১৫ আগস্ট ২০২০

অবশেষে জালিয়াতির হোতা সাহেদ গ্রেফতার

করোনা টেস্ট নিয়ে প্রতারণা
আটক সাহেদকে নিয়ে আসছেন র্যাব কর্মকর্তারা। ইনসেটে ছদ্মবেশে ধরা পড়ার পর : নয়া দিগন্ত -
24tkt

অবশেষে গ্রেফতার হলেন করোনা (কোভিড-১৯) পরীক্ষার রিপোর্ট নিয়ে জালিয়াতির অন্যতম হোতা বহুল আলোচিত প্রতারক রিজেন্ট হাসপাতালের মালিক সাহেদ ওরফে সাহেদ করিম। দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার সময় গতকাল বুধবার ভোরে সাতক্ষীরার দেবহাটা সীমান্তবর্তী এলাকা ইছামতি নদী থেকে র্যাব সদস্যরা তাকে গ্রেফতার করে। সাতক্ষীরার সীমান্ত এলাকা দিয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার সময় সাহেদ র্যাবের হাতে ধরা পড়েন বলে জানান র্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক লে. কর্নেল আশিক বিল্লাহ। এ সময় তার কাছ থেকে একটি বিদেশী অবৈধ পিস্তল ও ম্যাগাজিন ভর্তি গুলি উদ্ধার করা হয়েছে।
র্যাব কর্মকর্তা জানান, ছদ্মবেশে বোরকা পরে নৌকায় চড়ে সাহেদ সাতক্ষীরা সীমান্ত অতিক্রম করার চেষ্টা করছিলেন। প্রতারক সাহেদ ছদ্মবেশে বোরকা পরেই সাতক্ষীরার বিভিন্ন যানবাহনে চলাফেরা করেছিলেন।
র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) কর্নেল তোফায়েল মোস্তফা সারোয়ার সাংবাদিকদের বলেন, গত ৯ দিন ধরে আমরা সাহেদকে ফলো করেছি। কিন্তু সে ঘন ঘন জায়গা পরিবর্তন করছিল। এ জন্য কয়েকবার আমরা তার খুব কাছাকাছি যাওয়ার পরও ধরতে পারিনি। তিনি বলেন, এ ছাড়া সে তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটিও ফেলে দিলেছিল। অবশেষে বুধবার ভোররাতে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টাকালে তাকে গ্রেফতার করা হয়।
প্রতারক সাহেদের গ্রেফতার অভিযানে নেতৃত্ব দেন র্যাবের গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান লেফটেন্যান্ট কর্নেল সারোয়ার বিন কাশেম। এ সময় তার সাথে গোয়েন্দা ইউনিটের কর্মকর্তাসহ অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ছিলেন।
গত ৬ জুলাই র্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলমের নেতৃত্বে রিজেন্ট হাসপাতালের উত্তরা ও মিরপুর কার্যালয়ে অভিযান চালানো হয়। পরীক্ষা ছাড়াই করোনার সনদ দিয়ে সাধারণ মানুষের সাথে প্রতারণা ও অর্থ হাতিয়ে নিয়ে আসছিল তারা। র্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত অন্তত ছয় হাজার ভুয়া করোনা পরীক্ষার সনদ পাওয়ার প্রমাণ পায়। একদিন পর গত ৭ জুলাই স্বাস্থ্য অধিদফতরের নির্দেশে র্যাব রিজেন্ট হাসপাতাল ও তার মূল কার্যালয় সিলগালা করে দেয়। রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান সাহেদসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে ওই দিনই উত্তরা পশ্চিম থানায় মামলা দায়ের করা হয়। এর পর থেকে সাহেদ পলাতক ছিল। সাহেদের খোঁজে সোমবার মৌলভীবাজারে বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালানো হলেও সেখানে তাকে পাওয়া যায়নি। গতকাল বুধবার ভোরে সাতক্ষীরার সীমান্ত এলাকা থেকে রথ্যাব অভিযান চালিয়ে গ্রেফতার করে সাহেদকে। পলাতক অবস্থায় বেশভূষা পরিবর্তন করে চলছিল সে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের চোখ ফাঁকি দিতে তার চুল সাদা থাকলেও কালো করে ফেলে সে এবং গোঁফ কেটে ফেলে। এরপর বোরকা পরে পালানোর চেষ্টা করে।
এ দিকে গ্রেফতারের পর প্রতারক সাহেদকে সাতক্ষীরা থেকে হেলিকপ্টারে করে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। এ সময় সুঠাম দেহের সাহেদের পরনে ছিল কালো রঙের ব্লেজার, নীল শার্ট ও কালো প্যান্ট। ঢাকায় আনার পর সাহেদকে প্রথমে র্যাব সদর দফতরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে তাকে নিয়ে উত্তরায় রিজেন্ট গ্রুপের কার্যালয়ে অভিযান চালানো হয়।
সাহেদ ধুরন্ধর, অর্থলিপ্সু : গ্রেফতার সাহেদকে ঢাকায় আনার পর বিকেলে ৩টায় র্যাব সদর দফতরে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সাহেদকে গ্রেফতার সম্পর্কে সাংবাদিকদের কাছে তথ্য তুলে ধরেন র্যাবের মহাপরিচালক চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন। তিনি বলেন, সাহেদ নিজেকে যতই ক্লিন ইমেজের ব্যক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চেষ্টা করুক না কেন, সে মূলত চতুর ধুরন্ধর, অর্থলিপ্সু। তিনি বলেন, সাতক্ষীরা থেকে আটক করে ঢাকায় আনার পর সাহেদ ও তার সঙ্গী গ্রেফতারকৃত মাসুদকে নিয়ে অভিযানে যায় রথ্যাব। সেখানে রিজেন্ট গ্রুপের একটি কার্যালয় থেকে এক লাখ ৪৬ হাজার টাকার জাল নোট উদ্ধার করা হয়। এটি ছিল সাহেদের একটি গোপন আস্তানা।
র্যাবের ডিজি বলেন, সাহেদ নিজেকে কখনো অবসরপ্রাপ্ত কখনো চাকরিরত সেনাকর্মকর্তা বলে পরিচয় দিতো। কখনো মিডিয়া ব্যক্তিত্ব পরিচয় দিতো এবং সুকৌশলে ছবি তুলে সেটা ব্যবহার করত। এমনকি তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, সাহেদ বালু, পাথর ব্যবসায়ীদের ভুয়া লাইসেন্স দিয়ে প্রতারিত করেছে। তিনি বলেন, করোনা পরীক্ষার রিপোর্টের নামে প্রতারণা করছিল সাহেদ। বিনামূল্যে পরীক্ষা করার কথা থাকলেও ৩৫০০ থেকে ৪০০০ টাকা করে নেয়া হতো এবং পুনরায় পরীক্ষার জন্য ১০০০ টাকা গ্রহণ করত। আইসিইউতে ভর্তি করে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করত। এখন পর্যন্ত ১০ হাজারের অধিক পরীক্ষা করে ৬ হাজার ভুয়া রিপোর্ট দিয়েছে সাহেদের প্রতিষ্ঠান। এক দিকে রোগীর কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নিয়েছে, আরেক দিকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিলের জন্যও কাগজপত্র জমা দিয়েছে সাহেদের হাসপাতাল রিজেন্ট।
র্যাব ডিজি বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, একেক দিন একেক জায়গায় আত্মগোপনে ছিল সাহেদ। ঢাকা, কক্সবাজার, সাতক্ষীরা অঞ্চলে সুকৌশলে আত্মগোপনে ছিল সে। অবশেষে কোমড়পুর সীমান্তের লবঙ্গবাতি খাল দিয়ে দেশত্যাগের চেষ্টা করলে সে ধরা পড়ে। তিনি বলেন, কয়েক দিন ধরেই সে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গা পরিবর্তন করছিল। আমরা তাকে ফলো করেছি এবং সবশেষে গ্রেফতার করতে সমর্থ হয়েছি। রথ্যাব মহাপরিচালক জানান, রিজেন্ট হাসপাতালে র্যাবের প্রথম অভিযানের পর থেকে সাহেদ ঢাকা ছেড়েছে আবার ঢাকায় ফিরেছে, আবার বেরিয়েছে। এসবের মধ্যেই ছিল। এই পুরো সময়টাতে সে কখনো ব্যক্তিগত গাড়ি, কখনো হেঁটে, কখনো ট্রাকে চলাচল করছিল। অবশেষে নৌকা দিয়ে পার হওয়ার সময় আমরা তাকে ধরতে সক্ষম হয়েছি। গোঁফ কেটে ফেলেও লুকাতে পারেননি সাহেদ। নিজের পরিচয় লুকানোর জন্য সাহেদ কেটে ফেলেছিলেন গোঁফ। চুল ছোট ছোট করে কেটেছিলেন। আর নারীর ছদ্মবেশ নিতে পরেছিলেন বোরকা। এভাবেই সাতক্ষীরা সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালানোর জন্য উঠেছিলেন মাছ ধরার নৌকায়। তবে জানতেন না আগে থেকেই দেবহাটা থানার ইছামতি নদীর কাছে ওঁৎ পেতে ছিলেন র্যাবের সদস্যরা। স্থানীয় কয়েকজনের সহায়তায় সাহেদ নৌকায় ওঠার পরপরই তাকে অস্ত্রসহ গ্রেফতার করে র্যাব সদস্যরা।
র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশনস) কর্নেল তোফায়েল মোস্তফা সরোয়ার সাংবাদিকদের বলেন, বুধবার ভোর ৫টা ১০ মিনিটে সাতক্ষীরার দেবহাটা থানার কামালপুর গ্রামে লবঙ্গবতী খালের পাশে ইছামতি নদী থেকে সাহেদকে গ্রেফতার করা হয়। তিনি বলেন, গত ৯ দিন ধরে তাকে অনুসরণ করা হচ্ছিল। ঘন ঘন অবস্থান পরিবর্তনের কারণে গ্রেফতারের খুব কাছাকাছি পৌঁছাতে পারলেও অল্পের জন্য মিস করেছি। পরশু দিন রাত থেকে তাকে অনুসরণ করে গ্রেফতার করা হয়। র্যাবের মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আশিক বিল্লাহ বলেন, সীমান্ত পার হওয়ার জন্য মাছ ধরার নৌকায় উঠেছিল সাহেদ। নৌকায় ওঠার পর তাকে গ্রেফতার করি। সীমান্ত পার হতে স্থানীয় কয়েকজন দালাল তাকে সহায়তা করছিল। গ্রেফতারের সময় তার কাছ থেকে তিন রাউন্ড গুলিসহ একটি বিদেশী পিস্তল উদ্ধার করা হয়।
অবৈধ হাসপাতালের বিরুদ্ধে অভিযান চলবে : যেসব হাসপাতাল রিজেন্ট হাসপাতালের মতো অনৈতিক কর্মকাণ্ড করবে, তাদের বিরুদ্ধে অভিযান চলবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন র্যাবের মহাপরিচালক চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন। সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, আমরা যখনই সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাচ্ছি, তখনই হাসপাতালে অভিযানে যাচ্ছি। গত ১২ জুলাইও রাজধানীর একটি হাসপাতালে অভিযান পরিচালনা হয়েছে। আমাদের অভিযান চলছে। এটি চলমান প্রক্রিয়া। যদি কেউ এমন অপকর্মের সাথে জড়ায়, তাদের বিরুদ্ধে আমরা আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করব।
ডিএমপিতে হস্তান্তর সাহেদকে : গ্রেফতারের পর সাহেদকে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। গতকাল বিকেলে র্যাব সদর দফতরে মহাপরিচালক চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন সংবাদ সম্মেলনে এ কথা জানান। তিনি বলেন, মামলটি ডিএমপি তদন্ত করছে, তাদের কাছে আজই সাহেদকে হস্তান্তর করা হবে।
ঢামেক হাসপাতালে সাহেদের চেকআপ : করোনা পরীক্ষার রিপোর্ট জালিয়াতির অভিযোগে গ্রেফতার রিজেন্ট হাসপাতালের মালিক সাহেদকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চেকআপ করা হয়েছে। হাসপাতাল সূত্র জানায়, বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে সাহেদকে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে আসেন র্যাব-১ এর সিনিয়র এএসপি কামরুজ্জামান। হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক ডা: আলাউদ্দিন সাংবাদিকদের জানান, সাহেদ বুকেব্যথার কথা বলেছিলেন। তার এক্সরে ও ইসিজি করা হয়েছে। সব রিপোর্ট ভালো এসেছে, কোনো সমস্যা নেই। তাকে আবার র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) নিয়ে চলে গেছে।

 


আরো সংবাদ