০৬ জুন ২০২০

বেকার হওয়ার আশঙ্কায় ৩৩০ কোটি মানুষ

সৌদিতে আক্রান্ত ২ লাখ ছাড়িয়ে যাওয়ার শঙ্কা ; যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাপকহারে মরছে কৃষ্ণাঙ্গরা ; বরিসের সুস্থ হতে এক-দুই মাস সময় লাগবে ; ভারতে খাদ্যসঙ্কটের আশঙ্কা
-

একটি-দু’টি করে এখন পুরো বিশ্বের প্রায় সব দেশ প্রাণঘাতী নভেল করোনায় আক্রান্ত। ২০৯টি দেশেই সুযোগের জানালা প্রতিদিনই একটু একটু করে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ভাইরাসটি প্রথমবারের মতো শনাক্ত হয় চীনের হুবেই প্রদেশের উহানে গত বছরের শেষ দিনে অর্থাৎ ৩১ ডিসেম্বর। ১২ জানুয়ারি পর্যন্ত চীনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। ১৩ জানুয়ারি চীনের বাইরে প্রথম রোগী শনাক্ত হলো থাইল্যান্ডে। এরপর জাপানে ১৫ জানুয়ারি, দক্ষিণ কোরিয়ায় ২০ জানুয়ারি, যুক্তরাষ্ট্রে ২৩ জানুয়ারি, ফ্রান্সে ২৪ জানুয়ারি, জার্মানিতে ২৮ জানুয়ারি, ইতালিতে ৩০ জানুয়ারি, ভারতে ৩০ জানুয়ারি, স্পেনে ৩১ জানুয়ারি এবং বাংলাদেশে ৮ মার্চ ভাইরাসটি শনাক্ত হয়। অথচ গতকাল পর্যন্ত আক্রান্ত চীনে ছিল ৮১ হাজার ৮০২ জন, থাইল্যান্ডে দুই হাজার ৩৬৯ জন, জাপানে চার হাজার ২৫৭ জন, দক্ষিণ কোরিয়ায় ১০ হাজার ৩৮৪ জন, যুক্তরাষ্ট্রে চার লাখ ৫৪৯ জন, ফ্রান্সে এক লাখ ৯ হাজার ৬৯ জন, জার্মানিতে এক লাখ সাত হাজার ৬৬৩ জন, ইতালিতে এক লাখ ৩৫ হাজার ৫৮৬ জন, ভারতে পাঁচ হাজার ৩৬০ জন, স্পেনে এক লাখ ৪৬ হাজার ৬৯০ জন এবং বাংলাদেশে ২১৮ জন। উহানে ২৯ জানুয়ারি পর্যন্ত পাঁচ হাজার ৯৭৪ জন আক্রান্ত হয়েছিল; ৩০ জানুয়ারিই আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৮০৯৬ জনে। এখন পর্যন্ত ১৪ লাখ ৫৫ হাজার ৫২০ জন আক্রান্ত হয়েছে, ৮৩ হাজার ৬৬৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। অর্থাৎ খুব দ্রুত ভাইরাসটি ছড়াচ্ছে এবং আক্রান্তদের মধ্যে ব্যাপকহারে মারা যাচ্ছে। করোনায় সৃষ্ট পরিস্থিতির কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে পড়েছে বিরূপ প্রভাব। খবর বিবিসি, স্ট্রেইট টাইমস, সিয়াসাত ডেইলি, ডেইলি মেইল, দ্য গার্ডিয়ান, এনডিটিভি, হাফিংটন পোস্ট, দ্যা ওয়াল, আলজাজিরা, মিডল ইস্ট আই, গ্লোবাল নিউজ ও ওয়ার্ল্ডওমিটারসের।
বেকার হওয়ার আশঙ্কায় ৩৩০ কোটি মানুষ : জাতিসঙ্ঘের সহযোগী সংগঠন আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) বলেছে, যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে তাতে বৈশ্বিক কর্মক্ষম মানুষের ৮১ শতাংশ (৩৩০ কোটি) আংশিক বা পুরোপুরিভাবে বেকার হয়ে যেতে পারেন। অর্থাৎ বিশ্বব্যাপী প্রতি পাঁচজনে চারজন মানুষ আংশিক বা পুরোপুরি কর্মহীন হয়ে পড়েছেন; যাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। আইএলওর মহাপরিচালক গাই রাইডার বলেছেন, শ্রমিক ও ব্যবসায়ীরা বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছেন। উন্নত ও উন্নয়নশীল, উভয় ধরনের দেশেই এ সঙ্কট দেখা দিয়েছে। ২০২০ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে বিশ্বব্যাপী প্রতিষ্ঠানগুলো ৬ দশমিক ৭ শতাংশ কর্মঘণ্টা কমিয়ে দিতে পারে। এটি প্রায় ২০ কোটি পূর্ণকালীন কর্মজীবী মানুষের চাকরি হারানোর বাস্তবতা সৃষ্টি করবে। আরব অঞ্চলের দেশগুলোর ৫০ লাখ পূর্ণকালীন কর্মজীবী মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়তে পারেন। নির্মাণ ও খাদ্য শিল্প খাতের সাথে ছোট-বড় বহু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান জড়িত। সব মিলিয়ে ১২৫ কোটি মানুষ এ কর্মকাণ্ডে জড়িত। আমেরিকা অঞ্চলের দেশগুলোর ৪৩ দশমিক ২ শতাংশ মানুষ উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ খাতে কাজ করেন। ইউরোপ ও মধ্য এশিয়ায় এ হার ৪২ দশমিক ১ শতাংশ। ভারত, নাইজেরিয়া, ব্রাজিলের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বিপুলসংখ্যক মানুষ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন। এসব অঞ্চলের এই শ্রমজীবী মানুষেরা করোনার কারণে গভীর সঙ্কটের মুখে পড়েছেন।
বরিসের সুস্থ হতে এক-দুই মাস লাগবে : করোনায় আক্রান্ত হয়ে লন্ডনের সেন্ট থমাস হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) দ্বিতীয় দিন পার করেছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি তিনি সুস্থ হন তা হলে সম্পূর্ণ সুস্থ থেকে এক থেকে দুই মাস লাগতে পারে। জনসন হাসপাতালে থাকায় আপাতত তার ডেপুটি হিসেবে সরকার পরিচালনার দায়িত্ব আপাতত পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোমিনিক রাবের হাতে। প্রধানমন্ত্রীর অবস্থা স্থিতিশীল রয়েছে এবং তিনি ভেন্টিলেটর ছাড়াই শ্বাস নিতে পারছেন বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোমিনিক রাব। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইসিইউতে থাকার কারণে বেশ কিছুদিন তিনি কার্যত অচল থাকবেন। তাই তার পেশিশক্তি হ্রাসসহ শরীরের কার্যক্ষমতা উল্লেখযোগ্য হারে কমবে।
যুক্তরাজ্যে এক দিনে ৮৫৪ জনের মৃত্যু : যুক্তরাজ্যে এক দিনে করোনায় রেকর্ডসংখ্যক প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। মঙ্গলবার দেশটির জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশটিতে এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ৮৫৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যে এখন পর্যন্ত করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা ৫৫ হাজার ৯৪৯। এর মধ্যে ছয় হাজার ১৭১ জনের মৃত্যু হয়েছে। চিকিৎসা নেয়ার পর সুস্থ হয়ে উঠেছে ৩২৫ জন।
যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাপক হারে মরছে কৃষ্ণাঙ্গরা : মার্কিন জনসংখ্যার নিরিখে নভেল করোনার কারণে কৃষ্ণাঙ্গ বা আফ্রিকান-আমেরিকানরা ব্যাপক হারে মারা যাচ্ছে। লুসিয়ানা, মিশিগান, পেনসিলভানিয়া, উইসকনসিন ও ইলিনয় থেকে প্রাপ্ত প্রাথমিক তথ্য অনুসারে এ কথা জানা গেছে। কর্মকর্তারা বলেছেন যে, এ ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য ও স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় বৈষম্য দেখা যাচ্ছে। লুসিয়ানা গভর্নর জন এডওয়ার্ডস বলেছেন, সোমবার পর্যন্ত লুসিয়ানায় করোনার ৫১২ জন মারা গেছে। এর মধ্যে ৭০ শতাংশের বেশি কৃষ্ণাঙ্গ ছিল। মিশিগানের কর্মকর্তারা বলেছেন, করোনায় কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতি আফ্রিকান-আমেরিকানদের ওপর বেশি প্রভাব ফেলছে। এই রাজ্যের ৪০ শতাংশ মানুষের মৃত্যুর ঘটনা এ কথা সমর্থন করে। ইউএস সার্জন জেনারেল জেরোম অ্যাডামস এই তথ্য স্বীকার করে বলেছেন, করোনায় আক্রান্ত কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকানদের হৃদরোগ, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ বেশি ছিল। ইলিনয়ের শিকাগো স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের দেয়া পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, শিকাগো শহরে যত মানুষ করোনা আক্রান্ত হয়েছে, তার অর্ধেকই কৃষ্ণাঙ্গ। আর সেখানে ৭২ শতাংশ কৃষ্ণাঙ্গই মারা গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রে আক্রান্ত চার লাখ ছাড়াল : যুক্তরাষ্ট্রে করোনায় আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হয়েছে চার লাখ ৪১২ জন এবং মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ৮৫৪ জনে। এর আগের দিন মঙ্গলবার আক্রান্তের সংখ্যা ছিল তিন লাখ ৬৭ হাজার চারজন এবং মৃতের সংখ্যা ১০ হাজার ৮৭১ জন। সেই হিসেবে এক দিনের ব্যবধানে মৃতের সংখ্যা বেড়েছে ১৯৮৩ জন। জানা গেছে, বর্তমানে সে দেশে তিন লাখ ৬৫ হাজার ৮৮৪ জন চিকিৎসাধীন আছেন। তাদের মধ্যে গুরুতর অবস্থায় আছেন অন্তত ৯ হাজার ১৬৯ জন। এরই মধ্যে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন ২১ হাজার ৬৮৪ জন।
মৃত্যুপুরী নিউ ইয়র্কে এক দিনে ৭৩১ প্রাণহানি : যুক্তরাষ্ট্রে করোনায় সবচেয়ে বিপর্যস্ত জনবহুল নিউ ইয়র্ক অঙ্গরাজ্য। নিউ ইয়র্কে এক দিনে করোনায় আক্রান্ত রোগীর মৃত্যুতে রেকর্ড তৈরি হয়েছে। স্থানীয় সময় মঙ্গলবার ২৪ ঘণ্টায় নিউ ইয়র্কে ৭৩১ জন প্রাণ হারিয়েছেন; যা এক দিনে সেখানে সর্বোচ্চ মৃত্যুর ঘটনা। এ নিয়ে শুধু নিউ ইয়র্কে করোনায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে এখন পাঁচ হাজার ৪৮৯। নিউ ইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের গভর্নর অ্যান্ড্রু কুমো এ তথ্য দিয়ে বলেন, ‘আমরা আজো ৭৩১ জনকে হারালাম। এই প্রতিটি সংখ্যাই এক একজন মানুষ। এর মধ্যে পরিবার আছে, মা আছেন, বাবা আছেন, বোন আছেন কিংবা ভাই আছেন। নিউ ইয়র্কের অনেক মানুষের জন্য আজো এটি একটি বেদনার দিন। কষ্টের দিন।’
করোনায় বাড়বে আত্মহত্যা ও মানসিক বিকারগ্রস্ততা : ইউনিভার্সিটি অব টরেন্টোর মনোবিদ ইয়োয়েল আনবান বলেন, শরীরের রোগ, অসুখ সবসময়ই মনের ওপর প্রভাব ফেলে। তার ওপরে সে অসুখ যদি মহামারীর মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি করে, তবে তাতে শুধু অসুস্থ হয়ে পড়ার সমস্যা নয়, আরো হাজার উদ্বেগ ভিড় করে। সেই উদ্বেগ থেকে এরই মধ্যে কয়েকটি দেশে আত্মহত্যার ঘটনা বেড়েছে। মানসিক ভারসাম্যও হারাচ্ছেন অনেকে। তিনি মনে করেন, চিন্তার এই বদল অনেক কিছুর ওপর নির্ভর করে। বিশেষ করে সামাজিক মেলামেশা যেখানে বন্ধ করা হচ্ছে, সেখানে সব খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে আরো বেশি রক্ষণশীল হয়ে উঠতে পারে মানুষ। অন্য দেশে যাওয়া-আসা, যৌন স্বাধীনতা ও মানুষের মধ্যে সাম্যের মানসিকতা নিয়ে ভাবনায় পরিবর্তন আসতে পারে। এমনকি আমাদের রাজনৈতিক মতাদর্শেও পরিবর্তন ঘটাতে পারে করোনা। বেশ কিছু সমীক্ষা এরই মধ্যে বলছে, করোনার ফলে বহু মানুষের মধ্যে অহেতুক ভীতি এবং বর্ণবিদ্বেষের লক্ষণ দেখা দিতে শুরু করেছে।
করোনা আক্রান্ত তিন লাখ রোগী সুস্থ : প্রাণঘাতী নভেল করোনা গত ডিসেম্বরের শেষে চীনের হুবেই থেকে ছড়িয়ে পড়ার পর প্রতিদিন কেড়ে নিচ্ছে হাজারো মানুষের প্রাণ। গত সাড়ে তিন মাসে ভাইরাসটির কারণে সারা বিশ্বে ৮২ হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। তবে আশার খবর হলো এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে এখন পর্যন্ত সুস্থ হয়েছেন তিন লাখ মানুষ। জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার পর্যন্ত করোনার তিন লাখ এক হাজার ১৩০ জন রোগী সুস্থ হয়েছেন। সবচেয়ে বেশি করোনা রোগী সুস্থ হয়েছে চীনে, ৭৭ হাজার ৫২০ জন। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রোগী সুস্থ হয়েছে স্পেনে ৪৩ হাজার ২০৮ জন এবং তৃতীয় সর্বোচ্চ সুস্থ হয়েছে জার্মানিতে ৭৭ হাজার ৫২০ জন।
সৌদিতে আক্রান্ত ২ লাখ ছাড়িয়ে যাওয়ার শঙ্কা : আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে সৌদি আরবে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা ২০ হাজার থেকে দুই লাখ ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন দেশটির স্বাস্থ্যমন্ত্রী ড. তৌফিক বিন ফাওজান আল রাবিয়া। সম্প্রতি দেশী-বিদেশী চারটি পৃথক সংস্থার এক গবেষণায় এমন তথ্য উঠে এসেছে বলে জানান তিনি। মঙ্গলবার ড. তৌফিক বলেন, বৈশ্বিক মহামারী করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা এরই মধ্যে দুই হাজার ৭০ ছাড়িয়েছে। আগামী কয়েক সপ্তাহে এ সংখ্যা সর্বনি¤œ ১০ হাজার থেকে সর্বোচ্চ দুই লাখ ছাড়াতে পারে। এ দিকে সৌদি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, করোনার বিস্তার ঠেকাতে ৫০ শতাংশ লোক সরকারি নির্দেশনা মেনে চলছেন। তবে এ হার যত দ্রুত সম্ভব ১০০ শতাংশে নিয়ে যেতে হবে।
সৌদিতে ৩ জনের মৃত্যু : করোনায় সৌদি আরবে আরো তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। নতুন করে আক্রান্ত হয়েছেন ১৯০ জন। করোনা মোকাবেলায় সৌদি আরবজুড়ে কারফিউ জারি রয়েছে। এমন পরিস্থিতি অবৈধ অভিবাসীদের নিজ নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার সুযোগ দিয়েছে সৌদি সরকার। করোনা ছড়িয়ে পড়ার পর সামজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে শুরু থেকে কঠোর অবস্থানে সৌদি আরব। পবিত্র নগরী মক্কা ও মদিনাসহ বেশ কয়েকটি প্রদেশের ২৪ ঘণ্টার কারফিউ জারি রয়েছে।
জার্মানিতে ২৪ ঘণ্টায় আক্রান্ত ৪ হাজার : জার্মানিতে সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে করোনায় আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছেই। গত ২৪ ঘণ্টায় দেশটিতে নতুন করে আক্রান্তের সংখ্যা চার হাজারের বেশি। সংক্রামক রোগবিষয়ক সংস্থা রবার্ট কোচ ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে এখন পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা এক লাখ তিন হাজার ২২৮। দেশটিতে গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ২৫৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। ফলে এখন পর্যন্ত দেশটিতে করোনার থাবায় প্রাণ হারিয়েছে দুই হাজার ১৬ জন।
আক্রান্ত ব্যক্তি সংক্রামিত করতে পারেন ৪০০ জনকে : ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব মেডিক্যাল রিসার্চের (আইসিএমআর) গবেষণা অনুযায়ী, একজন করোনা আক্রান্ত ব্যক্তি যদি লকডাউন ভেঙে বাইরে বের হন বা কোয়ারেন্টিনে না থাকেন, তা হলে ৩০ দিনের মধ্যে ওই ব্যক্তি ৪০৬ মানুষকে আক্রান্ত করতে পারেন। দেশটির কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ৭০ শতাংশ করোনা আক্রান্তর মধ্যেই করোনা সংক্রমণের মৃদু অথবা অতি সামান্য লক্ষণ দেখা যায়। সে ক্ষেত্রে তাদের হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। ভারতে এরই মধ্যে করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন পাঁচ হাজার ১৯৪ জন। এতে মৃত্যু হয়েছে ১৪৯ জনের।
চীনের মূল ভূখণ্ডে ২৪ ঘণ্টায় আক্রান্ত দ্বিগুণ : চীনের মূল ভূখণ্ডে নতুন করে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে শুরু করেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় সেখানে নতুন করে আক্রান্তের সংখ্যা আগের দিনের চেয়ে দ্বিগুণ হয়েছে। চীনের ন্যাশনাল হেলথ কমিশন জানিয়েছে, মঙ্গলবার দেশটিতে নতুন করে আক্রান্ত হয়েছে ৬২ জন। এর আগের দিন আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৩২। অর্থাৎ মঙ্গলবার এক লাফে দুই গুণ বেড়ে গেছে আক্রান্তের সংখ্যা। গত ২৫ মার্চ থেকে আক্রান্তের সংখ্যা কমতে শুরু করেছিল। কিন্তু মঙ্গলবার আক্রান্তের সংখ্যা ছিল সর্বোচ্চ। তবে নতুন করে আক্রান্ত হওয়া ৬২ জনের মধ্যে ৫৯ জনই বিদেশী নাগরিক। বাকিরা চীনের মূল ভূখণ্ডের স্থায়ী বাসিন্দা। মঙ্গলবার এক হাজার ৯৫ জনকে করোনা আক্রান্ত সন্দেহে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। এদের মধ্যে ৩৫৮ জন বিভিন্ন দেশ থেকে এসেছে।
ফ্রান্সে এক দিনে ১,৪১৭ মৃত্যু : ফ্রান্সে সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে মৃত ও আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। ফ্রান্সে এরই মধ্যে মৃতের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। অন্য দিকে আক্রান্তের সংখ্যা লাখের বেশি। ইউরোপের এই দেশটি এখন পর্যন্ত করোনায় আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যায় বিশ্বের চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে। ফ্রান্সে এখন পর্যন্ত এক লাখ ৯ হাজার ৬৯ জন প্রাণঘাতী করোনায় আক্রান্ত হয়েছে এবং মারা গেছে ১০ হাজার ৩২৮ জন। অন্য দিকে এখন পর্যন্ত সুস্থ হয়ে উঠেছে ১৯ হাজার ৩৩৭ জন। তবে করোনায় আক্রান্ত সাত হাজার ১৩১ জনের অবস্থা এখনো আশঙ্কাজনক। ফ্রান্সে মঙ্গলবার নতুন করে এক হাজার ৪১৭ জন মারা গেছেন। নতুন আক্রান্ত ১১ হাজার ৫৯ জন।
ভারতে খাদ্য সঙ্কটের আশঙ্কা : ভারতে জনশক্তির অর্ধেকের বেশি কৃষিকাজে জড়িত। জিডিপিতে কৃষির অবদান ১৬ শতাংশ। বিশ্বের শীর্ষ ধান, গম, আখ, তুলা, সবজি ও দুধ উৎপাদনকারী দেশগুলোর একটি ভারত। ভারতে কৃষির উৎকৃষ্ট সময় এপ্রিল থেকে জুন। শীতকালে বপন করা গম, ধান ও ডাল এ সময় তোলা ও বিক্রি করা হয়। লাগানো হয় গ্রীষ্মকালীন ধান, তুলা, ডাল ও আখ। এ সময় কৃষিকাজ বন্ধ থাকায় আসন্ন মৌসুমে বড় ধরনের সমস্যা হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন অশোকা বিশ^বিদ্যালয়ের প্রফেসর মেখালা কৃষ্ণমারথি।
ভারতে আক্রান্ত বেড়ে ৪,৪২১ : ভারতে মঙ্গলবার আরো আটজন করোনা আক্রান্ত রোগীর মৃত্যু হয়েছে। এ ভাইরাসে সংক্রামিত হয়ে দেশটিতে মোট মৃত্যু হয়েছে ১১৭ জনের। এ দিন দেশটিতে আরো ৩৫৪ জন করোনা আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছে। এ নিয়ে দেশটিতে মোট করোনায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়াল চার হাজার ৪২১ জনে। আর সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৩২৬ জন। দেশটির দুই হাজার ৫০০ ট্রেনকে আইসোলেশন সেন্টার হিসেবে প্রস্তুত করা হচ্ছে; যাতে ৪০ হাজার আইসোলেশন বেড প্রস্তুত করা হচ্ছে। এ জন্য দিনে ৩৭৫টি ট্রেনকে আইসোলেশন সেন্টারে রূপান্তরিত করা হচ্ছে।
পশ্চিমবঙ্গে ৭ হটস্পট চিহ্নিত : ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সাতটি এলাকাকে রাজ্য স্বাস্থ্য দফতর হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এখন ওই সব এলাকার ওপর রাজ্য সরকার নজরদারি শুরু করেছে। পাশাপাশি সেখানে চিকিৎসা দেয়ার ব্যবস্থা করেছে। গত মঙ্গলবার বিকেলে এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। রাজ্য সরকার বলেছে, যে এলাকায় ২০ জন করোনা রোগীর সন্ধান মিলবে, সেই এলাকাকেই হটস্পট এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হবে। গতকাল মমতা যে সাত এলাকাকে হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করেছে সেগুলো হলো, দার্জিলিংয়ের কালিম্পং, নদীয়ার তেহট্ট, পূর্ব মেদিনীপুরের এগরা, হাওড়া, পূর্ব মেদিনীপুরের হলদিয়া, কলকাতা ও কমান্ড হাসপাতাল।
আমিরাতে আক্রান্ত ২৮৩ : সংযুক্ত আরব আমিরাতে ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আরো ২৮৩ জন করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। এ নিয়ে দেশটিতে মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়াল দুই হাজার ৩৫৯ জনে। মৃত্যু হয়েছে একজনের আর সুস্থ হয়ে উঠেছেন ১৯ জন। মৃত ব্যক্তি এশিয়ান নাগরিক। আমিরাতে সর্বমোট আক্রান্ত হয়েছেন দুই হাজার ৩৫৯ জন। মৃত্যুবরণ করেছেন মোট ১২ জন।
তুরস্কে ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আক্রান্ত ৩,৮৯২ : তুরস্কে গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে করোনায় আক্রান্ত হয়েছে তিন হাজার ৮৯২ জন। ফলে দেশটিতে এখন পর্যন্ত করোনায় মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৩৪ হাজার ১০৯। স্বাস্থ্যমন্ত্রী ফেহরেতিন কোকা এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশটিতে নতুন করে ৭৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। ফলে এখন পর্যন্ত মোট প্রাণহানি ঘটেছে ৭২৫ জনের। অন্য দিকে এক হাজার ৫৮২ জন করোনা থেকে এরই মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে। তবে এক হাজার ৪৭৪ জনের অবস্থা এখনো আশঙ্কাজনক।
কাতারে করোনা আক্রান্ত দুই হাজার ছাড়াল : কাতারে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা দুই হাজার ছাড়িয়েছে। মঙ্গলবার আরো দু’জনের মৃত্যু হয়েছে, মারা যাওয়া দু’জন কাতারি নাগরিক নয়। এ পর্যন্ত ভাইরাসটিতে মৃত্যু হয়েছে ছয়জনের। এদের একজন কাতারি নাগরিক, বাকিরা অভিবাসী। কাতারে করোনায় চাকরি হারিয়ে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন ফ্রি ভিসায় থাকা শ্রমিকরা। মঙ্গলবার নতুন করে ২২৫ জনসহ দেশটিতে এ পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছেন দুই হাজার ৫৭ জন। করোনায় আক্রান্তদের অন্তত ১৫০ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন বলে জানিয়েছে দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। কাতারে গত ২৯ ফেব্রুয়ারি এক ইরান ফেরত কাতারি নাগরিকের দেহে প্রথম করোনা শনাক্ত হয়।
রোমানিয়ার ১০ নবজাতক আক্রান্ত : রোমানিয়ার একটি হাসপাতালের প্রসূতি ইউনিটে ১০ নবজাতক করোনায় আক্রান্ত হয়েছে। স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে তাদের শরীরে এই ভাইরাসের সংক্রমণ ঘটেছে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। দেশটির স্বাস্থ্যমন্ত্রী নেলু তাতারু বলেন, এসব শিশুকে মায়েদের শরীরে করোনা ধরা পড়েনি। কিন্তু শিশুগুলোর দেহে করোনা পজিটিভ এসেছে। কাজেই আমাদের ধারনা চিকিৎসাকর্মীদের মাধ্যমেই এটা ছড়িয়েছে।
ইরানে মসজিদেই চলছে মাস্ক তৈরির কাজ : করোনার সংক্রমণ ব্যাপক আকার ধারণ করেছে ইরানে। এরই মধ্যে দেশটিতে ৭০ হাজারের বেশি মানুষ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। মৃতের সংখ্যা ছাড়িয়েছে তিন হাজার। এ পরিস্থিতিতে ইরানজুড়ে দেখা দিয়েছে মাস্কের সঙ্কট। এর পরিপ্রেক্ষিতে তেহরানের একটি মসজিদে মাস্ক তৈরির কাজে হাত লাগিয়েছেন স্থানীয় নারীরাই। সেলাই মেশিন জোগাড় করে চলছে করোনার বিরুদ্ধে বাঁচার লড়াই। গোটা মসজিদই পরিণত হয়েছে মাস্ক তৈরির কারখানায়।
করোনায় মিয়ানমারে আরো ২ জনের মৃত্যু : করোনায় আক্রান্ত হয়ে মিয়ানমারে আরো দু’জনের মৃত্যু হয়েছে। দেশটির স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত সেখানে করোনায় আক্রান্ত হয়ে তিনজন মারা গেছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নতুন করে ৬৩ বছর বয়সী এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। এর আগে তিনি নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়েছিলেন। পরে তার শরীরে কোভিড-১৯ ভাইরাসের উপস্থিতি ধরা পড়ে। অন্য দিকে দেশটিতে ৪৭ বছর বয়সী এক ব্যক্তি শ্বাসকষ্টে মারা গেছেন। তিনি করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন। এখন পর্যন্ত সেখানে মোট ২২ জন করোনায় আক্রান্ত হয়েছে।
বিশ্ববাসীর স্বাভাবিক জীবনে ফেরা নিয়ে শঙ্কা : শীর্ষ মার্কিন বিজ্ঞানী ডা: অ্যান্থনি ফসি হোয়াইট হাউজের প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেছেন, ‘করোনার আগে বিশ্ববাসী যে স্বাভাবিক জীবনে ছিল সেটা হয়তো আমরা আর নাও ফিরে পেতে পারি।’ তিনি বলেন, ‘দেশে দেশে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ছে। সেখান থেকে সমাজের প্রতি স্তরে বিস্তারিত হচ্ছে। তাই এই পরিস্থিতিতে আমরা হয়তো পূর্ব করোনার জীবন ফিরে পাবো না।’ ডা: ফসি বলেন, স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে হলে আপনাকে করোনাভাইরাসমুক্ত হতে হবে। কিন্তু সেটা সম্ভব কি না জানি না। তবে একমাত্র ভ্যাকসিনই সেই সমাধান দিতে পারে।
কানাডার পররাষ্ট্র উপমন্ত্রী করোনায় আক্রান্ত : কানাডার পররাষ্ট্রবিষয়ক উপমন্ত্রী মারটা মরগান করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, উপমন্ত্রী মারটা মরগানের দেহে করোনার মৃদু উপসর্গ দেখা দেয়ায় তিনি চিকিৎসকদের পরামর্শ নিয়েছেন। বর্তমানে তিনি নিজ বাড়িতে আইসোলেশনে রয়েছেন। তার অবস্থা স্থিতিশীল। উপমন্ত্রীর সংস্পর্শে আসা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চিহ্নিত করার কাজ চলছে।
হংকংয়ে নিষেধাজ্ঞা আরো বাড়ল : হংকংয়ে সামাজিক মেলামেশায় বিধিনিষেধের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। নতুন ঘোষণায় বলা হয়েছে আগামী ২৩ এপ্রিল পর্যন্ত বলবৎ থাকবে এ নিষেধাজ্ঞা। নিষেধাজ্ঞা চলাকালে চারজনের বেশি লোক এক জায়গায় দাঁড়াতেও পারবে না বলে নির্দেশ দেয়া হয়। সামাজিকভাবে করোনার সংক্রমণ প্রতিরোধে বেশ কয়েকটি ব্যবস্থা নিয়েছে স্বায়ত্তশাসিত ওই অঞ্চলটির পরিচালক কর্তৃপক্ষ। বন্ধ করা হয়েছে কয়েকটি বার, সিনেমা, জিম, নাইট ক্লাব, কারাওকে লাউঞ্জ ও ম্যাসেজ পার্লার। বিউটি পার্লার ও ম্যাসেজ পার্লারগুলোও রয়েছে বন্ধের তালিকায়। হংকংয়ে ৯৩৬টি করোনায় আক্রান্তের খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে মারা গেছে চারজন।

 


আরো সংবাদ





justin tv