিবাদে গতকাল পদযাত্রা কর্মসূচি পালন করেন।
ধর্ষণ ও অস্ত্র মামলার প্রধান আসামি সাইফুর রহমানকে গতকাল রোববার ভোরে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার সময় সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকার একটি খেয়াঘাট থেকে পুলিশ গ্রেফতার করে। সাইফুর সিলেটের বালাগঞ্জ উপজেলার চান্দাইপাড়া গ্রামের তাহিদ মিয়ার ছেলে। সাইফুরকে ডিআইজি ও পুলিশ সুপারের উপস্থিতিতে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে এসএমপির শাহপরাণ থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছে ছাতক থানা পুলিশ। পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, সাইফুর গ্রেফতার এড়াতে মুখের দাড়ি কেটে ফেলে। গ্রেফতারের পর সাইফুর পুলিশের কাছে ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা দেয়। এ দিকে গণধর্ষণের আরেক আসামি অর্জুন লস্করকে হবিগঞ্জের সীমান্ত এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে। রোববার গোয়েন্দা পুলিশের একটি দল হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলা সীমান্তবর্তী মনতলা এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করে। দুপুর ১২টায় হবিগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আনোয়ার হোসেন বিষয়টি নিশ্চিত করেন। অর্জুন লস্কর সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলার আটগ্রামের কানু লস্করের ছেলে। ধর্ষণের ঘটনার পর অর্জুন পালিয়ে হবিগঞ্জের মাধবপুরে আশ্রয় নেয়। সেখানে মনতলা এলাকায় তার এক আত্মীয়ের বাড়িতে অবস্থান করছিল।
আদালতে ভুক্তভোগী গৃহবধূর জবানবন্দী : স্বামীর সাথে বেড়াতে গিয়ে এমসি কলেজের ছাত্রাবাসে ধর্ষণের শিকার হওয়া তরুণী (১৯) আদালতে ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন। গতকাল রোববার দুপুরে সিলেট মহানগর হাকিম তৃতীয় আদালতের বিচারক শারমিন খানম নিলার কাছে তিনি জবানবন্দী দেন। মহানগর পুলিশের সহকারী কমিশনার (প্রসিকিউশন) এ তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, দুপুরে পুলিশ ওই তরুণীকে ওসমানী হাসপাতাল থেকে আদালতে নিয়ে আসে। দেড়টার দিকে তিনি আদালতে ওই রাতের ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা দেন। উল্লেখ্য, গত শুক্রবার বিকেলে ওই তরুণী তার স্বামীকে নিয়ে প্রাইভেট কারে এমসি কলেজে ঘুরতে আসেন। এ সময় ছাত্রলীগের ছয় নেতাকর্মী তাদের জিম্মি করে ছাত্রাবাসে নিয়ে যায়। সেখানে মারধরের পর স্বামীকে বেঁধে তরুণীকে ধর্ষণ করে। রাত সাড়ে ১০টার দিকে তাদের উদ্ধার করে পুলিশ। পরে ধর্ষণের শিকার তরুণীকে সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ওসিসি সেন্টারে ভর্তি করা হয়। রাতেই এ ঘটনা জানাজানি হলে সর্বত্র ক্ষোভের সঞ্চার হয়। গণধর্ষণের ঘটনায় ছয়জনের নামে মামলা করা হয়েছে শাহপরাণ থানায়। একই মামলায় অজ্ঞাত আরো তিনজনকে আসামি করা হয়েছে।
মেয়র ও কাউন্সিলরদের পদযাত্রা কর্মসূচি : ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমসি কলেজে তরুণী গণধর্ষণের সাথে জড়িতদের গ্রেফতার ও শাস্তি নিশ্চিতের দাবিতে মহানগর পুলিশ কার্যালয় অভিমুখে ‘পদযাত্রা’ কর্মসূচি পালন করেছেন সিলেট সিটি মেয়র ও কাউন্সিলররা। রোববার দুপুরে নগর ভবনে সিসিক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর সভাপতিত্বে কাউন্সিলরদের নিয়ে এক জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত হয়, সিটি করপোরেশনের ২৭টি ওয়ার্ডে নাগরিক প্রতিনিধি, রাজনীতিবিদ, অভিভাবক, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে এমন অন্যায়ের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার লক্ষ্যে সচেতনতামূলক কর্মসূচি পালন করা হবে। সভা শেষে নগর ভবন থেকে প্রতিবাদী কর্মসূচির অংশ হিসেবে মহানগর পুলিশ কার্যালয় অভিমুখে পদযাত্রা করেন মেয়র ও কাউন্সিলররা। উপশহরস্থ মহানগর পুলিশ কার্যালয়ে গিয়ে পুলিশ কমিশনার গোলাম কিবরিয়ার সাথে বৈঠক করেন মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী ও কাউন্সিলররা। মেয়র বলেন, এই নগরীতে একজন পর্যটক যদি এমন নিকৃষ্ট ঘটনার শিকার হন, তবে আমরা জনপ্রতিনিধি হয়ে লজ্জিত না হয়ে পারি না। আর যেন এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি না হয় তার জন্য দায়ীদের দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
হল সুপার ও অধ্যক্ষের পদত্যাগ চায় আ’লীগ : এমসি কলেজের ছাত্রাবাসে গণধর্ষণের ঘটনায় অধ্যক্ষ ও হোস্টেল সুপারের পদত্যাগ দাবি করেছে সিলেট জেলা আওয়ামী লীগ। জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট নাসির উদ্দিন এক বিবৃতিতে বলেছেন, এ ঘটনায় দুর্বৃত্তরা ঐতিহ্যবাহী এই কলেজকে কলুষিত করেছে। আমরা ওই ন্যক্কারজনক ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ এবং দোষীদের দ্রুত গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনার জন্য জোর দাবি জানাচ্ছি। করোনার সময়ে যেখানে সারা দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে সেখানে এমসি কলেজের মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রাবাসে যেভাবে দুর্বৃত্তরা ঢুকে ধর্ষণের ঘটনা ঘটিয়েছে তা আমরা মেনে নিতে পারছি না।
মহানগর জামায়াতের তীব্র নিন্দা : এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে ছাত্রলীগের নেতাকর্মী কর্তৃক স্বামীকে বন্দী করে গৃহবধূকে গণধর্ষণের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন সিলেট মহানগর জামায়াত। অবিলম্বে লম্পট সন্ত্রাসীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিতের দাবি জানান তারা। এক বিবৃতিতে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও সিলেট মহানগরী আমির অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, নায়েবে আমির হাফিজ আব্দুল হাই হারুন ও মো: ফখরুল ইসলাম এবং সেক্রেটারি মাওলানা সোহেল আহমদ বলেন, সরকার দলীয় কিছু নেতার ছত্রচ্ছায়ায় ছাত্রলীগ সিলেটের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে সন্ত্রাসের নিরাপদ অভয়ারণ্যে পরিণত করেছে। সব ছাত্র সংগঠনকে ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়িত করে তারা ক্যাম্পাসগুলোতে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে। ছাত্রলীগ নামধারী সন্ত্রাসীদের প্রতিহিংসার আগুনে পুড়ে ছাই হয়েছিল ঐতিহ্যবাহী এমসি কলেজ ছাত্রাবাস। পুরনো সেই ক্ষত এখনো শুকানোর আগেই সেই ছাত্রাবাসেই ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা স্বামীর কাছ থেকে তার স্ত্রীকে ছিনিয়ে নিয়ে পালাক্রমে ধর্ষণ করে প্রমাণ করেছে তারা কতটা বর্বর। এদের বিরুদ্ধে সিলেটের আপামর জনতাকে জেগে উঠতে হবে। অবিলম্বে জড়িত সন্ত্রাসীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। একই সাথে এদের মদদদাতাদেরও বিচারের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। অন্যথায় বিক্ষুব্ধ সিলেটবাসীর ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেলে পরিস্থিতি হবে ভয়াবহ।


আরো সংবাদ