১১ জুলাই ২০২০

ঘরে ঘরে মিনি হাসপাতাল

তিন মাসে বাসায় চিকিৎসা নিয়েছেন ২৯০৩৮৫ জন
-

করোনার এই সময়ে অন্য রোগবালাইও যেন পিছু ছাড়ছে না। অধিকাংশ পরিবারের এক বা একাধিক সদস্য ঋতু পরিবর্তনের এই মৌসুমে সাধারণ জ¦র-সর্দিতে আক্রান্ত। করোনা আতঙ্কে তাদের অনেকে হাসপাতালেও যাচ্ছেন না। এ ছাড়া করোনার ভয়ে অনেক হাসপাতালে রোগীদের ঠিকমতো চিকিৎসাসেবা না দেয়ার অভিযোগ রয়েছে। ফলে দেশের বেশির ভাগ পরিবারের অসুস্থ সদস্যরা এখন ঘরে ঘরে মিনি হাসপাতালের আদলে নিজেরাই চিকিৎসা নিচ্ছেন। বর্তমানে খুব কম পরিবারই খুুঁজে পাওয়া যাবে যাদের ঘরে প্যারাসিটামল, এজিথ্রোমাইসিন, মন্টিলুকাস্ট, ডক্সিসাইক্লিন এবং ফেক্সোফেনাডিন গ্রুপের ওষুধ নেই। অনেক পরিবারের খাবার টেবিলে কিংবা রান্নাঘরের শেলফে সাজানো রয়েছে আদা, কালোজিরা, লেবু আর লবঙ্গ। গলাব্যথা, শ^াসকষ্ট আর হালকা জ¦র ঠাণ্ডার চিকিৎসায় এসব ভেষজ ওষুধ পথ্যও বেশ উপকার দিচ্ছে অনেকের।
এ দিকে স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পক্ষ থেকেও সাধারণ জ¦র সর্দির মতো অসুখে হাসপাতালে না গিয়ে বাসায় থেকেই চিকিৎসা নিতে পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। সংস্থাটির নিয়মিত স্বাস্থ্য বুলেটিনেও সাধারণ সর্দি কাশি কিংবা জ¦র হলেই এটাকে করোনা সন্দেহ করে আতঙ্কিত না হওয়ার কথা বলা হচ্ছে; বরং ধৈর্যধারণ করে বাসায় থেকে কিছু স্বাস্থ্যবিধি পালন করতে পরামর্শ দেয়া হচ্ছে নিয়মিত।
অবশ্য আইইডিসিআর শুরু থেকেই করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলায় দু’টি হটলাইনে সপ্তাহে সাত দিন ২৪ ঘণ্টাই চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদফতরও দু’টি হটলাইনে (স্বাস্থ্য বাতায়ন ১৬২৬৩) এবং জরুরি স্বাস্থ্যসেবা (৩৩৩ নম্বরে) নিয়মিত চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ স্বাস্থ্য অধিদফতর এবং আইইডিসিআর সমন্বিতভাবে টেলিফোনে যেকোনো সময় যেকোনো রোগীকে চিকিৎসাসেবা দিচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের দেয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী দেখা যায়, গত ১০ মার্চের পর থেকে গতকাল মঙ্গলবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত বাসায় থেকে টেলিফোনে চিকিৎসা নিয়েছেন দুই লাখ ৯০ হাজার ৩৮৫ জন। এর মধ্যে হাসপাতাল কিংবা অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক হোম কোয়ারেন্টিনে থেকে চিকিৎসা নিয়েছেন ১৫ হাজার ৬২৪ জন। আর বাকি দুই লাখ ৭৪ হাজার ৭৬১ জন নিজেদের বাসায় থেকেই হোম কোয়ারেন্টিনে চিকিৎসা নিয়েছেন। এ ছাড়া প্রতি ২৪ ঘণ্টায় অর্থাৎ প্রতিদিন আরো প্রায় দুই হাজার ৫০৬ জন বাসায় থেকেই চিকিৎসা নিচ্ছেন। এই সংখ্যা শুধু করেনা উপসর্গ নিয়ে যারা আইইডিসিআরের হটলাইনে ফোন করে চিকিৎসা নিচ্ছেন তাদের সংখ্যা। এর বাইরে গ্রামে কিংবা শহরের পাড়া মহল্লায় প্রায় প্রতিটি পরিবারের কোনো না কোনো সদস্য জ¦র সর্দি কিংবা ঠাণ্ডা কাশিতে ভুগছেন। তারা নিজেদের উদ্যোগে প্রাইভেট ডাক্তার দেখিয়ে কিংবা স্থানীয় ফার্মেসি থেকেই রোগের লক্ষণ অনুযায়ী বাসায় থেকেই ওষুধ সেবন করছেন।
স্বাস্থ্য অধিদফতর এবং আইইডিসিআর ছাড়াও পেশাজীবীদের বিভিন্ন সংগঠন, বেসরকারি বিভিন্ন হাসপাতাল এবং ব্যক্তি উদ্যোগেও অনেকে টেলিফোনে উপসর্গের রোগীদের চিকিৎসা দিয়ে বাসায় থেকে ওষুধ সেবন ও কিছু স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার পরামর্শ দিচ্ছেন। আবার অনেক রোগী হাসপাতালে গিয়ে বহিঃবিভাগে ডাক্তার দেখিয়ে বাসায় চলে আসছেন। রোগীদের অনেকে হাসপাতালে ভর্তি থাকতেও রাজি হচ্ছেন না। তারাও বাসায় এসে পরিবারের সাথে থেকেই চিকিৎসা নিচ্ছেন। এই সংখ্যাটিও একেবারে কম নয়।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক প্রফেসর ডা: নাসিমা সুলতানা জানান, আমাদের হটলাইনে ২৪ ঘণ্টাই ফোন কল নিয়ে রোগীর সমস্যা শুনে সেই মোতাবেক চিকিৎসা পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। নিয়মিত স্বাস্থ্য বুলেটিনেও এ বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরা হচ্ছে। আমরাও বার বার বলছি রোগীকে বাসায় থাকতে হবে। এমনকি করোনা শনাক্ত হলেও বাসায় থেকে চিকিৎসা নেয়া সম্ভব।
তিনি আরো বলেন, সাধারণ ঠাণ্ডা জ¦র কিংবা সর্দি হলেই হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার প্রয়োজন নেই। প্রাথমিক অবস্থায় বাসায় থেকেই চিকিৎসা নিতে হবে। সমস্যা জটিল বা গুরুতর না হলে বাসায় থেকেই একজন রোগী সুস্থ হয়ে উঠবেন। আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মেডিসিন বিভাগের সহকারী রেজিস্ট্রার ও করোনা ইউনিটের সমন্বয়কারী ডা: মোক্তাদির ভূঁইয়া জানান, এই মুহূর্তে আমরা রোগীদের বাসায় থেকেই চিকিৎসা নেয়ার পরামর্শ দিচ্ছি। সাধারণ সর্দি জ¦রে তো হাসপাতালে আসার কোনো প্রয়োজন নেই। বাসায় থেকে কিছু বিষয়ে সতর্ক থাকলে এবং নিয়মিত ওষুধ সেবনে সব রোগীই এক সপ্তাহের মধ্যে সুস্থ হয়ে যাচ্ছে।


আরো সংবাদ