০১ ডিসেম্বর ২০২২, ১৬ অগ্রহায়ন ১৪২৯, ৬ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪ হিজরি
`

ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার রিজার্ভ সৈন্য সমাবেশের অর্থ কী?

ইউক্রেন যুদ্ধের বিরূপ প্রভাব পড়েছে সারা বিশ্বে - ছবি : বিবিসি

ইউক্রেন যুদ্ধের জন্য রাশিয়া তিন লাখ রিজার্ভ সৈন্য সমাবেশ করার ঘোষণা দিয়েছে। অনেকে বলছেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর রাশিয়া প্রথমবারের মতো এ ধরনের পদক্ষেপ নিলো।

রাশিয়ার কাছ থেকে প্রায় ছয় হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা ইউক্রেন পুনরায় দখল করে নেয়ার দু’সপ্তাহের মধ্যেই রাশিয়ার তরফ থেকে রিজার্ভ সৈন্য সমাবেশের ঘোষণা দেয়া হলো।

রিজার্ভ সৈন্য তলব করার পর রাশিয়ায় বিক্ষোভ হয়েছে। বিক্ষোভের দায়ে পুলিশ এক হাজারের বেশি বিক্ষোভকারীকে আটক করেছে।

এ ঘোষণার পর রাশিয়া থেকে অনেকে দেশের বাইরে চলে যেতে চাচ্ছে। কারণ, ইউক্রেন যুদ্ধে তারা যোগ দিতে চায় না।

রিজার্ভ সৈন্য ডাকার অর্থ কী?
রুশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী সার্গেই শোইগু বলেছেন, ইউক্রেনে যুদ্ধের জন্য তিন লাখ রিজার্ভ সৈন্যকে তলব করা হবে।

তিনি বলেন, এই সংখ্যাটি রাশিয়ার মোট আড়াই কোটি রিজার্ভ সৈন্যদের মাত্র এক শতাংশ।

সাধারণ মানুষের মধ্যে যাদের সামরিক প্রশিক্ষণ আছে তাদের রিজার্ভ সৈন্য হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়। এছাড়া রিজার্ভ তালিকায় সাবেক সৈন্যরাও রয়েছে।

ধারণা করা হয়, রাশিয়া তাদের প্রায় ১ লাখ ৯০ হাজার নিয়মিত সৈন্য ইউক্রেনে যুদ্ধের জন্য মোতায়েন করেছে।

এখন সে সংখ্যার দ্বিগুণ রিজার্ভ সৈন্য তলব করা হয়েছে। তবে এই রিজার্ভ সৈন্যদের কিভাবে মোতায়েন করা হবে - সেটি এখনো পরিষ্কার নয়।

সমর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রিজার্ভ সৈন্য ডাকার অর্থ হচ্ছে যুদ্ধে রাশিয়ার অবস্থা খুব একটা ভালো যাচ্ছে না।

তুরস্কের ইস্তাম্বুলভিত্তিক সামরিক বিশ্লেষক মুরাত আসলান বিবিসি বাংলাকে বলেন, একটি যুদ্ধে নিয়মিত সেনাবাহিনী সফল হলে রিজার্ভ সৈন্য তলব করার দরকার হয় না।

রিজার্ভ সৈন্য তখনই ডাকা হয়, যখন যুদ্ধক্ষেত্রে নিয়মিত সৈন্যদের ক্ষতি সাধন হয়।

রাশিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী এরই মধ্যে বলেছেন, ইউক্রেন যুদ্ধে এরই মধ্যে তারা ছয় হাজার সৈন্য হারিয়েছে। যদিও পশ্চিমা দেশগুলোর হিসাবে এই সংখ্যা ২০ হাজারের বেশি হবে।

সংখ্যা যাই হোক না কেন, রাশিয়া যে ক্ষতির মুখে পড়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইতোমধ্যে বলেছেন, রাশিয়া দীর্ঘমেয়াদী লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত।

সমর বিশেষজ্ঞ এবং মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরের মালয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সৈয়দ মাহমুদ আলী বিবিসি বাংলাকে বলেন, রাশিয়া বুঝতে পেরেছে যে এ যুদ্ধ অতি সহজে এবং খুব শিগগিরই শেষ হবে না। এরই মধ্যে তাদের অনেক ক্ষতি হয়েছে, বিশেষ করে জনবলের।

‘যুদ্ধ এখন এমন একটি অবস্থায় আছে যেখানে দুই পক্ষই পরস্পরের ক্ষতিসাধন করছে,’ বলেন মাহমুদ আলী।

যুদ্ধের মোড় বদলাবে?
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেছেন, তিনি কোনো ফাঁকা বুলি আওড়াচ্ছেন না, কিন্তু ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষার জন্য তার দেশ ‘সম্ভাব্য সব উপায়’ ব্যবহার করবে।

পশ্চিমা দেশগুলো ইউক্রেনকে ৫ হাজার কোটি ডলারের অস্ত্র সহায়তা দিচ্ছে। এর মধ্যে কিছু অস্ত্র ইউক্রেনের কাছে এসেছে এবং আরো অস্ত্র আসবে।

‘সব অস্ত্র যদি ইউক্রেনের হাতে আসে তাহলে যুদ্ধের মোড় ঘুরে যেতে পারে,’ বলেন মাহমুদ আলী।

এজন্য রিজার্ভ সৈন্য সমাবেশ করে আগে থেকেই রাশিয়া প্রস্তুতি নিচ্ছে।

ইউক্রেনের রাশিয়া যেসব অঞ্চল দখল করেছে তার বেশিরভাগ এখনো তাদের নিয়ন্ত্রণেই আছে। এর মধ্যে চারটি অঞ্চলে গণভোটের আয়োজন করেছে রাশিয়া। এসব গণভোটের ফলাফল কি হবে সেটা সহজেই অনুমান করা যায়।

ইস্তাম্বুলভিত্তিক সমর বিশেষজ্ঞ মুরাত আসলান বিবিসি বাংলাকে বলেন, গণভোটের মাধ্যমে ইউক্রেনের সেসব অঞ্চলকে রাশিয়া তাদের অংশ করে নেবে। যেমনটা ২০১৪ সালে ক্রিমিয়ার ক্ষেত্রে হয়েছিল।

গণভোটের পর রাশিয়া সেসব অঞ্চলকে তারা রাশিয়ার অংশ হিসেবে বিবেচনা করবে। রাশিয়া সেসব অঞ্চল ধরে রাখতে চাইবে এবং সেখানে শক্তি বাড়াবে।

এজন্য পুতিন ‘মাতৃভূমি’ রক্ষার কথা বলছেন বলে উল্লেখ করেন মুরাত আসলান।

যুদ্ধ কি আরো তীব্র হবে?
সমর বিশেষজ্ঞ সৈয়দ মাহমুদ আলীর ভাষ্য হচ্ছে, ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার লক্ষ্য ছিল তিনটি।

১. ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলের রুশ ভাষাভাষী অধ্যুষিত দোনেৎস্ক এবং লুহানস্ক এলাকায় রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে সেখানে রুশ-ভাষী জনগণকে সুরক্ষা দেয়া।

২. ইউক্রেনে ডি-নাজিফিকেশন বা উগ্র-জাতীয়তাবাদ নির্মূল করা। যেটি মারিউপোল এলাকায় সক্ষম হয়েছে রাশিয়া।

৩. ইউক্রেনকে বেসামরিকীকরণ করা।

মাহমুদ আলী মনে করেন, ইউক্রেনকে বেসামরিকীকরণ করার লক্ষ্যে রাশিয়া পৌঁছাতে পারবে বলে মনে হচ্ছে না।

রাশিয়ার সৈন্য সংখ্যা ইউক্রেনের চেয়ে অনেক বেশি। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে ইউক্রেনের কৌশল এবং পশ্চিমাদের সরবরাহ করা অত্যাধুনিক অস্ত্র দু’পক্ষের মধ্যে ব্যবধান কমিয়ে এনেছে।

সমরবিদরা বলছেন, ইউক্রেন যুদ্ধে দুটো টার্নিং পয়েন্ট আছে। প্রথমটি হচ্ছে, কিয়েভের আশপাশ থেকে রাশিয়া যখন সৈন্য সরিয়ে নিয়েছিল।

দ্বিতীয় টার্নিং পয়েন্ট হচ্ছে, দুপ্তাহ আগে রাশিয়ার কাছ থেকে ইউক্রেন যখন পুনরায় কিছু ভূমি দখল করে নেয়।

ইস্তাম্বুলভিত্তিক সমরবিদ মুরাত আসলান বিবিসি বাংলাকে বলেন, চারটি অঞ্চলে গণভোট করে সেগুলো রাশিয়া নিয়ন্ত্রণে নেবার পর পুতিন হয়তো যুদ্ধবিরতি করতে পারেন।

কিন্তু ইউক্রেন সেটি কিছুতেই মানবে না। তারা সেসব অঞ্চল থেকে রাশিয়ার সৈন্যদের বিতাড়িত করার লড়াই করবে।

‘তখন যদি ইউক্রেন আরো সাফল্য লাভ করে, তাহলে প্রেসিডেন্ট পুতিন দেশের ভেতরে বড় ধরনের চাপে পড়বেন। সেক্ষেত্রে লড়াই আরো তীব্র হতে পারে,’ বলেন মুরাত আসলান।

সমরবিদদের অনেকে বলছেন, ইউক্রেনে রাশিয়া তাদের সমরশক্তি ব্যাপকভাবে ব্যবহার করেনি।

অধ্যাপক মাহমুদ আলী বলছেন, রাশিয়া তাদের বিমান ও নৌবাহিনীর অতিক্ষুদ্র অংশ ব্যবহার করেছে। কারণ তারা ইউক্রেনকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনতে চায়নি।

একই সাথে ইউক্রেন যেভাবে পাল্টা যুদ্ধ করছে সেটিও রাশিয়া অনুমান করতে পারেনি বলে মনে করেন অধ্যাপক আলী।

তাছাড়া পশ্চিমা দেশগুলো থেকে এতটা অস্ত্র সাহায্য আসবে সেটি রাশিয়া ভাবতে পারেনি।

যুদ্ধ শুরুর পর রাশিয়া দেখেছে যে কিছু পশ্চিমা রাষ্ট্র ইউক্রেনকে ব্যবহার করে রাশিয়ার বিরুদ্ধে অনেকটা সরাসরি যুদ্ধে নেমে গেছে। ফলে দেশকে রক্ষা করতে হলে রাশিয়াকেও আরো প্রস্তুতি নিতে হবে।

এজন্য পুতিন রিজার্ভ সৈন্য সমাবেশের ঘোষণা দিতে পারেন বলে মনে করছেন অধ্যাপক আলী।

তিনি বলেন, আসন্ন শীতকালে ইউরোপে জ্বালানি এবং অর্থনৈতিক সংকট দেখা দিতে পারে। ফলে ইউরোপ এবং আমেরিকার রাজনৈতিক পরিস্থিতি কোনদিকে যাবে সেটি নিয়েও রাশিয়া চিন্তা করছে।

রিজার্ভ সৈন্য সমাবেশ করার পেছনে এটিও অন্যতম কারণ হতে পারে বলে মনে করেন অধ্যাপক মাহমুদ আলী।

সূত্র : বিবিসি


আরো সংবাদ


premium cement