০১ এপ্রিল ২০২০

  করোনাভাইরাস শনাক্তে বিমানবন্দরে বসছে কোরিয়ান স্ক্যানিং মেশিন সিঙ্গাপুর ও চীনফেরতদের ভর্তি করা হচ্ছে পুলিশ হাসপাতালে

-

করোনাসহ যেকোনো ধরনের ভাইরাস শনাক্তে দেশের সব বিমানবন্দরে বসানো হচ্ছে কোরিয়ান টেকনোলজির স্ক্যানিং মেশিন। বর্তমানে বিমানবন্দরগুলোতে যে প্রযুক্তিতে করোনাভাইরাস শনাক্ত করা হচ্ছে সেটার পাশাপাশি অতিরিক্ত হিসেবে কোরিয়ান ওই প্রযুক্তির স্ক্যানিং মেশিন বসানো হবে।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল হক এসব তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, এটা টেস্ট কেস (পরীক্ষামূলক)। গতকাল মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে সচিবালয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি একথা বলেন। এর আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে তার কার্যালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এই বৈঠকে করোনাভাইরাস নিয়ে কোনো আলোচনা হয়েছে কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, আজ এটা নিয়ে স্পেসিফিক আলোচনা হয়নি। গতকাল, তার আগের দিন, রেগুলার এটা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। গত বুধবার একটা বিষয়ে আলোচনা উঠিয়েছিলেন আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। কোরিয়া থেকে ওনার কাছে একটা প্রস্তাব এসেছে। সেটি হচ্ছে স্ক্যানিং সিস্টেম। আমাদের যে পদ্ধতিটা (স্ক্যানিং) আছে এর চেয়েও তাদেরটা সিকিউরড। আরো মোডিফাইড জিনিস। সব বিমানবন্দরে আমাদের যে স্ক্যানিং সিস্টেম আছে সেটাও থাকবে, পাশাপাশি অতিরিক্ত হিসেবে কোরিয়ান টেকনোলজির ওই স্ক্যানিং মেশিনও সরবরাহ করা টেস্ট কেস হিসেবে।
খন্দকার আনোয়ারুল হক জানান, কোরিয়ান টেকনোলজির এই স্ক্যানিং মেশিনে শুধু করোনা নয়, যেকোনো ভাইরাস ধরা পড়বে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছে। কী পরিমাণ কোরিয়ান এই স্ক্যানিং মেশিন দেয়া হচ্ছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার কাছে চিঠি আসতেছে। চিঠি পাওয়ার পর বিস্তারিত জানা যাবে।
সিঙ্গাপুর ও চীনফেরতদের ভর্তি করা হচ্ছে পুলিশ হাসপাতালে : বিমানবন্দরে যথাযথ স্বাস্থ্য পরীক্ষার পর বিদেশ থেকে আগতরা নিজ নিজ বাড়িতে যাওয়ার পরও পুলিশ তাদের হয়রানি করছে। বিশেষ করে সিঙ্গাপুর ও চীন থেকে আসা যাত্রীদের বাড়িতে গিয়ে পুলিশ হাজির হচ্ছে এবং স্বাস্থ্য বিভাগের অনুমতি ছাড়া তাদের হাসপাতালে ভর্তি করে দেয়ার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। এ ব্যাপারে আইইডিসিআর পড়ছে বিব্রতকর অবস্থায়। আইইডিসিআর বলছে, প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরীক্ষা, পরামর্শ ও ফোন নাম্বার রেখে এবং জ্বর ও কাশির মতো অসুস্থতা দেখা দিলে আইইডিসিআরের সাথে যোগাযোগ করার পরামর্শ দিয়েই বিমানবন্দর থেকে বিদেশফেরত যাত্রীদের ছাড়া হচ্ছে। ‘এ ধরনের যাত্রীদের বাড়ি গিয়ে জোর করে তাদের হাসপাতালে ভর্তি না করতে’ আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক মীরজাদি সেব্রিনা ফ্লোরা পুলিশ ও জনপ্রশাসনের কর্মকর্তাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। গতকাল সোমবার আইইডিসিআরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ আহ্বান জানান।
অধ্যাপক ফ্লোরা বলেন, ‘এ ধরনের তৎপরতা গ্রহণযোগ্য নয়।’ ‘সিভিল সার্জন বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত ছাড়া নিজ উদ্যোগে জনস্বাস্থ্য বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ না নিতে’ সংবাদ সম্মেলনে অনুরোধ করেছেন। আইইডিসিআরের পরিচালক বলেন, ‘বিদেশ থেকে আগত যাত্রীদের সব তথ্যই আমাদের কাছে আছে।’ ‘সিঙ্গাপুর কিংবা চীন থেকে এলেই তারা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হবেন’ এমন নয়। তিনি পুলিশ ও জনপ্রশাসনের কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেন, ‘আমাদের অনুরোধ, সিভিল সার্জন বা স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত ব্যতিরেকে নিজ উদ্যোগে জনস্বাস্থ্য বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয়া থেকে বিরত থাকুন।’
স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভা : জাতীয় সংসদ ভবনে গতকাল সোমবার স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণবিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। শেখ ফজলুল করিম সেলিম এমপির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ সভায় কমিটির সদস্য স্বাস্থ্যমন্ত্রীসহ অন্য সংসদ সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। বাংলাদেশে কোভিড-১৯ প্রতিরোধ কার্যক্রম ও সংক্রমণ মোকাবেলার প্রস্তুতি তুলে ধরেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব, স্বাস্থ’্য অধিদফতরের মহাপরিচালক, আইইডিসিআর ও রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক। সংসদীয় কমিটির সদস্যরা চলমান কার্যক্রম ও প্রস্তুতি নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন ও সব প্রকার সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
চীন-সিঙ্গাপুরফেরত যাত্রী মানেই সন্দেহজনক কোভিড-১৯ রোগী নয় : সংবাদ সম্মেলনে অধ্যাপক ফ্লোরা বলেন, ‘চীন ও সিঙ্গাপুর থেকে প্রতিদিন অনেক যাত্রী বাংলাদেশে আসছেন। চীনের সব প্রদেশে কোভিড-১৯ মহামারীর প্রাদুর্ভাব ঘটেনি। চীনের যেসব অঞ্চলে মহামারী ও প্রাদুর্ভাব ঘটেছে, চীন সরকার সেসব অঞ্চলে গণ-কোয়ারেন্টাইন ব্যবস্থা জারি করেছে ও সব প্রকার যাতায়াত বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে মহামারী উপদ্রুত এলাকা থেকে কারো বাংলাদেশে আসার সুযোগ নেই। অনুরূপভাবে গোটা সিঙ্গাপুর শহরে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঘটেনি। যেসব প্রতিষ্ঠান ও বাসাবাড়িতে কোভিড-১৯ নিশ্চিত রোগী শনাক্ত হয়েছে সেসব অঞ্চল ও প্রতিষ্ঠানকে সিঙ্গাপুর সরকার শহরের অন্যান্য অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রোগীদের আইসোলেশন ও তাদের সংস্পর্শে আসা সবাইকে কোয়ারেন্টাইন করেছে। ফলে সিঙ্গাপুরের কোভিড-১৯ উপদ্রুত অঞ্চল থেকে কোনো যাত্রীর বাংলাদেশে আসার সুযোগ নেই।’
অধ্যাপক ফ্লোরা বলেন, ‘সতর্কতার অংশ হিসেবে আমরা বাংলাদেশে আগত চীন ও সিঙ্গাপুরফেরত যাত্রীদের মধ্যে যারা জ্বর, হাঁচি ও কাশিতে ভুগছেন তাদের আইসোলেশন করে চিকিৎসার ব্যবস্থা ও নমুনা পরীক্ষা করছি। অবশিষ্টদের যার যার বাসাতে স্বেচ্ছা- কোয়ারেন্টাইনে থাকার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে; কিন্তু চীন ও সিঙ্গাপুরফেরত যাত্রীরা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের আচরণে ব্যক্তিগত ও সামাজিক নিরাপত্তার অভাব বোধ করলে তারা জ্বর-হাঁচি-কাশিতে ভুগলেও সরকারি স্বাস্থ্যসেবা নিতে নিরুৎসাহিত বোধ করবেন। ফলে কোভিড-১৯ শনাক্তকরণ, প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আমরা সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর জেলা-উপজেলা কর্মকর্তাদের সন্দেহজনক কোভিড-১৯ আক্রান্ত ব্যক্তির বিষয়ে নিজেরা কোনো সিদ্ধান্ত না নিয়ে স্থানীয় সরকারি স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের কাছে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে এবং স্বাস্থ্য বিভাগের সাথে সমন্বয় ও সহযোগিতা করার আহ্বান জানাচ্ছি।’
শার্শা (যশোর) সংবাদদাতা জানান, নভেল করোনাভাইরাস সংক্রমণের হাত থেকে রক্ষার জন্য বেনাপোল স্থল বন্দরে নেয়া হয়েছে ব্যাপক সতর্কতা। গত ২৭ দিনে ভারত থেকে আগত ৬৫ হাজার যাত্রীকে করোনাভাইরাস পরীক্ষা করা হয়েছে। তবে কারোর শরীরে ভাইরাসের আলামত পাওয়া যায়নি। যশোর সিভিল সার্জন শেখ আবু শাহিন জানান, চীন থেকে উৎপত্তি নভেল করোনাভাইরাস সংক্রমণ থেকে দেশকে রক্ষার জন্য বেনাপোল স্থলবন্দরে নেয়া হয়েছে ব্যাপক সতর্কতা। গত ১৯ জানুয়ারি হতে ১৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ২৭ দিনে ৬৪ হাজার ৭৪৩ জন যাত্রীকে পরীক্ষা করা হয়েছে। প্রতি ২৪ ঘণ্টায় পরীক্ষা করা হচ্ছে ৪ হাজার থেকে সাড়ে ৪ হাজার যাত্রীকে। এদের মধ্যে ট্রেন, বাস, ট্রাকের ড্রাইভার ও হেলপার রয়েছে। গতকাল ৪ হাজার ৩৩৫ জনকে পরীক্ষা করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪২৫ জন ড্রাইভার রয়েছে। এ ছাড়া ট্রেনের স্টাফ রয়েছে ১১ জন।
হবিগঞ্জ সংবাদদাতা জানান, ‘করোনাভাইরাস’ আক্রান্ত সন্দেহে রায়হান আহমেদ (২৮) নামে চীনফেরত এক মেডিক্যাল শিক্ষার্থীকে নিয়ে হবিগঞ্জ সদর আধুনিক হাসপাতালে চলছে তোলপাড়। চিকিৎসক-নার্স, কর্মকর্তা-কর্মচারী, রোগী ও স্বজনদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে আতঙ্ক। পুলিশ প্রহরায় তাকে বিশেষ ওয়ার্ডে রেখে করা হচ্ছে পর্যবেক্ষণ। রায়হান আহমেদ হবিগঞ্জ শহরের শায়েস্তানগর এলাকার আব্দুন নূরের পুত্র। তিনি চীনে মেডিক্যাল ইন্টার্নি কোর্স করতে গিয়েছিলেন।
জানা যায়, করোনাভাইরাস মহামারী আকার ধারণ করার পর সম্প্রতি দেশে আসেন রায়হান। রোববার দুপুরে অসুস্থতাবোধ করলে হবিগঞ্জ সদর আধুনিক হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসেন। এ সময় তাকে ঘিরে শুরু হয় তোলপাড়। চিকিৎসক-নার্স, কর্মকর্তা-কর্মচারী, রোগী ও স্বজনদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক। অনেক রোগী ও স্বজনকে তখন হাসপাতাল থেকে পালিয়ে যেতেও দেখা যায়। তবে রায়হানের মা বাবা দাবি করছিলেন তিনি করোনাভাইরাস আক্রান্ত নন। একপর্যায়ে তিনি আতঙ্ক কমাতে চিকিৎসা না নিয়েই বাসায় ফিরে যান।
এ দিকে, বিষয়টি নজরে আসে পুলিশ প্রশাসনের। রোববার রাতে হবিগঞ্জ সদর মডেল থানা পুলিশ রায়হান আহমেদকে বাসা থেকে আবারো হাসপাতালে নিয়ে আসেন।


আরো সংবাদ

সকল