১২ আগস্ট ২০২০

পদ্মা যমুনা ও তিস্তার পানি বৃদ্ধিতে দুর্ভোগে উত্তরবঙ্গ

ঝুঁকিতে জাতীয় গ্রিডের সঞ্চালন লাইন; ভেসে গেছে ১০ কোটি টাকার মাছ; হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দী; নষ্ট হয়ে যাচ্ছে রাস্তাঘাট
পাবনার বেড়া উপজেলার রাজধরদিয়া ও ঘোপসেলন্দায় যমুনার ভয়াবহ ভাঙন : নয়া দিগন্ত -
24tkt

ভারী বর্ষণ আর উজানের পাহাড়ি ঢলে উত্তরবঙ্গের বেশ কয়েকটি জেলায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। পদ্মা, যমুনা ও তিস্তা নদীতে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় নদীভাঙনও বেড়েছে এসব জেলায়। কোথাও কোথাও বন্যার পানি কিছুটা কমলেও দুর্ভোগ কমেনি বন্যার্ত মানুষজনের। বসতবাড়ি, ফসলি জমি, মৎস্যখামার ডুবে আছে এখনো, যোগাযোগব্যবস্থাও বিচ্ছিন্ন। এ ছাড়া পূর্ব-পশ্চিম জাতীয় গ্রিডের সঞ্চালন লাইনের একটি টাওয়ার নদীভাঙনের মুখে মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে।
পদ্মা ও যমুনায় বিলীন ২৫০ বাড়ি, মারাত্মক ঝুঁকিতে জাতীয় গ্রিডের সঞ্চালন লাইন
বেড়া (পাবনা) সংবাদদাতা জানান, যমুনা ও পদ্মা নদীতে পানি বাড়ার সাথে সাথে তীব্র ভাঙন শুরু হয়েছে। গত তিন সপ্তাহের ভাঙনে ২৫০টি বসতবাড়ি, দুই শতাধিক বিঘা ফসলি জমি, এলজিইডির পাকা সড়ক নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। এ ছাড়া পূর্ব-পশ্চিম জাতীয় গ্রিডের সঞ্চালন লাইনের আনকোরা টাওয়ার ও একটি কমিউনিটি ক্লিনিক ভাঙনের হুমকির মুখে পড়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত তিন সপ্তাহ ধরে শাহজাদপুর উপজেলার কৈজুরি, গালা, জালালপুর, খুকনী ও সোনাতনী এই পাঁচটি ইউনিয়নের যমুনা নদীতীরবর্তী ১৮টি গ্রামের দুই শতাধিক বসতবাড়ি, প্রায় শতাধিক বিঘা, তিল, কাউন, পাটসহ অন্যান্য ফসলি জমি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। প্রায় ১২ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত একমাত্র কমিউনিটি ক্লিনিক ভাঙনের হুমকির মুখে পড়ায় তড়িঘড়ি করে মাত্র ৩৫ হাজার টাকায় বিক্রি করে দেয়া হয়েছে।
বেড়া উপজেলার রূপপুর ইউনিয়নের নটাখোলা থেকে মুন্সীগঞ্জ পর্যন্ত ভাঙনের তাণ্ডবলীলা চলছে। এর মধ্যে ঘোপসেলন্দা গ্রামের ভাঙনের তীব্রতা সবচেয়ে বেশি। ইতোমধ্যে এলজিইডির পাকা সড়ক, ৩০টি বসতবাড়ি, ফসলি জমি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। রূপপুরের খানপুরা গ্রামের বাসিন্দা জানে আলম বললেন, ভাঙনে এলজিইডির খানপুরা-দয়রামপুর সড়কের ২০০ মিটার যমুনায় বিলীন হয়ে গেছে। যমুনার অব্যাহত ভাঙনে খানপুরা গ্রামে পূর্ব-পশ্চিম জাতীয় গ্রিডের সঞ্চালন লাইনের আনকোরা টাওয়ার মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে। এই আনকোরা টাওয়ার যমুনা নদীর ভেতর দিয়ে আসা ১১টি সঞ্চালন টাওয়ারকে নিয়ন্ত্রণ করে। এ টাওয়ার থেকে যমুনা নদী মাত্র ৭০০ মিটার দূর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে সারা দেশে মারাত্মক বিদ্যুৎ বিপর্যয় ঘটতে পারে। এ ছাড়া সুজানগড় উপজেলায় পদ্মা নদীতেও ভাঙন দেখা দিয়েছে।
বেড়া পানি উন্নয়ন বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো: আব্দুল হামিদ বলেছেন, যমুনা ও পদ্মা নদীতে পানি বাড়ার সাথে সাথে ভাঙনের তীব্রতা বেড়েছে। সবচেয়ে বেশি ভাঙন কবলিত ৬টি পয়েন্টে বালুভর্তি জিও ব্যাগ ডাম্পিং করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে নদীভাঙন অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছে।
তিস্তার পানি বিপদসীমার ২২ সেমি. ওপরে
নীলফামারী সংবাদদাতা জানান, ভারী বর্ষণ আর উজানের পাহাড়ি ঢলে তিস্তা নদীর পানি আবারো বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গতকাল শনিবার সকাল ৬টা থেকে তিস্তা নদীর পানি নীলফামারীর ডালিয়া তিস্তা ব্যারাজ পয়েন্টে বিপদসীমার ২২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ক্রমাগত পানি বৃদ্ধির কারণে তিস্তা পাড়ের মানুষের মাঝে এরই মধ্যে চরম আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।
নীলফামারীর ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানায়, শনিবার ভোর রাত থেকে তিস্তা নদীর পানি হু হু করে বাড়তে থাকে। যা শনিবার সকাল ৬টায় ৫২ দশমিক ৮২ সেন্টিমিটার (বিপদসীমা ৫২ দশমিক ৬০ সেন্টিমিটার) ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানির গতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি গেট খুলে রাখা হয়েছে।
এ দিকে তিস্তার পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় ডিমলা উপজেলার পূর্বছাতনাই, টেপাখড়িবাড়ি, খগাখড়িবাড়ি, খালিশা চাপানি, ঝুনাগাছ চাপানি, গয়াবাড়ি ও জলঢাকা উপজেলার গোলমুন্ডা, শৌলমারি ও ডাউয়াবাড়ি ইউনিয়নের প্রায় ১৫টি চরের মানুষজন বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছেন বলে জানিয়েছেন ওই সব ইউনিয়নের জনপ্রতিনিধিরা।
পানি উন্নয়ন বোর্ড নীলফামারীর ডালিয়া ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম জানান, গত দুই দিনের ভারী বর্ষণ ও উজানের ঢলে তিস্তা নদীর পানি সকাল ৬টা থেকে বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
বন্যার্ত মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছে
চিলমারী (কুড়িগ্রাম) সংবাদদাতা জানান, কুড়িগ্রামের চিলমারীতে ব্রহ্মপুত্রের পানি কমতে শুরু করলেও বাঁধে অরক্ষিত কালভার্ট ও বুড়িতিস্তা দিয়ে পানি ঢুকে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা নতুন করে প্লাবিত হয়। নতুন করে পানিবন্দী হয়ে পড়েছে শতশত পরিবার। এতে পানিবন্দী মানুষের দুর্ভোগ চরমে উঠেছে। করছে মানবেতর জীবন যাপন।
রমনা ব্যাপারী পাড়া এলাকার রঞ্জু, হাসেম আলীসহ অনেকে জানান, এক সপ্তাহ ধরে পানিবন্দী থাকলেও তাদের খোঁজ নেয়নি কেউ। তারা বলছেন, ত্রাণ না দিক, বন্যা থেকে বেঁচে থাকার ব্যবস্থা করা হোক। এ দিকে বুড়িতিস্তার ঢলে রানীগঞ্জ, ঠগেরহাট, বুরুজের পাড়সহ প্রায় ১০টি গ্রাম ও রমনা এলাকায় বাঁধের নিচে অরক্ষিত কালভার্ট দিয়ে পানি ঢুকে খড়খড়িয়া, ভরটপাড়া, তেলিপাড়া, শরিফেরহাটসহ কয়েকটি গ্রাম নতুন করে প্লাবিত হয়েছে। এ ছাড়া পানির তোড়ে বিভিন্ন এলাকার সড়ক ভেঙে গেছে।
রংপুর অঞ্চলে ভেসে গেছে ১০ কোটি টাকার মাছ
রংপুর অফিস জানায়, দ্বিতীয় দফায় পানি বৃদ্ধি হওয়ায় তিস্তা-ধরলা-দুধকুমর-ঘাঘট-ব্রহ্মপুত্র রংপুর অঞ্চলের ৫ জেলায় বিভিন্ন ব্যক্তি ও খামার পর্যায়ে ১০ কোটি টাকার মাছ ভেসে গেছে। এতে নিঃস্ব হয়ে গেছেন ২ হাজার ৪৭৮ জন খামারি।
রংপুর বিভাগীয় মৎস্য অধিদফতর সূত্র জানিয়েছে, প্রথম ও দ্বিতীয় দফার রংপুর অঞ্চলের নদ-নদীর পানি বৃদ্ধিতে ১ হাজার ৩৯৬টি পুকুর-দীঘি-খামারের মাছ পানিতে ভেসে গেছে। এতে ১ হাজার ২৩৭ জন মালিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এর মধ্যে গাইবান্ধায় ৪১৪টি, লালমনিরহাটে ৭৯টি, কুড়িগ্রামে ৯০৩টি খামারের মাছ পানিতে ভেসে গেছে। এ হিসাবে রংপুর, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, নীলফামারী ও পঞ্চগড় জেলায় ভেসে যাওয়া মাছের খামারের কোনো তথ্য নেই। তবে মাঠপর্যায়ের মৎস্য অফিসগুলো থেকে পাওয়া তথ্য মতে প্রথম ও দ্বিতীয় দফার বন্যায় এই অঞ্চলে নদীর চরাঞ্চল ও নি¤œাঞ্চলের প্রায় আড়াই হাজার পুকুর-খামারের মাছ ভেসে গেছে।
এ ব্যাপারে দিনাজপুর হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ বায়োলোজি অ্যান্ড জেনেটিকস বিভাগের অধ্যাপক ড. এ কে এম রুহুল আমিন জানান, ইতোমধ্যেই সারা বিশ্বে মাছ চাষে বাংলাদেশ চতুর্থ স্থান দখল করে নিয়েছে। তবে বন্যায় বা দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মাছচাষিদের ক্ষতিপূরণের আওতায় এনে তাদের সরকারিভাবে সহযোগিতা করা না হলে অর্থকরী এ মাছ চাষে আগ্রহ হারাবে মানুষ।
বকশীগঞ্জে ৩৬ হাজার মানুষ পানিবন্দী, পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যু
বকশীগঞ্জ (জামালপুর) সংবাদদাতা জানান, জামালপুরের বকশীগঞ্জে বন্যার পানি কিছুটা কমেছে। তবে এখনো সাধুরপাড়া, মেরুরচর, বগারচর ও নিলক্ষিয়া ইউনিয়নের ৩৬ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে আছে। বন্যাকবলিত এলাকাগুলোতে বিশুদ্ধ পানির সঙ্কট দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে চারণভূমি ও খোলা মাঠগুলো পানির নিচে থাকায় গোখাদ্যের সঙ্কট দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন গ্রামের যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। এ দিকে বন্যার পানিতে ডুবে শুক্রবার বকশীগঞ্জ পৌর এলাকার কাগমারী পাড়া গ্রামের জিসান (৩) নামে এক শিশুর মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এক দিকে দুর্ভোগ অন্য দিকে নদীভাঙন শুরু হওয়ায় দুশ্চিন্তায় রয়েছেন নদীপাড়ের মানুষ। গত ১০ দিনে বকশীগঞ্জ উপজেলার বাংগালপাড়া, আইরমারী, চর কামালের বার্তী, দক্ষিণ কুশলনগর, পূর্ব কলকিহারা, উজান কলকিহারা গ্রামের অর্ধশত বসতভিটা নদীতে বিলীন হয়ে গেছে।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) হাসান মাহাবুব খান জানান, এখন পর্যন্ত বন্যার কারণে ৮ কিলোমিটার কাঁচারাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যার্তদের মধ্যে ২২ মেট্রিকটন চাল বিতরণ করা হয়েছে।
দেওয়ানগঞ্জে বিপদসীমার ওপর পানি
দেওয়ানগঞ্জ (জামালপুর) সংবাদদাতা জানান, জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জে বন্যার পানি কমতে শুরু করলেও যমুনা নদীর বাহাদুরাবাদ পয়েন্টে বিপদসীমার ৫৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। স্থানীয় পাউবো সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। ১৩৬ গ্রামের প্রায় লক্ষাধিক মানুষ বন্যার পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে। উপজেলা চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান, উপজেলা নির্বাহী অফিসার, উপজেলা সহকারী (ভূমি)সহ উপজেলার অন্তত ২০টি সরকারি কার্যালয়ে পানি ওঠায় স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। দেওয়ানগঞ্জ-চরকালিকাপুর ও পার্শ্ববর্তী বকশিগঞ্জ উপজেলার পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের গুরুত্বপূর্ণ স্থান দেওয়ানগঞ্জ মডেল থানার সামনে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের ওপর প্রতিষ্ঠিত ভাসমান ব্রিজটি বন্যার পানির তোড়ে ভেঙে গেছে। উপজেলার পৌরসভাসহ আট ইউনিয়নের বহুগ্রামে যাতায়াতের কাঁচা-পাকা সড়ক এখনো পানিতে নিমজ্জিত রয়েছে। বন্যায় পাট, আখ, শাকসবজির বাগানসহ অন্যান্য ফসলের ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। মানুষের মধ্যে খাদ্য ও গবাদিপশুখাদ্য সঙ্কট দেখা দিয়েছে। করোনা সঙ্কটের পাশাপাশি বন্যা ও নদীভাঙনে শতশত মানুষের মধ্যে চরম দুর্ভোগ দেখা দিয়েছে।

 


আরো সংবাদ