২৮ অক্টোবর ২০২০

যমুনার ভাঙনে সিরাজগঞ্জে ৩৫০ স্থাপনা নদীতে বিলীন

-

সিরাজগঞ্জে যমুনা নদীতে অস্বাভাবিক পানি বৃদ্ধির সাথে শুরু হয়েছে ভয়াবহ নদী ভাঙন। এক সপ্তাহের ব্যবধানে সদর ও চৌহালীতে ৩৫০ বাড়িঘরসহ বহু স্থাপনা এবং প্রায় ২০০ একর আবাদি জমি নদীতে বিলীন হয়েছে। দুই দিনের ভাঙনে নদীতে চলে গেছে সদর উপজেলার পাঁচঠাকুরী গ্রামের মসজিদসহ ১৫০ বাড়িঘর। অপর দিকে চৌহালী উপজেলার খাসপুখুরিয়া থেকে বাঘুটিয়া ইউনিয়নের চরবিনানই-ভূতের মোড় পর্যন্ত প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার নদী তীরবর্তী এলাকা ভাঙছে। ইতোমধ্যে ওই এলাকার প্রায় দুই শতাধিক বসতভিটা, ঘরবাড়ি, ছয়টি মসজিদ ও মাদরাসা, ছয়টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, তিনটি তাঁত কারখানাসহ প্রায় দেড় কিলোমিটার পাকা সড়ক নদীতে বিলীন হয়েছে।
গত এক সপ্তাহ ধরে সদর উপজেলার শিমলা ও পাঁচঠাকুরী এলাকায় নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে শনিবার দুপুর থেকে ভাঙনের মাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে। যমুনার ঘূর্ণাবর্তের ফলে শনিবার বিকেলে হঠাৎ করেই সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার ছোনগাছা ইউনিয়নের পাঁচঠাকুরী এলাকায় ভাঙনের তীব্রতা পায়। প্রবল স্্েরাত আর ঘূর্ণাবাতের কারণে মুহূর্তের মধ্যেই নদীতে বিলীন হয়ে যায় পাঁচঠাকুরী এলাকার অর্ধশতাধিক বাড়িঘর ও একটি মসজিদ। হুমকির মুখে পড়েছে পাঁচঠাকুরী গ্রামের অবশিষ্ট এলাকা, পাড় পাচিল, মাছুয়াকান্দিসহ বেশ কয়েকটি এলাকা। হঠাৎ ঘূর্ণাবর্তের কারণে ভাঙনের সময় অপ্রস্তুত মানুষজন ঘরের মূল্যবান আসবাবপত্রগুলোও ঠিকমতো সরাতে পারেনি। মুহূর্তের মধ্যে সেমিপাকা, আধাপাকা ও টিনের ঘর, গাছপালা, গোখাদ্য, খড়ের গাদা যমুনায় তলিয়ে যায়। এই এলাকার প্রায় ২৫ একর আবাদি জমি নদীতে চলে যায়। পাঁচঠাকুরী গ্রামের একটি নতুন পাকা মসজিদ নদীতে বিলীন হওয়ার দৃশ্য মানুষ দাঁড়িয়ে দেখছিল। এ সময় মহিলা ও শিশুদের আহাজারি করতে দেখা যায়। এখনো ভাঙন আতঙ্কে অনেকেই ঘড়বাড়ি সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। ভাঙন রোধে জরুরি পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী। এর আগে এই এলাকা রক্ষার জন্য ১৯৯৬ সালে ৮ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছিল সিমলা স্পার বাঁধ (কংক্রিট বাঁধ)। সেটিও গত ২৫ জুলাই যমুনার ভাঙনে পুরোপুরি নদীতে বিলীন হয়ে যায়। ফলে এই এলাকার মানুষ এখন হুমকির মুখে পড়েছেন।
অপর দিকে গত এক সপ্তাহে যমুনা নদীতে পানি বৃদ্ধির ফলে চৌহালীতে আবার নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। দফায় দফায় পানি বৃদ্ধি ও কমার ফলে ভাঙনের তীব্রতা বেড়ে যায়। চৌহালী উপজেলার এনায়েতপুর থানার আড়কান্দি, ঘাটাবাড়ি ও পাকুরতলা এলাকায় নতুন করে ভাঙন দেখা দিয়েছে। দুই দিনের ব্যবধানে ভাঙনে বিলীন হয়েছে এই এলাকার প্রায় অর্ধশত বসতভিটা, ৫০ একর আবাদি জমি। এ দিকে চৌহালীর খাসপুখুরিয়া থেকে বাঘুটিয়া ইউনিয়নের চরবিনানই-ভূতের মোড় পর্যন্ত প্রায় চার কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ভাঙনের তীব্রতা পেয়েছে। এতে প্রায় দুই শতাধিক বসতভিটা, ছয়টি মসজিদ ও মাদরাসা, ছয়টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, তিনটি তাঁত কারখানা, সড়ক ও জনপথ বিভাগের প্রায় দেড় কিলোমিটার পাকা সড়ক নদীতে বিলীন হয়েছে। ফসলি জমি নদীতে গেছে প্রায় ১২০ একর। বাঘুটিয়া ইউনিয়নের চরবিনানই গ্রামের ভাঙন কবলিত মানুষজন তাদের বাড়িঘর সরিয়ে অন্যত্র যাচ্ছে। গত এক সপ্তাহ যাবৎ খাসপুখুরিয়া, দেওয়ানগঞ্জ বাজার, চরবিনানই, চরনাকালিয়া, মিটুয়ানী, ভূতেরমোড়, হাটাইল, সদিয়া চাঁদপুর ইউনিয়নের চাঁদপুর ও বোয়ালকান্দিসহ নদীর পূর্ব ও পশ্চিম পাড়ে দেখা দিয়েছে নদীভাঙন। ভাঙন দেখা দেয়ায় হুমকির মুখে পড়েছে এই এলাকার বহু ঘরবাড়ি ও স্থাপনা। নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত বাঘুটিয়ার সাবেক ইউপি সদস্য শুকুর মাতব্বর জানান, ভাঙন ঠেকাতে স্থায়ী টেকসই বেড়িবাঁধ চাই। তা না হলে চৌহালীর দক্ষিণাঞ্চল টিকবে না। এ বিষয়ে চৌহালীর বাঘুটিয়া ইউপি চেয়ারম্যান আবদুল কাহহার সিদ্দিকী এই এলাকা রক্ষার জন্য সরকারের আশু পদক্ষেপ দাবি করেছেন। চৌহালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আফসান ইয়াসমিন জানান, চৌহালীর যমুনা নদী ভাঙনের সার্বিক বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবগত করা হয়েছে। আশা করি ভাঙন রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হবে। এ ব্যাপারে দায়িত্বপ্রাপ্ত টাঙ্গাইল পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সিরাজুল ইসলাম জানান, খাসপুখুরিয়া দেওয়ানগঞ্জ বাজার এলাকায় ভাঙনরোধে জরুরি ভিত্তিতে জিওব্যাগ ডাম্পিং করা হচ্ছে। এ ছাড়া চৌহালীর দক্ষিণাঞ্চলে যমুনার পূর্বপাশে স্থায়ী তীর সংরক্ষণ কাজের জন্য প্রকল্প তৈরি করে ঊর্ধ্বতন মহলে পাঠানো হয়েছে। প্রকল্প অনুমোদন হলে কাজ শুরু হবে। অপর দিকে সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী নাসির উদ্দিন জানান, চৌহালীতে যমুনা নদীর উভয় পাশে ভাঙনের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন মহল অবগত হয়েছেন। এ ছাড়া এনায়েতপুর অংশে সাড়ে ৬ কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণে প্রায় সাড়ে ৬০০ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প জমা দেয়া হয়েছে। অনুমোদন হলে দ্রুত কাজ শুরু হবে।


আরো সংবাদ