১০ জুলাই ২০২০

আইন নিজের হাতে তুলে নেয়ার প্রবণতায় উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা চরমে

আইন নিজের হাতে তুলে না নিতে পুলিশ সদর দফতরের নির্দেশ ; আস্থাহীনতার কারণে এমন ঘটনা ঘটছেÑ মানবাধিকার কর্মীদের অভিমত
-

ছেলে ধরা সন্দেহে একের পর এক গণপিটুনি। বেড়ে চলছে হতাহতের ঘটনাও। গতকাল এক দিনেই রাজধানীর বাড্ডা, কেরানীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে তিনজনকে। আহত হয়েছেন আরো কয়েকজন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে এটা ফৌজদারি অপরাধ। যারা আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছেন তারা ফৌজদারি অপরাধ করছেন। মানবাধিকার কর্মী এবং বিশিষ্টজনরা বলছেন, আইন নিজের হাতে তুলে নেয়া ঠিক নয়। এতে নিরপরাধ মানুষও হত্যা নির্যাতনের শিকার হতে পারেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কিছু দিন ধরেই ছেলেধরার ইস্যুটি সামনে চলে আসে। এ নিয়ে অনেক এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বিষয়টি নিয়ে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে মানুষকে সচেতন করার লক্ষ্যে বক্তব্য প্রদান করা হয়। এরই মধ্যে হঠাৎ গত বৃহস্পতিবার নেত্রকোনায় ঘটে যায় এক নৃশংস ঘটনা। গত বৃহস্পতিবার দুপুরের দিকে নেত্রকোনায় ব্যাগে করে এক শিশুর ছিন্নমাথা নিয়ে পালানোর সময় এক যুবককে পিটিয়ে হত্যা করে ক্ষুব্ধ জনতা। নেত্রকোনার নিউটাউন পুকুরপাড় এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। ঘাতক ওই যুবক শিশুর কাটা মাথাসহ হরিজন পল্লীতে মদপান করতে যায়। বিষয়টি টের পেয়ে স্থানীয়রা ওই যুবককে ধাওয়া করলে তার ব্যাগ থেকে কাটা মাথাটি রাস্তায় পড়ে যায়। পরে ওই যুবককে ধরে গণপিটুনি দিলে ঘটনাস্থলেই সে মারা যায়। নিহত ওই শিশুটির নাম সজীব মিয়া (৮)। শিশুটির বাবা ওই শহরেই রিকশা চালান। পরে সজীবের দেহটিও উদ্ধার করা হয়।
নেত্রকোনার এই ঘটনার পর আবারো মানুষের মধ্যে অপহরণ ও গলাকাটা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। মানুষের মধ্যে সন্দেহ প্রবল হয়ে ওঠে। মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, সন্দেহ থেকেই এমন ঘটনা ঘটছে। নেত্রকোনার ওই যুবক কেন কি কারণে শিশুটির মাথা কেটে ব্যাগে নিয়েছিল তা কিন্তু জানা যায়নি। তার আগেই তাকে পিটিয়ে হত্যা করা হলো। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারলে হয়তো ওই খুনের মোটিভ জানা যেত। তার কোনো বক্তব্য না পাওয়ায় এই শিশুটির মাথাকাটা নিয়ে গুজবের আরো অনেক ডালপালা ছড়িয়েছে।
বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক মোস্তফা সোহেল গতকাল নয়া দিগন্তকে বলেন, এভাবে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা একটি ফৌজদারি অপরাধ। কিন্তু তারপরেও আইন নিজের হাতে তুলে নেয়ার ঘটনা ঘটছে। তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর আস্থাহীনতার কারণে মানুষে ধৈর্যচ্যুতি ঘটেছে। পিঠ যখন দেয়ালে ঠেকে যায়, আর যখন কোনো উপায় থাকে না তখনই এমন ঘটনা ঘটে। মানুষ যখন বিচারহীনতা, পক্ষপাতিত্ব বা রাজনৈতিক দুর্র্বৃত্তায়ন ও দেউলিয়াপনার শিকার হয় তখনই আইন নিজের হাতে তুলে নেয়। সোহেল বলেন, একজন মানবাধিকার কর্মী হিসেবে এগুলোকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলতে পারছি না। তিনি বলেন, এভাবে চলতে থাকলে এক সময় আমরা সবাই আক্রান্ত হবো। এই নৃশংসতা ঠেকাতে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরো দায়িত্বশীল হতে হবে।
মানবাধিকার নির্যাতন প্রতিরোধ সোসাইটির নির্বাহী পরিচালক রেজাউল কবির রেজা গতকাল বলেন, মানুষ যখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ওপর আস্থা রাখতে পারে না তখনই এমন নৃশংস ঘটনা ঘটে। তিনি বলেন, আইন নিজের হাতে তুলে নেয়া ফৌজদারি অপরাধ। এ থেকে বিরত থাকার অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের উচিত জনগণের মধ্যে তাদের সম্পর্কে আস্থা ফিরিয়ে আনা।
এ দিকে পুলিশ সদর দফতর গুজব না ছড়াতে এবং আইন নিজের হাতে তুলে না নেয়ার জন্য নির্দেশ দিয়েছে। গতকাল পুলিশ সদর দফতর থেকে বলা হয়েছে, ‘পদ্মা সেতু নির্মাণে মানুষের মাথা লাগবে বলে একটি গুজব ছড়ানোকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে মর্মান্তিকভাবে কয়েকজনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। গুজব ছড়িয়ে দেশে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করা রাষ্ট্রবিরোধী কাজের শামিল এবং গণপিটুনি দিয় মৃত্যু ঘটানো ফৌজদারি অপরাধ। পুলিশ সদর দফতর বলেছে, ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনির শিকার হয়ে যে ঘটনাগুলো ঘটেছে তা তদন্ত করে পুলিশ ব্যবস্থা নেবে।

 


আরো সংবাদ