২৬ অক্টোবর ২০২০

রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি তবুও বিশাল লক্ষ্যমাত্রা

বাজেট ২০২০-২১
-

চলতি অর্থবছরে (২০১৯-২০২০) করখাতে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৪০ হাজার ১০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা বেঁধে দেয়া হয় ৩ লাখ ২৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। সর্বশেষ পরিসংখ্যানে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের ১০ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু আদায় করা সম্ভব হয়েছে ১ লাখ ৭৩ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ রাজস্ব ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬২ হাজার কোটি টাকা।
জানা গেছে, ১১ মাসের প্রাথমিক হিসাবে এই ঘাটতি ৭০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। এসব কারণ বিবেচনায় এনে চলতি বাজেটে রাজস্ব আদায়ের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ লাখ ৫০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা কমানো হয়েছে ২৫ হাজার ১০০ কোটি টাকা। সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী এনবিআরকে আদায় করতে হবে ৩ লাখ ৫০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ চলতি বছরের মে ও জুন দুই মাসে এনবিআরকে আদায় করতে হবে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা, যা কিনা কোনোভাবেই সম্ভব নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ কোভিড-১৯ এর কারণে দেশব্যাপী টানা দুই মাস দোকান-পাট-অফিসসহ সমস্ত বাণিজ্যিক কার্যক্রম প্রায় বন্ধ ছিল। এই পরিস্থিতিতে মে-জুন মাসে রাজস্ব আদায় বড়জোড় ৫০ থেকে ৬০ হাজার কোটি টাকা হতে পারে। যেক্ষেত্রে রাজস্ব ঘাটতি বছর শেষে এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে তা নির্ধায় বলা যায়।
এই যখন অবস্থা তখন আগামী অর্থবছরের জন্য এনবিআর খাতে রাজস্ব আদায়ের একটি ‘ডাউস’ সাইজের লক্ষ্য নির্ধারণ করতে যাচ্ছে। এই অঙ্কটি হচ্ছে ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ জুলাই থেকে শুরু হওয়া ২০২০-২০২১ অর্থবছরে এনবিআরকে ১২ মাসে এই পরিমাণ রাজস্ব আদায় করে দেখাতে হবে। রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধি নির্ধারণ করা হয়েছে ৫০ শতাংশ। কিন্তু অতীতে কোনোকালেই ৫০ শতাংশ তো দূরে থাক, এর অর্ধেক হারেও রাজস্ব আদায় করা সম্ভব হয়নি। এ বিষয়ে অর্থনীতিবিদ আহসান এইচ মনসুর বলেছেন, করোনা পরবর্তীকালে এই পরিমাণ রাজস্ব আদায় করা সম্ভব না। এনবিআর বর্তমান কাঠামো দিয়ে তা কোনোভাবে সম্ভব হবে না।
আগামী অর্থবছরে সবচেয়ে বেশি রাজস্ব আদায় করতে হবে ভ্যাট খাত থেকে। এই খাতে ১ লাখ ২৮ হাজার ৮৭৩ কোটি টাকা আদায় করার লক্ষ্য দেয়া হচ্ছে। এ ছাড়া আয় করে ১ লাখ ৫ হাজার ৪৭৫ কোটি টাকা এবং শুল্ক খাতে ৯৫ হাজার ৬৫২ কোটি টাকার লক্ষ্য বেঁধে দেয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে।
এ দিকে প্রতি বছর বাজেটে রাজস্ব আদায়ের একটি বিশাল টার্গেট দেয়া হয়। কিন্তু আদায় ব্যর্থতার কারণে বছরের মাঝামাঝি সময়ে এই টার্গেট কাটছাঁট করে সংশোধন করা হয়। কিন্তু এরপর এই সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রাও বছর শেষে অর্জন করা সম্ভব হয় না। কিন্তু এই চিত্রটি অনেকটা ‘আড়ালে-আবডালে’ই চলে যায়।
যেমন, ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরের বাজেটে এনবিআর কর্তৃক রাজস্ব আদায়ের টার্গেট দেয়া ছিল দুই লাখ ৯৬ হাজার ২০১ কোটি টাকা। কিন্তু বছরের মাঝামাঝি সময় এসে দেখা যায় কোনোভাবেই এই টার্গেট অনুযায়ী রাজস্ব আদায় করা সম্ভব হবে না। ফলে টার্গেট থেকে ১৬ হাজার ২১০ কোটি টাকা কাটছাঁট করে সংশোধিত আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় দুই লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু বছর শেষে এই সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার অর্জনের ধারে কাছেও যাওয়া সম্ভব হয়নি। অর্থ বিভাগের করা এক প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে এনবিআর খাতে রাজস্ব আদায়ের প্রকৃত পরিসংখ্যান হচ্ছে দুই লাখ ২৫ হাজার ৯১৯ কোটি টাকা। যা কিনা সংশোধিত রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৫৪ হাজার ৮১ কোটি টাকা কম। এবং মূল লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৭০ হাজার ২৮২ কোটি টাকা কম।
একইভাবে এর আগের ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরের বাজেটে এনবিআর অংশে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রার দেয়া ছিল দুই লাখ ৪৮ হাজার ১৯০ কোটি টাকা। পরে তা সংশোধন করে দুই লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়েছিল। কিন্তু সেই বছরও এনবিআর সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে প্রকৃত রাজস্ব আদায় করেছে এক লাখ ৯৬ হাজার ৪২৪ কোটি টাকা, যা কিনা সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২৮ হাজার ৫৭৬ কোটি টাকা কম।


আরো সংবাদ