২৭ নভেম্বর ২০২০

অবশেষে খালেদা জিয়ার মুক্তি

হাসপাতাল থেকে বাসায় ফেরার পথে বেগম খালেদা জিয়া : নয়া দিগন্ত -

টানা ২৫ মাসেরও বেশি সময় কারাভোগের পর অবশেষে মুক্তি পেয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। গতকাল বুধবার বিকেল ৪টার কিছু সময় পর সরকারের নির্বাহী আদেশে মুক্তি পেয়ে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের কেবিন ব্লক থেকে বেরিয়ে আসেন সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী।
মুক্ত হয়ে বিএসএমএমইউ থেকে সরাসরি গুলশানের বাসা ‘ফিরোজা’য় যান খালেদা জিয়া। ছোট ভাই শামীম ইস্কান্দার নিজের সিলভার রঙের গাড়িতে ড্রাইভ করে বড় বোন খালেদা জিয়াকে ফিরোজাতে নিয়ে আসেন।
বিকেল সোয়া ৫টায় ফিরোজাতে তাকে বহন করা গাড়িটি প্রবেশ করে। বিএসএমএমইউ থেকে তার গাড়িবহর রওনা হয় বেলা ৪টা ২০ মিনিটে। এ সময় করোনা সতর্কতার কারণে ভিড় না করার জন্য দলীয় নির্দেশনা থাকলেও হাজার হাজার উজ্জীবিত নেতাকর্মীর ভিড় ডিঙ্গিয়ে খালেদা জিয়াকে সামনে এগিয়ে নিতে নিরাপত্তাকর্মীদের চরম বেগ পেতে দেখা য়ায়। খালেদা জিয়ার পরনে এ সময় ছিল পিংক কালারের শাড়ি এবং স্কার্ফ। মুখে ছিল সার্জিক্যাল মাস্ক। চোখে চকোলেট কালারের সান গ্লাস। একই গাড়িতে পেছনের আসনে ছোট ভাই শামীমের স্ত্রী কানিজ ফাতিমাও ছিলেন।
অন্য একটি গাড়িতে খালেদা জিয়ার কারাবন্দিত্বের সঙ্গী গৃহকর্মী ফাতেমা বেগমও গুলশানের বাসায় আসেন। এর আগে খালেদা জিয়াকে নিতে হাসপাতালে পৌঁছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও খালেদা জিয়ার পরিবারের সদস্যরা।
বেলা পৌনে ৩টার দিকে মির্জা ফখরুল বিএসএমএমইউ হাসপাতালে আসেন। এ সময় খালেদা জিয়াকে নিয়ে যাওয়ার জন্য কয়েকটি গাড়িও হাসপাতালে প্রবেশ করে। মির্জা আলমগীর হাসপাতালে প্রবেশ করলে নেতাকর্মীরা তাকে ঘিরে ধরেন। পরে বিএনপির মহাসচিব হ্যান্ড গ্লাভস পরে খালেদা জিয়া যেখানে বন্দী আছেন সে দিকে (কেবিন ব্ল­ক) যান। পাশাপাশি শামীম ইস্কান্দার ও সেজ বোন সেলিমা ইসলাম হাসপাতালে পৌঁছেন। তারা চার চিকিৎসক ও এক নার্স নিয়ে খালেদা জিয়ার কাছে যান।
এ সময় বিএনপির নেতাকর্মীরা হাসপাতাল প্রাঙ্গণে ভিড় করেন। বেলা সাড়ে ৩টার দিকে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নিচে নেমে এসে নেতাকর্মীদের সরে যাওয়ার অনুরোধ করেন। অনেক কষ্টে তিনি নেতাকর্মীদের সরাতে সক্ষম হন।
বিকেল ৪টা ৯ মিনিটে খালেদা জিয়ার ব্যবহৃত জিনিসপত্র হাসপাতাল থেকে বের করে আনা হয়। এরপর ৪টা ১২ মিনিটে পরিবারের সদস্য ও বিএনপির মহাসচিব বের হয়ে আসেন। ৪টা ১৪ মিনিটে খালেদা জিয়াকে হাসপাতাল থেকে হুইল চেয়ারে করে বের করা হয়। এ সময় আশপাশে নেতাকর্মীরা ভিড় করেন। তারা ‘খালেদা জিয়া’ বলে মুহুর্মুহু স্লোগান দেন। সেই ভিড় ঠেলে খালেদা জিয়ার গাড়ি বের করেন নিরাপত্তাকর্মীরা।
ফিরোজায় গাড়িটি পৌঁছার পর সেলিমা ইসলাম ও তার স্বামী রফিকুল ইসলাম, মরহুম সাইদ ইস্কান্দারের স্ত্রী নাসরিন ইস্কান্দার, জোবায়দা রহমানের বড় বোন শাহিনা খান জামান বিন্দুসহ পরিবারের সদস্যরা তাকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান।
সেজ বোন ও ছোট ভাইয়ের স্ত্রীর হাতে ভর করে তিনি গাড়ি থেকে নেমে হুইল চেয়ারে বসেন।
ফিরোজায় খালেদা জিয়ার গাড়ি পৌঁছলে সেখানে শত শত নেতাকর্মী সড়কের দুই পাশে দাঁড়িয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মওদুদ আহমদ, মির্জা আব্বাস, সেলিমা রহমান, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, ভাইস চেয়ারম্যান এ জেড এম জাহিদ হোসেন, যুগ্ম মহাসচিব হাবিব-উন নবী খান সোহেল, ঢাকা সিটি করপোরেশনের গত নির্বাচনে মেয়রপ্রার্থী ইশরাক হোসেন ও তাবিথ আউয়াল উপস্থিত ছিলেন।
ফিরোজাতে খালেদা জিয়া প্রবেশের পর মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ম্যাডাম অসুস্থ। তার সাথে কথা বলে আমরা তার চিকিৎসকদের সাথে আলাপ করব। তিনি বলেন, আল্লাহর কাছে হাজার শুকরিয়া তাকে বাসায় নিয়ে আসলাম।
জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় দণ্ডাদেশ পেয়ে ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে কারাগারে বন্দী ছিলেন বিএনপির চেয়ারপারসন সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। পরে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় তাকে সাত বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়। কারাগারে অসুস্থ হয়ে পড়লে সর্বশেষ গত বছরের ১ এপ্রিল তাকে চিকিৎসার জন্য বিএসএমএমইউ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
গত মঙ্গলবার অনেকটা আকস্মিকভাবেই খালেদা জিয়ার দণ্ড স্থগিত করে ছয় মাসের জন্য মুক্তির নির্দেশ দেয় সরকার। খালেদা জিয়াকে ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১-এর উপধারা ১ অনুযায়ী নির্বাহী আদেশে মুক্তি দেয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে শর্ত হচ্ছে, খালেদা জিয়া দেশের বাইরে যেতে পারবেন না। তিনি বাসায় থেকে চিকিৎসা নেবেন।
স্বাস্থ্যগত অবনতির কথা উল্লেখ করে তার পরিবারের পক্ষ থেকে উচ্চ আদালতে দুই দফা জামিনের আবেদন করা হয়। সবশেষ গত ২৭ ফেব্রুয়ারি জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় খালেদা জিয়ার জামিন আবেদন খারিজ করে দেন আপিল বিভাগ। উচ্চ আদালতে জামিনের আবেদন খারিজ হওয়ার পর খালেদা জিয়ার পরিবারের সদস্যরা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও আইন মন্ত্রণালয়ে দুই দফায় আবেদন করেন। পাশাপাশি তারা প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করে মানবিক কারণে মুক্তি দেয়ার অনুরোধ জানান।


আরো সংবাদ