৩০ নভেম্বর ২০২১, ১৫ অগ্রহায়ন ১৪২৮, ২৪ রবিউস সানি ১৪৪৩ হিজরি
`

ইউরোপ ঢুকতে অভিবাসীদের যেভাবে সহায়তা করছে বেলারুশ

তিনজন অভিবাসী ও একজন সৈন্যের আঁকা ছবি পেছনে ইইউ এবং বেলারুসের পতাকা - ছবি : সংগৃহীত

ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের জারি করা নিষেধাজ্ঞার পাল্টা প্রতিশোধ হিসেবে বেলারুস অভিবাসনপ্রত্যাশীদের 'পর্যটন' ভিসা দিয়ে ইউরোপে ঢুকতে সাহায্য করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

এই পথে জার্মানিতে পৌঁছনোর চেষ্টা করছে এমন একটি দলকে অনুসরণ করে তাদের সাথে কথা বলেছে বিবিসি। তাদের অভিজ্ঞতার কাহিনী এখানে তুলে ধরা হল।

মোবাইল ফোনের ক্যামেরা বাম থেকে ডানে ঘুরে যাচ্ছে, কিন্তু কেউ নড়ছে না। পথ চলায় ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত মানুষগুলো গাছের ফাঁকে ফাঁকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে শুয়ে আছে।

জামিলের মাথাটা তার হাতের ওপর রাখা, স্ত্রী রোশিন তার পাশেই গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে। অন্যদের দেখে মনে হচ্ছে পড়ে থাকা লাশ।

জঙ্গলের ওপর ছড়িয়ে আছে শেষ বিকেলের আলো, পাইন গাছের ঘন বনকে মনে হয় প্রকৃতির তৈরি কয়েদখানা। এই মানুষগুলো ভোর ৪টা থেকে এক নাগাড়ে পথ হেঁটেছে।

'আমরা বিধ্বস্ত, পুরোপুরি বিধ্বস্ত,' বলছিলেন জামিলের চাচাত ভাই ইদ্রিস। তার কণ্ঠস্বর ভাবলেশহীন- অনেকটা যন্ত্রের মতো।

সিরিয় কয়েক বন্ধুর এই দলটি ঘন জঙ্গল আর দুর্গন্ধময় জলাভূমি পার হয়ে এখানে এসে পৌঁছেছে। পাচারকারীদের সাথে প্রথম মোলাকাতটা তারা কোনোক্রমে এড়াতে পেরেছে। কিন্তু খাবার ও পানি একেবারে শেষ।

ঠাণ্ডায় তাদের শরীর অবশ হয়ে গেছে, কিন্তু আগুন জ্বালার সাহস নেই। বেলারুস থেকে সীমান্ত পার হয়ে তারা পোল্যান্ডে পৌঁছেছে- অর্থাৎ শেষ পর্যন্ত ইইউ জোটভুক্ত দেশে ঢুকতে পেরেছে। কিন্তু তারপরও তারা নিরাপদ নয়। কারণ হাজার হাজার অভিবাসনপ্রত্যাশী, যাদের সীমান্ত পার হয়ে পোল্যান্ড, লিথুয়ানিয়া ও লাতভিয়ায় ঢুকতে উৎসাহিত করছে বেলারুস তাদের ঠাঁই হয়েছে বন্দি শিবিরে।

পোল্যান্ডের জঙ্গলে তীব্র শীতের কামড়ে শরীরের তাপমাত্রা বিপজ্জনক মাত্রায় নেমে গিয়ে মৃত্যু হয়েছে অন্তত সাতজনের।

নতুন পথের সন্ধান
ইদ্রিস ও তার বন্ধুরা সেপ্টেম্বরের শেষে উত্তর ইরাক ছাড়ার সময় থেকে আমরা ওদের যাত্রার ওপর নজর রেখেছি। তারা যেভাবে এগিয়েছে ইদ্রিস মোবাইলে তার প্রতিটা পর্যায়ের ভিডিও তুলে আমাদের কাছে পাঠিয়েছেন।

এই দলের সকলেই সিরিয়ান কুর্দি, বয়স বিশের কোঠায় এবং উন্নত ভবিষ্যতের আশায় তারা ইউরোপে পাড়ি জমিয়েছে। এদের সবার বাড়ি সিরিয়ার কোবানিতে, যেখানে ২০১৪-এর শেষ দিকে কুর্দি যোদ্ধাদের সাথে ইসলামিক স্টেটের তুমুল লড়াই চলে।

বিশ্বের সর্বত্রই অভিবাসনপ্রত্যাশীদের মতো তাদেরও দেশ ছাড়ার পেছনে যুক্তি ছিল একই ধরনের অর্থাৎ নিজের দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা, বেকারত্ব, সেনাবাহিনীতে বাধ্য হয়ে যোগ দেয়া। কিন্তু তাদের ক্ষেত্রে তফাৎ ছিল একটা- সেটা হলো নতুন এক পথ ধরে তাদের যাত্রা।

ইদ্রিস বলছিলেন, বেলারুসের স্বৈরশাসক আলেক্সান্ডার লুকাশেঙ্কো যদি এই নতুন এবং কার্যত একটা নিরাপদ পথের লোভ না দেখাতেন, তাহলে তিনি হয়ত সিরিয়া ছাড়ার কথা ভাবতেন না।

তিনি আমাকে বললেন, 'ইইউ-র সাথে বেলারুসের তো একটা দ্বন্দ্ব চলছে, তাই দেশটির প্রেসিডেন্ট ইইউ-র সাথে তাদের সীমান্ত খুলে দিয়েছেন।'

এ বছরের গোড়ার দিকে লুকাশেঙ্কো বলেছিলেন, তার দেশ থেকে ইইউ সদস্য দেশগুলোতে অভিবাসীদের যাওয়া বা মাদক চোরাচালান ঠেকাতে কোনো পদক্ষেপ তিনি নেবেন না। সেকথাই বলছিলেন ইদ্রিস।

বেলারুসে ২০২০ সালের বিতর্কিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচন এবং নির্বাচনের পর রাজনৈতিক বিরোধীদের ব্যাপক ধরপাকড়ের পর ইইউ দেশটির ওপর একের পর এক নিষেধাজ্ঞা জারি করায় বেলারুসের প্রেসিডেন্ট ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিলেন।

ভূমধ্যসাগরে নৌকা নিয়ে বিপজ্জনক পথে যাওয়ার বদলে অভিবাসীদের এখন বিমানপথে যেতে হবে বেলারুসে। এরপর কয়েক ঘণ্টা গাড়িতে করে সীমান্ত পর্যন্ত- তারপর সীমান্ত পার হয়ে পায়ে হেঁটে প্রতিবেশী দেশ পোল্যান্ড, লিথুয়ানিয়া ও লাতভিয়া- যেকোনো একটি ইইউ দেশে ঢুকে পড়া।

জুলাই আর অগাস্ট- মাত্র দুই মাসে লিথুয়ানিয়াতে যত আশ্রয়প্রার্থী ঢুকেছে তার হার পুরো ২০২০ সালের তুলনায় ৫০ গুণ বেশি।

'এই পথ তুরস্ক আর উত্তর আফ্রিকা দিয়ে ইউরোপে ঢোকার থেকে অনেক সহজ,' বলছেন ইদ্রিস।

তিনি এবং তার বন্ধুরা উত্তর ইরাকের ইরবিল থেকে যাত্রা শুরু করেছিলেন ২৫ সেপ্টেম্বর। ইদ্রিস সেখানে কাজ করতেন। স্ত্রী আর যমজ কন্যা সন্তানকে কোবানিতে রেখে এসেছেন- তাদের প্রতিশ্রুতি দিয়ে এসেছেন ইউরোপে সফলভাবে পৌঁছাতে পারলে একদিন তাদেরও সেখানে নিয়ে যাবেন।

অভিবাসনপ্রত্যাশীদের নতুন গন্তব্য ইরবিল কেন?
দশ বছর ধরে চলা গৃহযুদ্ধের ফলে সিরিয়ার তরুণ প্রজন্মের জীবন ব্যাপক অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। ইদ্রিস প্রতিবেশী তুরস্কেও শরণার্থী হিসাবে কিছু সময় কাটিয়েছেন।

'আমার জীবনের কাহিনিটা অনেক লম্বা। নানা সমস্যায় ভরা- তবে সবই আমার নিয়ন্ত্রণের বাইরে, সিরিয়ায় আমাদের কোন ভবিষ্যৎ নেই,' আমাকে বলছিলেন ইদ্রিস।

ইরবিল বিমানবন্দরের বাইরে ইদ্রিস প্রথম যে ভিডিওটি রেকর্ড করেছিলেন তাতে নতুন এই রুটে যাত্রার ব্যাপারে তাকে খুবই উদ্দীপ্ত দেখাচ্ছিল। টিকেট হাতে এসে গেছে, সাতদিনের পর্যটন ভিসা দিয়েছে বেলারুস, যাত্রার জন্য পুরো তৈরি তারা।

এ পর্যন্ত প্রক্রিয়াটা বেশ সহজই ছিল। কতটা সহজ জানতে আমরা গিয়েছিলাম উত্তর ইরাকে তাদের সাথে কথা বলতে।

ইরবিল ইরাকে স্বায়ত্তশাসিত কুর্দী এলাকার রাজধানী- জনসংখ্যা ১৫ লক্ষর বেশি- খুবই ব্যস্ত প্রাণোচ্ছ্বল শহর- প্রতিবেশী সিরিয়া আর ইরাকের অন্যান্য এলাকা থেকে আসা লাখ লাখ শরণার্থীর বাস এই ইরবিলে।

আর এই ইরবিল এখন হয়ে উঠেছে ইউরোপে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের নতুন পথে যাত্রা শুরুর মূল কেন্দ্র।

লোকের মুখে মুখে ছড়িয়ে গেছে এই খবর। ফেসবুক আর অনলাইনের নানা চ্যাট গ্রুপে খবর পাওয়া অভিবাসন প্রত্যাশীদের তাই গন্তব্য এখন - প্রথমে ইরবিল।

কতটা সহজ কাগজপত্র পাবার প্রক্রিয়া
মুরাদ (তার আসল নাম নয়) অফিসঘরে বসে ব্যাখ্যা করছিলেন তার কাজ কী। টেবিলের ওপর অনেকগুলো পাসপোর্ট- বেশিরভাগই সিরিয়দের। তিনি আমাকে বলছিলেন তার কাজ ভিসা যোগাড় করা এবং বেলারুসের রাজধানী মিনস্কে যাবার ফ্লাইটের বন্দোবস্ত করা। তিনি কোন বেআইনি কাজ করেন না। তারপরও নিজের আসল নাম প্রকাশ করতে চাননি।

ইইউ-র প্রতি লুকাশেঙ্কোর হুমকির খবর গ্রীষ্মের দিকে যখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে তখন মুরাদ বেলারুসে তার বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ করে নতুন ভিসার নিয়মকানুন সম্পর্কে খোঁজখবর নেন।

'ওরা জানায়- ভিসা পাওয়া অনেক সহজ হয়ে গেছে,' মুরাদ বলেন। '২০১৫ সালে তুরস্কের বেলাতেও একই ঘটনা ঘটেছিল।'

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রেজেপ তাইয়্যিপ এরদোগানও ২০১৫ সালে ইইউর সাথে বিবাদে জড়িয়েছিলেন। তিনিও তখন লাখ লাখ অভিবাসীকে তুরস্কের মধ্যে দিয়ে ইউরোপে ঢোকার পথ করে দিয়েছিলেন। এই ঢল চলেছিল যত দিন না ইইউ তুরস্ককে ৫০০ কোটি পাউন্ড সহায়তাদানের চুক্তি করে।

মিনস্ক হয়ে নিরাপদ রুটে ইউরোপে যারা যেতে চান, তাদের পাসপোর্টে একটা বৈধ ভিসার ছাপের প্রয়োজন হয়। এর জন্য সময় একটু বেশি লাগে বটে। কিন্তু প্রক্রিয়াটা আদৌ জটিল নয়। অবৈধ ট্রাভেল এজেন্টরা যাতে ভুয়া ভিসার কারবার করতে না পারে, সেজন্যই এই ব্যবস্থা।

এরপর রয়েছে পাচার ব্যবসার দালালরা। যাদের প্রচুর অর্থ দিতে হয়।

মুরাদ বললেন, দালালদের সাথে তার কোন দেনদরবার বা যোগাযোগ নেই। তিনি অভিবাসীদের পরামর্শ দেন মিনস্কে পৌঁছে এধরনের দালাল খুঁজে নিতে। তাতে খরচ পড়বে কম এবং সঠিক লোককে ধরা যাবে। কিন্তু তার অফিস থেকে বেরিয়ে সামনের রাস্তায় দেখলাম একজন দালালগোছের ঘোরাঘুরি করছেন। মুরাদকে তিনি ভালভাবেই চেনেন বোঝা গেল।

জানা গেল ওই ব্যক্তি- জুয়ান (তারও আসল নাম নয়) বহুদিন মানবপাচার ব্যবসার সাথে জড়িত। ২০১৫ সালের অভিবাসন সঙ্কটের সময় তুরস্ক এবং গ্রিসে বহু মানুষ পাচার করার কাজ করেছেন তিনি।

জুয়ান অবশ্য নিজে একাজ করেন সেটা স্বীকার করলেন না। তবে বললেন, "আপনি যদি দালাল ধরেন, তার খরচ অনেক- ৯ থেকে ১২ হাজার ডলার। দেখুন যাত্রাপথে অনেক অনিশ্চয়তা থাকে তো!

'ধরুন আপনাকে যেতে হবে বিদেশে অচেনা সব বনজঙ্গলের পথ ধরে, আপনার টাকাকড়ি ছিনিয়ে নেবার জন্য ডাকাতরা ওঁৎ পেতে আছে। এরপর আছে মাফিয়াদের শ্যেন দৃষ্টি। বন্য জন্তুর ভয় আছে, আছে নদী আর জলাভূমির মধ্যে দিয়ে দুর্গম ও ঝুঁকিপূর্ণ পথ চলা। অজানা অচেনা পথে নানা ধরনের বিপদের ভয় থাকে। জিপিএস থাকলেও এসব বিপদ তো থাকবেই।'

বেলারুসে যারা দালালের কাজ করে তাদের ভূমিকা এই অভিবাসীদের গন্তব্যে পৌঁছতে সাহায্য করা, জুয়ান বললেন।

মিনস্কে অভিবাসন প্রত্যাশীদের ঢল
ইদ্রিস ও তার বন্ধুরা বেলারুসের রাজধানী মিনস্কে পৌঁছে দেখেছিলেন, সেখানে অভিবাসন প্রত্যাশীর ব্যাপক ভিড়- সবাই একই পথে ইউরোপ চলেছে। ইদ্রিস মিনস্ক বিমানবন্দর থেকে যে ভিডিও ফুটেজ আমাদের পাঠিয়েছিলেন, তাতে দেখেছিলাম বিমানবন্দরের আগমন হল ভিড়ে ঠাসা- লোকে এমনকি মাটিতে বসে আছে, তাদের কাগজপত্র যাচাই বাছাই করার জন্য ডাকের অপেক্ষায়।

অগাস্ট মাসে ইরাকি এয়ারওয়েজ ইইউ-র চাপের কাছে নতি স্বীকার করে বাগদাদ থেকে মিনস্ক সরাসরি ফ্লাইট বাতিল করতে বাধ্য হয়।

কিন্তু অভিবাসীর ঢল তাতে থামেনি। তারা ইস্তাম্বুল, দুবাই আর দামেস্ক থেকে ফ্লাইট নিয়ে মিনস্ক যাওয়া অব্যাহত রেখেছে।

ইদ্রিস আর তার বন্ধুদের জন্য মিনস্কের স্পুটনিক হোটেলে থাকার বন্দোবস্ত করা ছিল।

সবাই ততটা ভাগ্যবান হয় না। সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করা ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে অনেক অভিবাসী কাছাকাছি পুলের নিচে বা রাস্তার সুড়ঙ্গ পথে স্লিপিং ব্যাগে রাত কাটাচ্ছে।

আমি ইদ্রিসকে ফোন করতে সে বলল, মিনস্কে তারা পাচারকারীদের সাথে যোগাযোগ করেছে, যারা সীমান্ত পার করে তাদের পোল্যান্ডে পৌঁছে দেবে, তারপর সেখান থেকে জার্মানি। খুব শিগগিরই তারা রওনা দেবে। তবে পথে অনেক চ্যালেঞ্জ আছে - ইদ্রিস জানাল।

'আমরা তো অবৈধভাবে সীমান্ত পার হব- জানি না কী হবে! কাউকে বিশ্বাস করা যায় না, এমনকি আমাদের পাচারকারীকেও না। আল্লাহর হাতে ভাগ্য সঁপে দিচ্ছি।'

ইরবিল থেকে বেলারুস যেতে ইতোমধ্যেই খরচ হয়ে গেছে ৫ হাজার ডলার, একেক জনের। প্লেনের ভাড়া, হোটেল খরচ আর পর্যটন ভিসা। ইদ্রিস জানাল পাচারকারীকে কত দিতে হবে তা নিয়ে তারা তখনও দর কষাকষি করছে।

এর পরের পর্বটা ওদের জন্য খুব সহজ ছিল না। ইদ্রিসদের দলটা মিনস্ক ছাড়ার পর পাচারকারীকে সময়মত ধরতে পারেনি। ফলে সীমান্তের কাছে একটা হোটেলে থাকতে হয়। মিনস্ক থেকে জন প্রতি ৪০০ ডলার গাড়ি ভাড়া দিয়ে সীমান্তে পৌঁছেছিল, তার ওপর বাড়তি হোটেল খরচ আর একরাশ অনিশ্চয়তা।

'শেষ পর্যন্ত আমরা পৌঁছতে পারব কিনা কে জানে। নাকি জঙ্গলেই পড়ে থাকতে হবে? আমাদের জন্য দোয়া করবেন।' সেখানে থেকে পাঠানো শেষ ভিডিওতে জানিয়েছিল ইদ্রিস।

'আমি মুক্তি চাই'
বেলারুসের উত্তর পশ্চিম সীমান্তে লিথুয়ানিয়াতে ইদ্রিসের মত কয়েক হাজার অভিবাসনপ্রত্যাশীর সব স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। অগাস্ট মাস নাগাদ চার হাজারের বেশি অভিবাসী মূলত অরক্ষিত সীমান্ত পার হয়ে ঢুকেছিল।

জনাকয়েক সেখান থেকে পশ্চিম ইউরোপে পাড়ি জমাতে পারে, কিন্তু বেশিরভাগই ধরা পড়ে যায়। এরা এখন বন্দি শিবিরে দিন কাটাচ্ছে। লিথুয়ানিয়া কর্তৃপক্ষ তাদের নিয়ে কী করা হবে এখনো সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়নি।

এদের মধ্যে কয়েকজন আশ্রয়প্রার্থীর আবেদন অনুমোদন পেয়েছে, কিন্তু তাদের মধ্যে কোনো সিরীয় বা ইরাকি নেই।

পশ্চিমে কিবারতাই এলাকাতেও ৬৭০ জনের বেশি অভিবাসীকে অস্থায়ী একটা কারাগারে রাখা হয়েছে।

আমরা সেখানে পৌঁছে দেখেছি, উঁচু উঁচু দেয়াল আর কাঁটাতারের বেড়া চারপাশে, পর্যবেক্ষণ চৌকি, খুবই নিদারুণ একটা পরিবেশ। ভেতর থেকে বহু মানুষের চিৎকার শোনা যায় 'আমি মুক্তি চাই।'

বন্দিরা সবাই একাকী পুরুষ। তারা এসেছে ২০টি বিভিন্ন দেশ থেকে। ইরাকি আর সিরিয় তো আছেই, এমনকি সেখানে বন্দি আছে ইয়েমেন, সিয়েরা লিওন ও শ্রীলংকার মানুষও।

ইরাক থেকে আসা আব্বাস বললেন, সেখানকার অবস্থা ভয়াবহ। অভিবাসীদের সেখানে অপরাধী হিসাবে দেখা হয়, আচরণও করা হয় সেইভাবে।

'বেলারুস ইউরোপে যাবার জন্য সীমান্ত খুলে দিয়েছে, সেটা কি আমাদের দোষ?' তার প্রশ্ন।

অবশ্য বেশিদিন বন্দি থাকতে হয়নি আব্বাসকে। যদিও ১১ হাজার ডলার খরচ করার পরিণতি যে এমনটা হবে আব্বাস স্বপ্নেও ভাবেননি। আব্বাস ফেরত চলে যেতে চান।

'কিন্তু আমি ইরাকে থাকব না। আমি তুরস্কে থাকব। অবশ্য ভাগ্যে কী আছে কে জানে। আর পকেটও আমার পুরো খালি।'

শিবিরের বন্দিরা এটা স্বীকার করছেন যে বেলারুস আর ইইউ-র মধ্যে ভূরাজনৈতিক একটা দ্বন্দ্বে তারা হয়ে গেছেন দাবার ঘুঁটি, তবে মি. লুকাশেঙ্কো যে তাদের দেশ থেকে বেরনোর একটা সুযোগ তৈরি করে দিয়েছেন তার জন্য তার কাছে তারা কৃতজ্ঞ।

'ছাড়া পেলে আমার হাতে লুকাশেঙ্কোর নামটা উল্কি করে এঁকে রাখব,' আমাকে বললেন আরেকজন ইরাকি, আজ্জাল।

অভিবাসীদের ঢলে রাশ টেনেছে লিথুয়ানিয়া- সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করেছে। কিন্তু সীমান্তরক্ষীরা আমাদের দেখালেন সীমান্তের অনেকগুলো জায়গা যেখানে পাহারার কোনো বালাই নেই, জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে দিব্যি অন্যপাশে চলে যাওয়া যায়।

প্রতিদিনই বেলারুস থেকে কয়েক ডজন অভিবাসী সীমান্ত পেরিয়ে লিথুয়ানিয়ায় ঢোকার চেষ্টা করে। তবে বেশিরভাগেরই গন্তব্য এখন পোল্যান্ড।

বেলারুসের সৈন্যরা যেভাবে সাহায্য করল
ইদ্রিস ও তার দলের দ্বিতীয় দফা পোল্যান্ডে ঢোকার চেষ্টাও ব্যর্থ হল।

ইদ্রিসের ফোনে রেকর্ড করা ভিডিওতে দেখলাম, রাস্তার ধারে উত্তেজনাপূর্ণ বচসা চলছে- রুশ, ইংরেজি আর আরবী ভাষায়। জানলাম বেলারুসের পুলিশ দলটিকে আটকেছে, তাদের পাসপোর্ট নিয়ে নিয়েছে এবং গাড়ির চালককে বলেছে তাদের মিনস্কে ফেরত নিয়ে যেতে।

তারা আবার ফিরে গেছে স্পুটনিক হোটেলে। সেখানে গিয়ে গাড়ির চালক তাদের কাছে অর্থ দাবি করেছে। বলেছে, পুলিশের কাছ থেকে পাসপোর্ট ছাড়িয়ে আনতে খরচ লাগবে।

হোটেলে গিয়ে ইদ্রিস ও তার বন্ধুরা দেখল পাচারকারীদের একটা বিশাল চক্র সেখানে কাজ করছে। থাকার বন্দোবস্ত, গাড়ি ভাড়া, যাতায়াত - সব কিছু থেকে অর্থ লোটার কারবার চলছে। আর হোটেল ভর্তি নতুন নতুন মানুষ- যারা এসেছে সিরিয়া, ইরাক আর ইয়েমেন থেকে।

'প্রত্যেক দিন হোটেলে মানুষের সংখ্যা বাড়ছে,' ইদ্রিস জানিয়েছে নতুন ভিডিও শটে।

অবশেষে মিনস্কে পৌঁছনর ১১ দিন পরে তারা তৃতীয় বারের চেষ্টায় পোল্যান্ডে ঢুকতে পেরেছে বলে ইদ্রিস জানিয়েছে- রাত বারোটার পরে।

তবে, এটা সম্ভব হয়েছে বেলারুসের সৈন্যদের কারণে, জানিয়েছেন ইদ্রিস।

তারা যখন সীমান্তের কাছে অপেক্ষা করছিল, তখন কিছু সৈন্য তাদের অপেক্ষা করতে বলে, তার মিনিট কয়েক পর একটা সাঁজোয়া গাড়ি তাদের তুলে নিয়ে যায়। সেখান থেকে তাদের তুলে দেয় সেনাবাহিনীর একটা ট্রাকে। ওই ট্রাকে গাদাগাদি করে ছিল আরও জনা পঞ্চাশেক অভিবাসী।

'ট্রাকটা অল্প দূর যাবার পর একজন সৈন্য আমাদের অপেক্ষা করতে বলল, সে দেখতে গেল পোল্যান্ডে ঢোকার সীমান্ত খোলা আছে কিনা,' ইদ্রিস জানালেন।

ওই সৈন্যটি ইদ্রিসদের পুরো দলটিকে ২০০মিটার পর্যন্ত পাহারা দিয়ে নিয়ে যায় এবং পোল্যান্ডে ঢোকার পথ দেখিয়ে দেয় বলে ইদ্রিস জানান। এমনকি সৈন্যটি তাদের সীমান্ত পেরতেও সাহায্য করেছিল।

'আমার ধারণা সে কাঁটাতারের বেড়া আমাদের জন্য কেটে দিয়েছিল।'

এরপর শুরু হয় ওদের জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে পথ চলা।

পরের দুদিন ইদ্রিসের তোলা ভিডিওতে দেখা গেছে ঘন জঙ্গল আর জলাভূমির মধ্যে দিয়ে তাদের কঠিন পথ চলা কীভাবে তাদের পরিশ্রান্ত ও অবসন্ন করে ফেলেছে।

অবশেষে, ৯ অক্টোবর তারা পৌঁছেছে পোল্যান্ডের একটি শহরে যেখানে তাদের জন্য অপেক্ষায় ছিল একটি গাড়ি। ওই গাড়ি পরদিন ভোরে তাদের পৌঁছে দিয়েছে জার্মানিতে।

সেখান থেকে দলের কেউ গেছে জার্মানির ফ্র্যাংকফুর্টে, কেউ ডেনমার্কে। ইদ্রিস গেছে নেদারল্যান্ডসে। তার সেখানে থাকার আবেদন যদি শেষ পর্যন্ত সফল হয়, তাহলে কোবানি থেকে স্ত্রী আর যমজ কন্যাদের সেখানে নিয়ে যাবে ইদ্রিস।

তবে ইদ্রিস জানে, গোটা প্রক্রিয়াটা সময়সাপেক্ষ।

বেলারুস অভিবাসন প্রত্যাশীদের তার দেশে গিয়ে সেখান থেকে আইনত ইইউ-তে ঢুকতে উৎসাহ দিচ্ছে এমন অভিযোগ দেশটি অস্বীকার করেছে। বেলারুস কর্তৃপক্ষ বলছে অভিবাসন ও সীমান্ত পরিস্থিতির জন্য দায়ী পশ্চিমা রাজনীতিকরা।

বাল্টিকদেশ, পোল্যান্ড আর জার্মানির বন্দি শিবিরে এই মুহূর্তে আটক রয়েছে অন্তত ১০ হাজার অভিবাসনপ্রত্যাশী। এদের অনেকের জন্যই গোটা অভিজ্ঞতাটা ছিল ভয়ঙ্কর। অনেকেই ভাগ্য ফেরানোর এই জুয়ায় হারিয়েছেন অর্থ, অপচয় করেছেন সময়, আর কেউ কেউ জীবন বলিও দিয়েছেন।
সূত্র : বিবিসি



আরো সংবাদ