২৯ মে ২০২০

গরিব বের হচ্ছেন খাবার সন্ধানে, ধনীরা ফাঁকা রাস্তায় ঘুরতে

স্বামী পরিত্যক্ত রহিমা বেগম সাহায্যের জন্য না ঘুরে নেমে পড়েছেন ইটভাঙার কঠিন কাজে। এক বস্তা ইট ভাঙলে পান ৪০ টাকা। প্রতিদিন বড়জোর ৩-৪ বস্তা ভাঙতে পারেন। এ থেকে পাওয়া আয়েই জীবন চালাতে হয়। মতিঝিল কালভার্ট রোড থেকে ছবিটি তুলেছেন আমাদের সিনিয়র আলোকচিত্রী নাসিম সিকদার -

ঘরে রাখা যাচ্ছে না মানুষকে। কোথাও কোথাও রাস্তাঘাটের অবস্থা দেখে মনে হয়েছে ঈদের ছুটি চলছে। রাস্তায় মানুষ আর মানুষ, দোকানপাট খোলা, চায়ের দোকানের সেই চিরচেনা আড্ডা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদেরও পাত্তা দিচ্ছে না। মনে হয় কিছুই হয়নি, কিছুই হবে না! উল্টো কেউ যদি সতর্ক করতে যাচ্ছেন তাকে নাজেহাল করার ঘটনাও ঘটছে। কোথাও কোথাও নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে বিলি করা হচ্ছে সাহায্য। রাজধানীর কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, একশ্রেণীর মানুষ সাহায্যের জন্য বের হচ্ছেন, এক শ্রেণীর মানুষ সাহায্য দেয়ার অজুহাতে দলবদ্ধভাবে বের হচ্ছেন, আবার কেউ কেউ বের হচ্ছেন স্রেফ আড্ডাবাজির জন্য এবং ফাঁকা শহরে ঘোরার জন্য।
বিশ^ব্যাপী করোনার তাণ্ডবের কারণে বাংলাদেশেও সাধারণ ছুটি চলছে। প্রথমে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত এই ছুটি ঘোষণা করা হয়েছিল। গতকালের এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এই ছুটি বাড়িয়ে ১১ এপ্রিল পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে। এই সময়ে মানুষকে ঘরের ভেতরে থাকারই নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। জরুরি কাজ ছাড়া এবং নির্দিষ্ট পেশার লোক ছাড়া কেউ যাতে বি না কারণে ঘরের বাইরে না যায় সেজন্য সরকারের পক্ষ থেকে মানুষের প্রতি আবেদন-নিবেদন জানানো হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনকে সহায়তা করার জন্য মোতায়েন করা হয়েছে সেনাসদস্যদের। মানুষ যাতে ঘরে থাকে এবং নিয়মকানুন মেনে চলে সে কারণে সরকারের পক্ষ থেকে ঘণ্টায় ঘণ্টায় নানাভাবে আবেদন-নিবেদন করা হচ্ছে।
এত কিছুর পরেও ঘরে আটকে রাখা যাচ্ছে না মানুষকে। নানা অজুহাতে তারা ঘরের বাইরে যাচ্ছে এবং নিয়মিত আড্ডাও শুরু হয়ে গেছে কোথাও কোথাও। রাজধানীর বাড্ডা এলাকা থেকে রিন্টু জানিয়েছেন, তার এলাকায় ঈদ লেগে গেছে। তিনি জানান, পূর্ব বাড্ডা পোস্ট অফিস থেকে করবস্থান পর্যন্ত প্রায় সব দোকান খোলা। চায়ের দোকানগুলোতে ঠিক আগের মতোই আড্ডা জমছে। গায়ে গায়ে লেগে মানুষ আড্ডাবাজি করছে। যেন কিছুই হয়নি। রিন্টু বলেন, অকারণে মানুষ আড্ডাবাজি করছে। পুলিশ তাদের বোঝানোর চেষ্টা করেও কোনো ফল পাচ্ছে না।
রাজধানীর মানিকনগর এলাকায় গতকাল দেখা যায় প্রায় সব দোকান খোলা। মানুষ রাস্তায় নেমে গেছে। রাস্তার মোড়ে মোড়ে পুরনো আড্ডাগুলো জমে উঠেছে। বিকেলে মানিক নগর মডেল স্কুলের পাশে দেখা যায় বিপুলসংখ্যক নারী-পুরুষ জড়ো হয়েছেন। তাদের কেউ কেউ জানালেন, ত্রাণ দিবে; তাই এসেছেন। তাদের সাথে ছোট্ট ছোট্ট শিশুরাও আছে। স্বাস্থ্যবিষয়ক যেসব নির্দেশনা রয়েছে তার সব ক’টিই তাদের কাছে উপেক্ষিত। আশপাশ দিয়ে পুলিশও ঘুরছে; কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেই।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক দোকানি জানালেন, শুরু থেকেই এই এলাকার মানুষের মধ্যে এ নিয়ে কোনো চিন্তা নেই। তারা রাস্তায় আসছে; নিয়মিত আড্ডা দিচ্ছে, চায়ের দোকানে বসে চা খাচ্ছে, সিগারেট খাচ্ছে। রিকশাগুলো আগের নিয়মেই চলছে। শুধু ইঞ্জিনচালিত গাড়িগুলো রাস্তায় একটু কম।
কমলাপুর, আরকে মিশন রোড এবং গোপীবাগসহ আশপাশের রাস্তাঘাটেও ওই একই চিত্র দেখা যায়। শুধু মানিকনগর বিশ^রোডে গণপরিবহন দেখা যায়নি। প্রাইভেট কার ও মোটরসাইকেল আগের তুলনায় কম হলেও চলছে। গণপরিবহন রাস্তায় না থাকলেও রাইড শেয়ারিং থেমে নেই। অতিরিক্ত টাকা নিয়ে তারা যাত্রী টানছে। গতকাল মতিঝিল টিঅ্যান্ডটি কলোনি এলাকায় দেখা যায় নারী-পুরুষ জড়ো হয়েছেন সাহায্য নেয়ার জন্য। তাদের মধ্যে কয়েকজন জানালেন, ঘর থেকে না নেমে উপায় কী? কেউ তো ঘরে খাবার দিয়ে আসছে না। এরা খাবার সংগ্রহের জন্য বের হচ্ছেন বলে তাদের দাবি।
আবার কেউ কেউ কেন বের হয়েছেন তার উত্তর নেই। তারা জরুরি কাজের দাবি করলেও কাজের কথা বলতে পারেন না। গতকাল বিকেলের দিকে মানিকনগর বিশ^রোডে পুলিশ চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি করছিল। সেখানে কয়েকটি প্রাইভেট কার ও মোটরসাইকেল থামানো হলে তারা জরুরি কাজের জন্য বের হওয়ার দাবি করেন। কিন্তু জরুরি কাজের ব্যাপারে সদোত্তর দিতে পারেনি। পুলিশের একজন সদস্য জানান, এদের অনেকেই আছেন যারা ফাঁকা রাস্তায় ঘুরে বেড়ানোর জন্য বের হয়েছেন।


আরো সংবাদ