১০ জুলাই ২০২০

সরকার কোথায়?

প্রশ্ন মির্জা ফখরুলের
বিএনপির সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর : নয়া দিগন্ত -

মহামারীর ভয়াবহতা বিবেচনায় না এনে সবকিছু খুলে দেয়ার তীব্র সমালোচনা করে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রশ্ন তুলে বলেছেন, ‘সরকার কোথায়।’
গতকাল সোমবার দুপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ মন্তব্য করেন।
মির্জা ফখরুল বলেন, ট্রেনগুলোতে সেই গাদাগাদি করে মানুষ আসছে। বাসে রীতিমতো মারামারি হচ্ছে বাসে ওঠার জন্য, জায়গা পাওয়ার জন্য। এটা সম্ভব না বাংলাদেশে এভাবে গণপরিবহনকে নিয়ন্ত্রণ করবেন। যেখানে আপনি অফিস খুলে দিয়েছেন, অফিস খুললে তো লোকজন আসবেই। লঞ্চেও একই অবস্থা হয়েছে। এখন সরকারের অবস্থা হচ্ছে যে- ‘ তারা কানে দিয়েছি তুলো’।
ফখরুল বলেন, বারবার করে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তাদের (সরকার) নিয়োজিত যে টেনিক্যাল পরামর্শক কমিটি রয়েছে তারাও বলছেন যে, এটা (সব কিছু খুলে দেয়া) একটা সুইসাইডাল। এটা করলে একটা ভয়ঙ্কর অবস্থা তৈরি হবে। তারা সেই কথা শুনেননি। এমনকি প্রধানমন্ত্রীর যে ব্যক্তিগত চিকিৎসক যিনি আছেন আবদুল্লাহ (অধ্যাপক এম আবদুল্লাহ) সাহেব, তাকে অ্যাডভাইজার হিসেবে নেয়া হয়েছে তিনি পরিষ্কার করে বলেছেন যে, এটা ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি করবে, সংক্রমণ আরো ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাবে। এটা পরিষ্কার যে, তারা (সরকার) ব্যর্থ হয়েছে এ করোনাভাইরাসের উদ্ভূত যে পরিস্থিতি সেটাকে সামাল দিতে।
আমরা মনে করি, এটা আরো সময় নিতে পারত। ভারতে দেখেন, তারা সব রাজ্যের চিফ মিনিস্টার, প্রিন্সিপাল সেক্রেটারিদের সাথে কথা বলেছেন, কথা বলে আরো এক মাস লকডাউন বাড়িয়েছে। যে কথাটা আমি বারবার বলেছি, দায়িত্বশীলতা নেই বলেই সরকার এভাবে তুঘলকি কারবার করছেন যেটা জনগণকে পুরোপুরিভাবে মহাবিপদের দিকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে।
‘সরকার কোথায়’ : মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, সরকারের একলা চলো নীতি, সেই এ কথা চলো নীতি পুরোপুরিভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। ৭৭ হাজার কোটি টাকা ব্যাংকঋণ দেয়া হবে, কোনো ইনসেনটিভ না। এটা কিন্তু একটা কৌশল। যে কৌশল আপনি দেখছেন খুনাখুনিও হচ্ছে। এক ব্যাংকের ডিরেক্টর আরেক ব্যাংকের ডিরেক্টরকে ধরে নিয়ে আসছে বাসায়, তাকে বন্দুক ধরছে। তারা আবার এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে দেশ থেকে চলেও যাচ্ছে। হোয়ার ইজ গভর্নমেন্ট, সরকার কোথায়? আজকে এই কারণে এত ভয়াবহ পরিণতির দিকে যাচ্ছে সে জন্যই।
তিনি বলেন, আমরা কিছু বললেই তো বলে যে, আমরা উসকানি দেয়ার চেষ্টা করছি, আমরা সমালোচনা করছি। একজন তো প্রায়ই বলেন যে, বিষোধগার করবেন না। আরে বিষোধগার করে আপনারা যে অবৈধভাবে সরকার দখল করে আছেন সেটা বলছি না। আমরা বলছি যে, আপনারা ব্যর্থ হয়েছেন এটা পারছেন না করতে, এই জিনিসটা করা উচিত ছিল। এই জিনিসগুলোই আমরা বারবার করে বলছি। কিন্তু ওই যে, কানে দিয়েছি তুলো। যা খুশি বলেন আমাদের কিছু যায় আসে না। আমরা তো আছি। আমি বলি, থাকে না। জনগণের চাহিদা যদি পূরণ করা না যায়, জনগণের আশা-আকাক্সক্ষা যদি পূরণ না করা যায়, আর যদি ভয়াবহ দুর্যোগ নেমে আসে তাহলে কিন্তু থাকে না, চিরকাল থাকে না।
‘বাসভাড়া বৃদ্ধি অমানবিক সিদ্ধান্ত’ : বাসভাড়া বৃদ্ধির সিদ্ধান্তকে ‘অমানবিক’ অভিহিত করে মির্জা ফখরুল বলেন, এটা সম্পূর্ণভাবে একটা অমানবিক কাজ করা হয়েছে। আর এমনিতেই মানুষের ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। বাসে কারা ওঠে? কম আয়ের সাধারণ মানুষই বাসে ওঠে। তাদের বাসভাড়া বাড়িয়ে দিলো। কার স্বার্থে বাড়িয়েছে? মালিকদের স্বার্থে বাড়িয়েছে। মালিকদেরকে আবার প্রণোদনা দিচ্ছে, অনুদান দিচ্ছে। পুরো বিষয়টা হয়েছে লুটপাটের জন্য, পুরোপুরি লুটপাট। শুধুমাত্র দুর্নীতির চরমভাবে সুযোগ নিচ্ছে সবাই।
গণস্বাস্থ্যের উদ্ভাবিত কিট অনুমোদন না পাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, এখনো ডা: জাফরুল্লাহ চৌধুরীর কিট অনুমোদন পায়নি। পত্র-পত্রিকায় আমরা দেখেছি এ কিট নিয়েও বিভিন্ন রকমের দুর্নীতি চলছে, ব্যবসা চলছে, বাণিজ্য চলছে। মানুষের এ দুর্দিনে যারা মানুষের স্বাস্থ্যকে, জীবনকে পুঁজি করে ব্যবসা করার, বাণিজ্য করার, ব্যবসা করার সুযোগ দেয় সেই সরকারকে কি আমরা দুর্নীতিমুক্ত বলতে পারব? পারব না।
তিনি বলেন, আমরা আশা করব, তারা (সরকার) ভুল-ত্রুটিগুলো শুধরিয়ে নিয়ে জনগণের জন্য কাজ করবেন। করোনাভাইরাসের কারণে কৃষি ও কৃষকদের নাজুক-দুর্বিষহ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে ১০ দফা প্রস্তবানা তুলে ধরেন বিএনপি মহাসচিব।
এসবের মধ্যে আছে, আগামী এক বছর পোলট্রি ও ডেইরিসহ সব ধরনের কৃষিঋণের কিস্তি সুদসহ মওকুফ, বীজ, সার, কিটনাশক, সেচ ও ভর্তুকিসহ প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ, কৃষিপণ্যসহ আম, লিচু কাঁঠাল, পেয়ারা প্রভৃতি ফল সরকারি উদ্যোগে বাজারজাত নিশ্চিতকরণ, কৃষকদের স্বাস্থ্যসচেতনতা বৃদ্ধি, কৃষকদের উৎপাদিত ধানের বিপরীতে কমপক্ষে তিন মাসের সমপরিমাণ টাকা বিনা সুদে প্রদান, কৃষকদের কাছ থেকে বেশি পরিমাণ ধান ক্রয়ে অতিরিক্ত ১০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ, প্রান্তিক চাষি ও ক্ষেতমজুরদের জন্য বিশেষ সুদবিহীন ঋণ ও কৃষকদের ওপরে হয়রানি বন্ধ করে তাদের কাছ থেকে সরাসরি ধান ও চাল ক্রয়ের ব্যবস্থা।
বর্তমান পরিস্থিতিতে কৃষকদের পাশে দাঁড়াতে বিএনপির অঙ্গসংগঠন জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের নেয়া কর্মসূচি ঘোষণা করেন মির্জা ফখরুল।
১০ জুন প্রতিটি জেলায় প্রকৃত কৃষকদের কাছ থেকে চলতি মৌসুমে বোরোধান ক্রয়ের দাবিতে জেলা প্রশাসক বরাবর স্মারকলিপি পেশ, আর্থিক ও পরিবহন সঙ্কটে যেসব কৃষক ধান বিক্রি করতে পারছে না তাদেরকে কৃষকদল থেকে সহায়তা প্রদান এবং প্রান্তিক কৃষকদের মধ্যে চলমান ত্রাণতৎপরতা অব্যাহত রাখার কথাও জানান তিনি।
ফখরুল বলেন, আমরা মনে করি, সরকারের সিদ্ধান্তগুলো বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ভ্রান্ত সিদ্ধান্ত ছিল। যেমন ধরেন কৃষির ব্যাপারে বলি, সবাই জানি কৃষি আমাদের মেরুদণ্ড। এই করোনাভাইরাস মহামারীর প্রভাব অর্থনীতিতে পড়বে। এখান থেকে বেরিয়ে আসার রাস্তা কিন্তু এই কৃষি। অর্থাৎ এই কৃষিকে যদি আরো উজ্জীবিত করতে পারেন, উৎপাদন বৃদ্ধি করতে পারেন, কর্মসংস্থান সেখানে বাড়াতে পারেন তাহলে সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে পারেন। ওই দিকে কিন্তু দেখবেন সরকার যে প্রণোদনা দিয়েছে সেই প্রণোদনার মধ্যে কৃষি একেবারেই অবহেলিত হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে মরহুম শিল্পপতি আব্দুল মোনেম, টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব মোস্তফা কামাল সৈয়দ, শিক্ষাবিদ আবদুল কাদের ভুঁইয়াসহ করোনায় আক্রান্ত নিহতদের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করে তাদের রূহে প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন ফখরুল।
করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ডা: জাফরুল্লাহ চৌধুরী, তার স্ত্রী শিরিন পারভিন হক, ছেলে বারিশ হাসান চৌধুরী, প্রবীণ আইনজীবী আবদুর রেজ্জাক খান ও তার স্ত্রীসহ গণমাধ্যমের সাংবাদিক ও চিকিৎসকের আশু রোগমুক্তি কামনা করেন তিনি। গুলশানে চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে এ সংবাদ সম্মেলন করেন।
সংবাদ সম্মেলনে দলের ভাইস চেয়ারম্যান কৃষক দলের আহবায়ক শামসুজ্জামান দুদু, সদস্য সচিব হাসান জাফির তুহিন, সদস্য মেহেদি হাসান পলাশ, অধ্যাপক শামসুর রহমান শামস, বিএনপির তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক রিয়াজউদ্দিন নসু, চেয়ারপারসনের কার্যালয়ের প্রেস উইংয়ের সদস্য শায়রুল কবির খান ও শামসুদ্দিন দিদার উপস্থিত ছিলেন।

 


আরো সংবাদ