০৪ মার্চ ২০২১
`

প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে পুরস্কার না নেয়ার আক্ষেপ

-

চলচ্চিত্রাঙ্গনে কাজের সর্বোচ্চ স্বীকৃতি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। সব শিল্পী-কলাকুশলীর কাছে এই প্রাপ্তি স্বপ্নের মতো। সেরা কাজ দর্শক মনে ঠাঁই নেয়ার পর রাষ্ট্রীয়ভাবে মূল্যায়িত হলে আনন্দের সীমা থাকে না। অন্তত বুধবার ‘জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার-২০১৯’ গ্রহণের পর প্রবীণ থেকে নবীন শিল্পীদের অনুভূতি দেখে সেটাই মনে হয়েছে। তবে সবার কণ্ঠেই ছিল বিষাদের সুর। আজীবন সম্মাননাপ্রাপ্ত সোহেল রানা থেকে শুরু করে সবচেয়ে কম বয়সে সেরা অভিনেত্রী হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার গ্রহণ করা সুনেরাহ বিনতে কামাল বলেছেন, এই পুরস্কার সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে নিতে পারলে আরো বেশি ভালো লাগত। প্রায় প্রত্যেকেই বলেছেন, জীবনে এমন মুহূর্ত চাইলেই তৈরি করা যায় না। এখানে যদি প্রধানমন্ত্রী সরাসরি উপস্থিত থেকে পুরস্কার দিতেন তবে আমাদের এই প্রাপ্তি আরো বেশি রঙিন হতো।
করোনাভাইরাস সতর্কতার অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সে অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন। তিনি নিজেও সরাসরি অনুষ্ঠানে না থাকতে পেরে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। বলেছেন, ‘আমি উপস্থিত থেকে এই পুস্কার দিতে চেয়েছিলাম, কিন্তু করোনাভাইরাসের কারণে একরকম বন্দী জীবনযাপন করছি। ভার্চুয়ালি যোগদান করেছি। ডিজিটাল বাংলাদেশ হওয়ার কারণেই এটা সম্ভব হয়েছে। আমার দুঃখ থেকে গেল যে, নিজে উপস্থিত থেকে পুরস্কার দিতে পারলাম না। আমরা আশা করি দ্রুত করোনার হাত থেকে দেশ মুক্তি পাবে, আমরা আবারো এক হতে পারব।’ গত বুধবার সকাল সাড়ে ১০টায় রাজধানীর আগারগাঁও বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পরই শুরু হয় পুরস্কার দেয়ার পর্ব। এরপর সাদিয়া ইসলাম মৌয়ের ৭ মিনিটের একটি নৃত্যানুষ্ঠান দিয়ে শুরু হয় অনুষ্ঠানের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। দুপুরে অনুষ্ঠান শেষ হয়েছে ওয়ার্দা রিহাবের পরিবেশনার মাধ্যমে। মাঝখানে চলচ্চিত্রের একাধিক গানের সাথে নৃত্যে অংশ নিয়েছেন ফেরদৌস, অপু বিশ্বাস, মাহিয়া মাহি, সাইমন ও নুসরাত ফারিয়া। গান গেয়েছেন অলোক সেন, অপু আমান, লিজা ও লুইপা। ২ ঘণ্টার এ আয়োজন উপস্থাপনা করেছেন অভিনেত্রী আশনা হাবিব ভাবনা ও অভিনেতা আনিসুর রহমান মিলন।’
এবার চলচ্চিত্রে বিশেষ অবদানের জন্য যুগ্মভাবে আজীবন সম্মাননা পেয়েছেন বিশিষ্ট চলচ্চিত্র অভিনেতা মাসুদ পারভেজ (সোহেল রানা) ও অভিনেত্রী কোহিনূর আক্তার সুচন্দা।
পুরস্কার গ্রহণের পর অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে সোহেল রানা বলেন, ‘জীবনের প্রথম পুরস্কার নিয়েছিলাম আজকের প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে। আজো ভেবেছিলাম প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে পুরস্কারটি নেবো, যে কারণে ছয় মাস পরে বাসার বাইরে বের হয়েছি। এসে শুনলাম ওনার হাত থেকে পুরস্কার নিতে পারছি না, তবুও উনি আমার সামনে আছেন, ওনাকে সালাম জানাচ্ছি।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমি যখন জানতে পারলাম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে আমাকে আজীবন সম্মাননা দেয়া হচ্ছে, তখন আমার মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া হলো। হৃদয়ের মাঝখানে আমার মনে হলো একটা দুঃখবোধ চলে এলো। কিন্তু আমি বুঝে উঠতে পারলাম না সেই দুঃখবোধটা কেন! চলচ্চিত্র জগতে আমি ৪৬ বছর ধরে কাজ করছি, এ সময়ে এসে চলচ্চিত্র জগতে আমার যতটুকু পাওনা ছিল, আজ বোধ হয় তার ইতি হয়ে গেল। সে কারণেই হয়তো দুঃখবোধটা। সম্মাননাটি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি উৎসর্গ করে এই কিংবদন্তি অভিনেতা বলেন, ‘৪৯ বছর আগে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সিনেমা ও মুক্তিযুদ্ধের প্রথম সিনেমা ‘ওরা ১১ জন’ আমি প্রডিউস করেছিলাম। হয়তো বঙ্গবন্ধু আমাকে স্নেহ করতেন, তাই তিনি সিনেমাটি দেখেছিলেন। সে সময় যখন আমি ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে যাই, তখন বঙ্গবন্ধু আমাকে বলেন, ‘ভালোই তো বানাইছস, এখানে থেকে যা।’ আমি সেই গুরুবাক্যকে চিরধার্য মনে করে চলচ্চিত্র জগতেই রয়ে গেলাম। এরপর দ্বিতীয় সিনেমা করলাম মাসুদ রানা এবং এরপর থেকে আমার ইতিহাস।’
তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু যদি সে দিন না বলতেন, তুই চলচ্চিত্রে থেকে যা, আজকে সারা বাংলাদেশসহ পৃথিবীর মানুষ আমাকে চিনতেন না। তাই আজকের এই দিনে আমি যে পুরস্কারটি পেয়েছি, তা আমার রাজনৈতিক গুরু, বঙ্গবন্ধুর স্মৃতির প্রতি সম্মান জানিয়ে তার পায়ের কাছে সম্মাননাটি উৎসর্গ করলাম।’
শারীরিক অসুস্থার কারণে পুরস্কার নিতে সরাসরি উপস্থিত থাকতে পারেননি অভিনেত্রী কোহিনূর আক্তার সুচন্দা। তার পক্ষে পুরস্কার গ্রহণ করেছেন তার মেয়ে। মোবাইলে সুচন্দা পুরস্কার প্রাপ্তির অনুভূতিতে বলেন, ‘ শারীরিক অসুস্থতার কারণে আমি অনুষ্ঠানে যেতে পারিনি। তবে রাষ্ট্র আমাকে মূল্যায়ন করায় ভালো লাগছে। এই ভালোলাগা আরো বেশি সুন্দর হতো যদি সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে পুরস্কার গ্রহণ করতে পারতাম।’
‘ন-ডরাই’ সিনেমায় অভিনয়ের জন্য এবার শেষ্ঠ অভিনেত্রীর পুরস্কার পেয়েছেন সুনেরাহ বিনতে কামাল। তথ্যমন্ত্রী হাসান মাসুদের হাত থেকে পুরস্কার গ্রহণের পর তিনি বলেছেন, ‘আমি একটি ফ্যাশন হাউজে কাজের পাশাপাশি অভিনয় করি। প্রথম ছবিতেই জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাওয়ার খবর আমাকে আরো দায়িত্বশীল করে দিলো। আজ যদি পুরস্কারটা প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে নিতে পারতাম তবে আরো ভালো লাগত। কারণ, আমাদের মতো মানুষের জীবনে এমন সুযোগ দ্বিতীয়টা আসা কঠিন। আজকের এই মুহূর্তটা আজীবন আমার সঙ্গী হয়ে থাকবে। দোয়া করি পৃথিবী যেন খুব দ্রুত করোনামুক্ত হয়। সবাই যেন আগের মতো কাজ করতে পারে, একসাথে দাঁড়িয়ে প্রাণ খুলে হাসতে পারে।’

ভেবেছিলাম প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে পুরস্কারটি নেবো, যে কারণে ছয় মাস পরে বাসার বাইরে বের হয়েছি। এসে শুনলাম ওনার হাত থেকে পুরস্কার নিতে পারছি না। : Ñমাসুদ পারভেজ, চলচ্চিত্র অভিনেতা

শারীরিক অসুস্থতার কারণে আমি অনুষ্ঠানে যেতে পারিনি। তবে রাষ্ট্র আমাকে মূল্যায়ন করায় ভালো লাগছে। এই ভালোলাগা আরো বেশি সুন্দর হতো যদি সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে পুরস্কার গ্রহণ করতে পারতাম। : কোহিনূর আক্তার সুচন্দা, অভিনেত্রী

আজ যদি পুরস্কারটা প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে নিতে পারতাম তবে আরো ভালো লাগত। কারণ, আমাদের মতো মানুষের জীবনে এমন সুযোগ দ্বিতীয়টা আসা কঠিন। : সুনেরাহ বিনতে কামাল, অভিনেত্রী



আরো সংবাদ