২৫ অক্টোবর ২০২০

রোহিঙ্গা সঙ্কটের জন্য দায়ীদের জবাবদিহির দাবি বাংলাদেশের

জাতিসঙ্ঘে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা
-

রোহিঙ্গাদের দ্রুত ফিরিয়ে নিতে যথোপযুক্ত পরিবেশ তৈরি ও গণহত্যায় জড়িতদের বিচারের আওতায় আনতে বিশ্বনেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে জাতিসঙ্ঘের বেশ কয়েকটি সদস্য রাষ্ট্র ও মানবাধিকার সংগঠন। গত বুধবার জাতিসঙ্ঘ সদর দফতরে ‘রোহিঙ্গা সমস্যার সাম্প্রতিক চার বছর : টেকসই সমাধান নিশ্চিতের চ্যালেঞ্জসমূহ’ শীর্ষক এক ভার্চুয়াল আলোচনায় এ আহবান জানানো হয়। জাতিসঙ্ঘে নিযুক্ত কানাডার স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত বব রায়ের সঞ্চালনায় আলোচনা সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মিয়ানমার বিষয়ক স্বাধীন তদন্ত প্রক্রিয়ার (আইআইএমএম) প্রধান নিকোলাস কে মজিয়ান। এতে আরো বক্তব্য রাখেন গাম্বিয়ার বিচার মন্ত্রণালয়ের আইন-উপদেষ্টা হুসেইন থামাসি, সঙ্ঘাতকালে যৌন সহিংসতা বিষয়ক জাতিসঙ্ঘ মহাসচিবের বিশেষ প্রতিনিধি মিজ্ প্রমিলা প্যাটেন, নিউইয়র্কস্থ জাতিসঙ্ঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনের পরিচালক মিজ্ রুভেন মেনিক দিওলা, ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিজে গাম্বিয়া ও মিয়ানমারের মধ্যকার মামলার গাম্বিয়া পক্ষের আইন উপদেষ্টা ড. পায়াম আখওয়ান, গ্লোবাল সেন্টার ফর রেসপনসিবিলিটি টু প্রটেক্টের নির্বাহী পরিচালক ড. সাইমন অ্যাডামস্, গ্লোবাল জাস্টিজ সেন্টারের প্রেসিডেন্ট মিজ্ আকিলা রাধা কৃষ্ণান, আরাকান রোহিঙ্গা ইউনিয়নের মহাপরিচালক ড. ওয়াকার উদ্দিন। এছাড়া জাতিসঙ্ঘে নিযুক্ত সৌদি আরব, তুরস্ক, সুইডেন, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, নেদারল্যান্ডস্ ও ইন্দোনেশিয়ার স্থায়ী প্রতিনিধিরা আলোচনায় বক্তব্য প্রদান করেন।
জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের ৭৫তম অধিবেশন উপলক্ষে বাংলাদেশ, কানাডা, সৌদি আরব ও তুরস্ক এই আলোচনা সভার আয়োজন করে।
আলোচনা সভায় উদ্বোধনী ভাষণ প্রদান করেন জাতিসঙ্ঘে নিযুক্ত বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি রাবাব ফাতেমা। তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সঙ্কটে প্রয়োজন রাজনৈতিক সমাধান যা রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের মধ্যেই নিহিত রয়েছে। এ প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে সমস্যার মূল কারণগুলোকে চিহ্নিত করে তা নিষ্পত্তি, যথোপযুক্ত পরিবেশ তৈরি এবং দায়ীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার মতো বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে হবে। রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতি অবনতির বিষয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। এ সময় রাবাব ফাতেমা আরো বলেন, দীর্ঘদিন ধরে চলমান এ সঙ্কটের বহুমাত্রিক প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া সম্পূর্ণরূপে অনুধাবন করে এবং তা আমলে নিয়ে এর স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধানকল্পে পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এগিয়ে আসতে হবে। দায়বদ্ধতা নিরূপণের বিষয়টির উদাহরণ টেনে তিনি আইআইএমএমসহ আন্তর্জাতিক তদন্ত ও জুডিশিয়াল প্রক্রিয়াগুলোকে পূর্ণাঙ্গ সহযোগিতা এবং এই নৃশংস অপরাধে ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতিকার নিশ্চিত করতে মিয়ানমারের প্রতি আহ্বান জানান। এ ছাড়া রোহিঙ্গা সঙ্কটের মূল কারণ খুঁজে বের করতে আসিয়ানসহ আঞ্চলিক অন্যান্য দেশ ও সংস্থাকে আরো জোরদার ভূমিকা রাখার আহ্বানও জানান রাষ্ট্রদূত ফাতিমা।
২০১১ সাল থেকে মিয়ানমারে মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রমাণ ও তথ্যাদি মিয়ানমার কর্তৃপক্ষসহ অন্যান্য অংশীজনের কাছ থেকে সংগ্রহের জন্য আইআইএমএম প্রধান হিসেবে যেসব প্রচেষ্টা গ্রহণ করা হয়েছে তা তুলে ধরেন নিকোলাস কে মজিয়ান। আইআইএমএমের কাজ পূর্ণ করতে রোহিঙ্গাদের আশ্রয়দানকারী দেশগুলোর কাছে যেস তথ্য রয়েছে তা আইআইএমএম-কে সরবরাহ করার অনুরোধ জানান তিনি। কানাডার স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত বব রায় জানান, রোহিঙ্গা ইস্যুটি তার দেশের একটি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত আন্তর্জাতিক ইস্যু। ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিজের আওতাধীন বিচারকার্যসহ দায়বদ্ধতা নিরূপণ প্রক্রিয়াগুলোতে তার সরকারের সমর্থন রয়েছে বলে জানান তিনি। এ সমস্যার মানবিক ও রাজনৈতিক সমাধানের জন্য তিনি বৃহত্তর আন্তর্জাতিক সমর্থনের আহ্বান জানান। সঙ্কটের প্রারম্ভেই পূর্ণ মানবিক ও রাজনৈতিক সহযোগিতা প্রদানের মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে নিজ দেশে আশ্রয় দিয়ে এবং এ পর্যন্ত এই বোঝা বহন করে বাংলাদেশ যে উদারতার পরিচয় দিয়ে যাচ্ছে তার ভূয়সী প্রশংসা করেন সৌদি আরব ও তুরস্কের স্থায়ী প্রতিনিধিরা। রোহিঙ্গা নারীদের প্রতি নিপীড়ন ও সহিংসতাসহ ভয়াবহ এই অপরাধের দায়ভার নিরূপণের ওপর জোর দেন যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রদূত। রাখাইন অ্যাডভাইজরি কমিশনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের উপর গুরুত্বারোপ করেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত।
রোহিঙ্গা সঙ্কটের সমাধানে এখনো উল্লেখযোগ্য উন্নতি না হওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন তারা। বক্তারা বলেন, এর ফলে বাংলাদেশের বিভিন্ন ক্যাম্পে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের মধ্যে ব্যাপক হতাশা সৃষ্টি হয়েছে। দায়বদ্ধতা নিরূপণ এবং দায়ীদের বিচার করা গেলে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের মধ্যে মনোবল ফিরে আসতো এবং তাদের শান্তি ও মর্যাদাপূর্ণ ভবিষ্যতের পথ সুগম হতো বলে মন্তব্য করেন আলোচকরা। রোহিঙ্গাদের মানবিক অধিকারের বিরুদ্ধে অপরাধসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচারের লক্ষ্যে চলমান তদন্ত ও অন্যান্য আইনি প্রক্রিয়াগুলো সহযোগিতা প্রদানের জন্য সদস্য দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানান তারা। নাগরিকত্ব আইন ও অন্যান্য বিধিবিধানের পূর্ণ সুযোগ প্রদানের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের দীর্ঘ বঞ্চনা থেকে মুক্তি দান এবং এ সঙ্কটের মূল কারণ চিহ্নিত করার উপর জোর দেন স্থানীয় বিভিন্ন সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা। বক্তারা রাখাইন রাজ্যে চলমান সহিংসতার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, এর ফলে অবশিষ্ট রোহিঙ্গাদের মানবাধিকার লঙ্ঘিত হতে পারে। বিষয়টি আঞ্চলিক বা আন্তর্জাতিকভাবে মারাত্মক সমস্যা আকারে দেখা দেয়ার আগেই জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদ এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থাকে এ ক্ষেত্রে জরুরিভাবে দৃষ্টি দেয়ার আহ্বান জানান বক্তারা।


আরো সংবাদ