০৭ আগস্ট ২০২০

ফের জাবি ভিসির বাসভবনের সামনে আন্দোলনকারীরা

ছাত্রলীগ সম্পাদক চঞ্চলের পদত্যাগ
-
24tkt

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা এবং ক্যাম্পাসে সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করা হলেও থেমে নেই দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন। গত মঙ্গলবার থেকে প্রশাসনের নির্দেশে একে একে ছাত্রছাত্রীদের সব হল খালি করা, ক্যাম্পাসের ছোটবড় সব প্রকার খাবারের দোকান বন্ধ ঘোষণা, ক্যাম্পাসের নিরাপত্তার জন্য অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করাÑ এসব কৌশলী পদক্ষেপ নিয়েও আন্দোলন দমাতে পারেনি। আন্দোলনকারীরা বলছে যত ধরনের অসুবিধা, কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি করা হোক না কেন তারা ক্যাম্পাসে আন্দোলন চালিয়ে যাবেন। এ দিকে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আবু সুফিয়ান চঞ্চল পদত্যাগ করেছেন। তবে তার পদত্যাগের কোনো কারণ জানা যায়নি।
মঙ্গলবার জরুরি সিন্ডিকেট সভায় ক্যাম্পাস বন্ধ করার পর বৃহস্পতিবার পর্যন্ত তিন দিন অতিবাহিত হলেও আন্দোলনের মাঠে রয়েছেন তারা। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে জাবির দুই প্রশাসনিক ভবন অবরোধ করে অবস্থান করে। তারপর সকাল ১০টা থেকে দুপুর পর্যন্ত ক্যাম্পাসের আশপাশে থাকা আন্দোলনকারীরা জমায়েত হতে থাকেন। বেলা ১টায় জাবির পুরাতন রেজিস্ট্রার ভবনের সামনে থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রান্সপোর্ট চত্বর, চৌরঙ্গী, প্রান্তিক গেট প্রদক্ষিণ করে ভিসির বাসভবনের সামনে বিক্ষোভ করেন। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরাতন প্রশাসনিক ভবনের সামনে থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে সন্ধ্যা ৬টা ২৫ মিনিটে ভিসির বাসভবনের সামনে গিয়ে অবস্থান নেন আন্দোলনকারীরা। তাদের পাশে ভিসির বাসভবনের জন্য নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরি করেছে পুলিশ।
এ সময় আন্দোলনকারীরা ভিসি অপসারণের দাবিতে ‘যে হাত ছাত্র মারে, সে হাত ভেঙে দাও’, যে ভিসি মামলা করে সে ভিসি চাই না, যে ভিসি দুর্নীতি করে সেই ভিসি চাই না স্লোগান দিতে থাকে। এ ছাড়াও হল ভ্যাকান্টের বিষয়ে ‘আমাদের ক্যাম্পাসে আমরা থাকবো, দুর্নীতিবাজ থাকবে না’ স্লোগান দিতে দেখা যায়।
বিক্ষোভ মিছিলটি আবার রেজিস্ট্রার ভবনের সামনে এসে অবস্থান কর্মসূচিতে পরিণত হয়। এ সময় আন্দোলনকারীরা ভিসি অপসারণ ও দুর্নীতির তদন্তের বিষয়ে সরকারের সদিচ্ছার অভাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেন। ‘উপাচার্য অপসারণ মঞ্চে’ বক্তৃতায় আন্দোলনকারী ইংরেজি বিভাগের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন ‘জাবি ভিসির দুর্নীতি প্রমাণিত না হলে অভিযোগকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে’। তিনি (প্রধানমন্ত্রী) আগে তদন্তের মাধ্যমে ভিসির দুর্নীতি খতিয়ে দেখতে পারতেন। তারপর তদন্ত রিপোর্টের আলোকে অভিযোগকারীদের ‘ধন্যবাদ প্রদান’ বা মিথ্যা হলে তার জন্য ‘ব্যবস্থা’ নিতে পারতেন। অথচ প্রধানমন্ত্রী আগেই ব্যবস্থা নেয়ার হুমকি দিয়ে দিলেন। যাতে করে আন্দোলন থেমে যায়। আর যদি অভিযোগের জন্য ব্যবস্থা নিতেই হয় তাহলে আগে ব্যবস্থা নিতে হবে আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে। কারণ জাবি ছাত্রলীগের এক সহসভাপতি ও একজন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সরাসরি মিডিয়া লাইভে অভিযোগ করেছে যে তারা ভিসি পক্ষ থেকে ২৫ লক্ষ টাকা করে পেয়েছেন এবং কোন হল, কোন নেতা কত পেয়েছে তাও মিডিয়ায় বলেছে। সুতরাং বিচার করতে হলে তাদের বিচার আগে করতে হবে। তারা আরো বলেন, আমরা যে অভিযোগ পেয়েছি, তা তদন্ত করার দায়িত্ব সরকারের। আমরা তো গোয়েন্দা সংস্থার লোক নই, আমরা কিভাবে দুর্নীতি প্রমাণ করব?
আন্দোলনকারী অধ্যাপক সাঈদ ফেরদৌস বলেন, গতকাল শিক্ষা উপমন্ত্রী যে কথা বলেছেন, সে কথার সাথে আমরা দ্বিমত পোষণ করছি। উনি আমাদের প্রমাণসহ লিখিত অভিযোগ করতে বলেছেন। আমরা তো বিষয়টি প্রমাণ করতে আসিনি, আমরা অভিযোগ তুলেছি। এখন তদন্ত করে এই অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতা সম্পর্কে অধ্যাপক জামাল উদ্দিন রুনু বলেন, ‘অভিযোগের তদন্ত না করে প্রধানমন্ত্রী ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলা ঠিক হয়নি। তিনি দেশের প্রধান নির্বাহী হিসেবে দুর্নীতির বিষয়টি তদন্তের ভিত্তিতে সুরাহা করার ব্যবস্থা করতে পারতেন। অথচ তিনি অভিযোগকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বললেন। বিষয়টি আমাদের হতবাক ও মর্মাহত করেছে।’
আন্দোলনের বিষয়ে ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি নজির আমিন চৌধুরী জয় বলেন, প্রশাসন আমাদের খাদ্য, পানি, বাসস্থান বন্ধ করে যতই অমানবিক হোক না কেন! আমরা আন্দোলন চালিয়ে যাবো। ক্যাম্পাস টানা বন্ধ থাকলেও আমরা যদি ‘বিশজন বা সত্তরজন থাকি না কেন আমাদের আন্দোলন চলবে।’ ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর’ মঞ্চের সংগঠক ও সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট জাবি শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক শোভন রহমান বলেন, ‘সভা-সমাবেশ-মিছিলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে আমরা জমায়েত হয়েছি। ওই নিষেধাজ্ঞা দেখেই বোঝা যায়, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আন্দোলনকারীদের কতটা ভয় পায়। আমরা শান্তিপূর্ণভাবে গান, কবিতা পাঠের মতো কর্মসূচি পালন করব।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর (ভারপ্রাপ্ত) আ স ম ফিরোজ-উল-হাসান বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ রয়েছে। শিক্ষার্থীদের আবাসিক হলগুলো ফাঁকা হয়ে গেছে। এখন কেউ যদি পরিস্থিতি অস্বাভাবিক করে, তবে তা শৃঙ্খলাবিরোধী কাজ হবে।’ পরিস্থিতির অবনতি হলে অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলেও জানান ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর।
জাবি ছাত্রলীগ সম্পাদক চঞ্চলের পদত্যাগ : জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সম্পাদক এস এম আবু চঞ্চল পদত্যাগ করেছেন। ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় দফতর সম্পাদক আহসান জানান, গত মঙ্গলবার জাবি শাখা ছাত্রলীগের সম্পাদক এস এম আবু সুফিয়ান চঞ্চল কেন্দ্রে পদত্যাগপত্র পাঠায়। তবে কী কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেছে এ বিষয় জানায়নি আহসান হাবিব। এ বিষয়ে জানতে চঞ্চলকে একাধিকবার ফোন করেও পাওয়া যায়নি।
বিষয়টি সম্পর্কে জাবি শাখা ছাত্রলীগ সভাপতি জুয়েল রানার কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি এ বিষয়ে কিছু জানি না, কেন্দ্রও কিছু জানায়নি।
২০১৬ সালের ২৭ ডিসেম্বর এক বছরের জন্য জাবি শাখা ছাত্রলীগের কমিটি ঘোষণা করেন তৎকালীন সোহাগ জাকির কমিটি। এরপর দুই বছর দশ মাস অতিবাহিত হলেও আর কোনো নতুন কমিটি হয়নি।
গত ঈদুল আজহার আগে জাবির মেগাপ্রজেক্ট থেকে ছাত্রলীগ দুই কোটি টাকা পাওয়া অভিযোগ উঠেছে। তারপর থেকে জাবিতে ভিসি অপসারণের দাবিতে আন্দোলন চলতে থাকে।
দীর্ঘ দিন ধরে ছাত্রলীগের সেক্রেটারি প্যানেলে দুই গ্রুপ থাকায় ক্যাম্পাসে কোণঠাসা ছিলো সেক্রেটারি চঞ্চল। তবে জাবি ছাত্রলীগের বিদ্রোহী গ্রুপের নেতারা বলছে, মেগাপ্রজেক্ট থেকে টাকা পাওয়ার পর চঞ্চল ক্যাম্পাসে অনিয়মিত হয়ে পড়ে।
জাবিতে ভিসির দুর্নীতিবিরোধী কনসার্ট : জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ফারজানা ইসলামের অপসারণের দাবিতে প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ভিসি বাসভবনের সামনে প্রতিবাদী কনসার্ট করছে ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর’।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় বিক্ষোভ মিছিল শেষে ভিসি বাসভবনের সামনের সড়কে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা অবস্থান করে এবং প্রতিবাদী কনসার্ট আয়োজন করে।
এ আন্দোলনে সংহতি জানিয়ে কনসার্টে গান গাইতে আসছেন জাবি প্রাক্তন ছাত্র সিনা হাসান, আহমেদ হাসান সানী, তুহিন কান্তি দাস, নাইম মাহমুদ ও মুইজ মাহফুজ। গান ও কবিতা আবৃত্তিসহ বিভিন্ন পরিবেশনায় রয়েছে তারা। এ সময় আন্দোলনকারী শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা ‘শিক্ষা আর সন্ত্রাস এক সাথে চলে না’, ‘ছি ছি ফারজানা লজ্জায় বাঁচি না’, ‘গেট আউট ফারজানা’, ‘রক্ত দেবো জীবন দেবো ক্যাম্পাস তবু ছাড়ব না’সহ নানা ধরনের ফেস্টুন ও ব্যানার হাতে নিয়ে অবস্থান করেন। রাত সাড়ে ৯টায় তাদের কনসার্টটি শেষ হয়।
কনসার্ট শেষে আন্দোলনকারীরা শুক্রবার বেলা ১২টায় একটি বিক্ষোভ করার ঘোষণা দেয়। এ ছাড়াও সাবেক শিক্ষার্থীরা ঢাকায় সংহতি সমাবেশ করার কথা রয়েছে।


আরো সংবাদ