১১ এপ্রিল ২০২০

থানার তদন্ত কর্মকর্তার কক্ষ থেকে ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার

-

বরগুনার আমতলী থানায় একটি হত্যা মামলার সন্দেহভাজন আসামি শানু হাওলাদারেরর ঝুলান্ত লাশ উদ্ধার করা হয়েছে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (তদন্ত) কক্ষ থেকে। পরিবারের অভিযোগ, থানার ওসি আবুল বাশার ও ওসি (তদন্ত) মনোরঞ্জন মিস্ত্রির দাবিকৃত তিন লাখ টাকা না দেয়ায় নির্যাতন করে তাকে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় আমতলী থানার ওসি (তদন্ত) মনোরঞ্জন মিস্ত্রি ও ডিউটি অফিসার এএসআই আরিফুর রহমানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। একই সাথে পুলিশ সুপার তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। এ ঘটনা ঘটেছে গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল সোয়া ৬টায় আমতলী থানাহাজতে।
জানা গেছে, উপজেলার গুলিশাখালী ইউনিয়নের পশ্চিম কলাগাছিয়া গ্রামে গত বছর ৩ নভেম্বরে ইব্রাহিম নামের একজন কৃষককে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। ওই হত্যা মামলায় শানু হাওলাদারের সৎ ভাই মিজানুর রহমান হাওলাদার এজাহারভুক্ত আসামি। ওই মামলার শানু হাওলাদারকে গত সোমবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে সহেন্দভাজন আসামি হিসেবে আমতলী থানা পুলিশ ধরে নিয়ে আসে। তাকে ধরে নিয়ে আসার পর আমতলী থানার ওসি আবুল বাশার ও ওসি (তদন্ত) মনোরঞ্জন মিস্ত্রি আসামির পরিবারের কাছে তিন লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। ওই টাকা দিতে অস্বীকার করে তার পরিবার। টাকা না পেয়ে আসামি শানু হাওলাদারকে থানাহাজতে রেখে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদের নামে নির্যাতন করে। নির্যাতন সইতে না পেয়ে আসামির ছেলে সাকিব হোসেন মঙ্গলবার ওসি আবুল বাশারকে ১০ হাজার টাকা ঘুষ দেন; কিন্তু তাতে তিনি তুষ্ট হননি। বরং নির্যাতনের মাত্রা আরো বাড়িয়ে দেয়। বুধবার পরিবারের লোকজন এসে আসামি শানু হাওলাদারের সাথে দেখা করতে চাইলে পুলিশ দেখা করতে দেয়নি। উল্টো পরিবারের লোকজনের সাথে অশালীন আচরণ করে তাড়িয়ে দেয় বলে অভিযোগ করেন নিহতের ছেলে সাকিব হোসেন।
তবে ওসি আবুল বাশার জানান, বৃহস্পতিবার সকাল সোয়া ৬টার দিকে আসামি শানু ওয়াশরুমে যাওয়ার কথা বললে পুলিশ তাকে ওয়াশরুমে নিয়ে যায়। পরে এক ফাঁকে শানু হাওলাদার ওসি (তদন্ত) মনোরঞ্জন মিস্ত্রির কক্ষে ফ্যানের সাথে রশি পেঁচিয়ে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে।
খবর পেয়ে বরগুনা পুলিশ সুপার মারুফ হোসেন পিপিএম আমতলী থানায় আসেন। ঘটনা তদন্তে জেলা পুলিশ সুপার মারুফ, হোসেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অপরাধ) মো: তোফায়েল আহম্মেদকে প্রধান করে তিন সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেনÑ অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (বরগুনা সদর) মো: মহব্বত আলী ও সহকারী পুলিশ সুপার (আমতলী-তালতলী সার্কেল) সৈয়দ রবিউল ইসলাম। ওই দিন সকাল সাড়ে ১০টায় বরগুনা জেলার সিনিয়র সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো: আসাদুজ্জামান ও আমতলী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা শংকর প্রসাদ অধিকারী নিহত শানু হাওলাদারের সুরতহাল করেন। এ ঘটনায় দায়িত্ব অবহেলার দায়ে তাৎক্ষণিক বরগুনা পুলিশ সুপার মারুফ হোসেন আমতলী থানার ওসি (তদন্ত) মনোরঞ্জন মিস্ত্রি ও ডিউটি অফিসার এএসআই আরিফুর রহমানকে সাময়িক বরখাস্ত করেন। নিহত শানু হাওলাদারের লাশ ময়নাতদন্তের জন্য বরগুনা মর্গে পাঠিয়েছে পুলিশ।
শানু হাওলাদারের শ্যালক রাকিবুল ইসলাম বলেন, দুলাভাইকে ধরে আনার পর থেকে আমি থানা প্রাঙ্গণে ছিলাম। পুলিশ তাকে টাকার জন্য বেধড়ক মারধর করেছে। তার ডাকচিৎকার শুনেছি। বহুবার চেষ্টা করেছি তার সাথে দেখা করতে; কিন্তু পুলিশ দেখা করতে দেয়নি। উল্টো আমাদের সাথে খারাপ আচরণ করেছে। শানু হাওলাদারের স্ত্রী মোসা: ঝরনা বেগম বলেন, ‘পাঁচজন পুলিশ যাইয়্যা সোমবার রাইতে মোর স্বামীরে বাড়ি গোনে ধইর্যা আনছে। আনার সময় মোর কাছে টাকা চাইছে। মুই টাকা দেতে রাজি অই নাই হেইয়্যার লইগ্যা মোর স্বামীকে পুলিশে পিডাইয়্যা মাইর্যা হালাইছে। মুই এইয়্যার বিচার চাই।’ থানার ভেতরে ঝরনা বেগম বিলাপ করে বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন। গুলিশালালী ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আলহাজ মো: নুরুল ইসলাম বলেন, শানু হাওলাদারকে বাড়ি থেকে ধরে এনে নির্যাতন করেছে। আত্মহত্যার ঘটনা পুলিশের সাজানো। আমতলী উপজেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক পৌর মেয়র মতিয়ার রহমান বলেন, পুলিশ পরিকল্পিতভাবে শানুকে নির্যাতন করে হত্যা করেছে। এ ঘটনার বিচার দাবি করছি।
আমতলী থানার ওসি মো: আবুল বাশার বলেন, আসামি শানু হাওলাদার বৃহস্পতিবার সকাল সোয়া ৬টার দিকে ওয়াশরুমে যাওয়ার জন্য বলে। সে ওয়াশরুম থেকে ফিরে এসে এক ফাঁকে হাজতখানার ফ্যানের সাথে গলায় রশি পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করেছে। কিন্তু হাজতখানায় কোনো ফ্যান নেই সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি আগের কথা পাল্টে বলেন ওসি (তদন্ত) মনোরঞ্জনের কক্ষে ফ্যানের সাথে রশি পেঁচিয়ে আত্মত্যা করেছে। টাকা না দেয়ায় তাকে নির্যাতন করে হত্যা করেছেন এমন প্রশ্নের জবাব তিনি এড়িয়ে যান। আমতলী উপজেলা স্বাস্থ্য পরিবার ও পরিকল্পনা কর্মকর্তা শংকর প্রসাদ অধিকারী বলেন, নিহত শানু হাওলাদারের শরীরে আঘাতের চিহ্ন রয়েছ। তবে ময়নাতদন্ত ছাড়া মৃত্যুর সঠিক কারণ বলা যাবে না।
এ ঘটনার তদন্তকারী প্রধান বরগুনা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার প্রশাসন ও অপরাধ মো: তোফায়েল আহম্মেদ বলেন, দায়িত্বে অবহেলার দায়ে ওসি (তদন্ত) মনোরঞ্জন মিস্ত্রি ও ডিউটি অফিসার এএসআই মো: আরিফুর রহমানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।


আরো সংবাদ