১৩ জুন ২০২১
`

হলিউড ছবি কি চীনে বাজার হারাচ্ছে

-

যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চীনের প্রতিযোগিতা নতুন নয়। বিশ্ব অর্থনীতির শীর্ষ এই দুই দেশ বরাবরই একে অপরকে ছাড়িয়ে যাওয়ার কৌশল খোঁজে। তারই অংশ হিসেবে চীনের বিপর্যস্ত সিনেমার বাজার ফেরাতে দেশটির কর্তৃপক্ষ হলিউড ছবির প্রদর্শনে কড়াকড়ি আরোপ করেছে। এতেই প্রশ্ন উঠেছে চীনে কি হলিউড ছবির বাজার নষ্ট হচ্ছে?
ঘটনার সূত্রপাত আগামী ১ জুলাই চীনের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপনকে কেন্দ্র করে। মূল আয়োজনের অংশ হিসেবে দেশটির চলচ্চিত্র শিল্পকে প্রচার-প্রপাগান্ডার জন্য ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছে বেইজিংয়ের নীতিনির্ধারণী কর্তৃপক্ষ। চীনা চলচ্চিত্রপ্রেমীরা এতে সন্তুষ্ট নন। তারা আশঙ্কা করছেন, এর মাধ্যমে তাদের চাহিদার হলিউডি কিছু সিনেমা বাজার থেকে সরিয়ে নেয়া হবে। চীনে নতুন মুক্তি পেতে যাওয়া হলিউডের জনপ্রিয় ‘দ্য লর্ড অব দ্য রিংস’ সিনেমা ত্রয়ীর প্রদর্শন দেশটির প্রধান প্রধান প্রদর্শনী হলগুলোতে গত মাসে হঠাৎ বন্ধ করে দেয়া হলে চীনা দর্শকরা প্রতিবাদ জানান। এপ্রিলের শুরুতেই জে, আর, আর টোলকিনের একই নামের ফ্যান্টাসি সিরিজ অবলম্বনে নির্মিত সিনেমাগুলোর প্রচার বন্ধ করে দেয়া হলে সবাই বিস্মিত হন। সিনেমাগুলোর পরিবেশক ওয়ার্নার ব্রাদারসও এই বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। তারা চীনের সিনেমা হলগুলোতে ফেরার জন্য সপ্তাহের পর সপ্তাহ প্রচারণা ও বিজ্ঞাপন করছে। মার্চে প্রকাশিত প্রচারণাপত্র অনুযায়ী ‘দ্য ফেলোশিপ অব দ্য রিং’, ‘দ্য টু টাওয়ারস’ ও ‘দ্য রিটার্ন অব দ্য কিং’Ñ লর্ড অব দ্য রিংস সিরিজের এই তিন সিনেমা গত ৯ , ১৬ ও ২৩ এপ্রিল পরপর মুক্তি পাওয়ার কথা ছিল। সিনেমাভক্তরা আগ্রহের সাথেই এই সিনেমাগুলো মুক্তির প্রতীক্ষা করছিলেন। সিনেমা তিনটি বক্স অফিসে অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে সাহায্য করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছিল। এর মাত্র কিছু দিন আগে চীনে মুক্তি পাওয়া জেমস ক্যামেরনের ‘আভাটার’ বিপুল দর্শকপ্রিয়তা লাভ করে।
বিশ্বের বৃহত্তম দর্শক বাজার তৈরি
দশকের পর দশক চীন তার সিনেমা বাজার ধরে রাখতে হলিউডের দর্শক প্রিয় সিনেমার ওপর নির্ভরশীল রয়েছে। ১৯৯৪ সালে প্রথম হ্যারিসন ফোর্ডের অ্যাকশন থ্রিলার ‘দ্য ফিগুটিভ’ সিনেমা হলগুলোতে প্রদর্শনের জন্য চীন আমদানি করে। ওই সময় চীনের চলচ্চিত্র শিল্প সঙ্কটের মধ্যে ছিল। ১৯৯০ থেকে ১৯৯৩ সালের মধ্যে দেশীয় নির্মিত সিনেমা থেকে চীনা দর্শকদের মুখ ফিরিয়ে নেয়ার কারণে টিকিট বিক্রি ৪০ ভাগের নিচে নেমে আসে বলে জানান চীনা গবেষক লিও ফান। চীনা গবেষণা প্রতিষ্ঠান চাইনিজ ন্যাশনাল একাডেমি অব আর্টসের এই সহযোগী গবেষক ২০১২ সালে তার এক গবেষণাপত্রে এই তথ্য জানান।
‘পার্টিকে ভালোবাসা’
চীনের বক্স অফিসের শক্তি ও প্রভাব চীনা নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টির আড়ালে নেই। এই বছর চীনের কমিউনিস্ট পার্টির শতবর্ষ উপলক্ষে মার্চের শেষে বেইজিং সিনেমা হলগুলোর ওপর ২০২১ সালের শেষ পর্যন্ত সপ্তাহে দুটি সিনেমা প্রদর্শনের নির্দেশ জারি করেছে যাতে পার্টির প্রচারণা করা হয়। কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠার ১০০ বছর পূর্তিতে প্রচারিত এই সিনেমাগুলোতে ‘পার্টি, দেশ ও সমাজতন্ত্রের প্রতি ভালোবাসা’ প্রচার করা হবে। এই সাথে এতে ‘চীনা কমিউনিস্ট পার্টি, মাতৃভূমি, জনগণ ও তাদের বীরদের প্রশংসা’ করা হবে। গত মাসের শুরুতেই অপর এক বিবৃতিতে চীনের ফিল্ম অ্যাডমিনিস্ট্রেশন এই লক্ষ্যের ব্যাখ্যা করে।
হলিউডের প্রয়োজনীয়তা
সামগ্রিকভাবে চীনের বক্স অফিসের অবস্থা এই বছর দুর্বল। চীনা নববর্ষ ও শ্রমিক দিবসের ছুটি উপলক্ষে বিপুল সাফল্য সত্ত্বেও গতকাল শুক্রবার সকাল পর্যন্ত চলতি বছর চীনে সিনেমার টিকিট বিক্রি হয়েছে মাত্র ২ হাজার ২৪০ কোটি চীনা ইউয়ান (বাংলাদেশী ২৯ হাজার ৩৯৬ কোটি টাকা)। ২০১৭ সালের পর গত বছর ছাড়া এটিই সবচেয়ে গুরুতর অবস্থা বলে জানায় চীনের সম্প্রচার নিয়ন্ত্রণ সংস্থা ন্যাশনাল রেডিও অ্যান্ড টেলিভিশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এনআরটিএ)। করোনা সংক্রমণের কারণে গত বছর প্রায় হলই লকডাউনের আওতায় বন্ধ ছিল। এই বছর এপ্রিলেই বক্স অফিসে বিক্রির পরিমাণ ২৫০ কোটি ইউয়ান (৩ হাজার ২৮০ কোটি টাকা), যা ২০১৪ সালের পর গত বছর ছাড়া সবচেয়ে কম সিনেমার টিকিট বিক্রি হওয়া এপ্রিল মাস। লন্ডনের সোয়াস ইউনিভার্সিটির মডার্ন চাইনিজ কালচারের লেকচারার শিয়াওনিঙ লু বলেন, ১ জুলাই কমিউনিস্ট পার্টির শতবর্ষ পূর্তিতে প্রচারণা-প্রপাগান্ডামূলক সিনেমা প্রদর্শনে ‘প্রতীকী গুরুত্ব’ রয়েছে।
সিএনএন অবলম্বনে



আরো সংবাদ