০৪ এপ্রিল ২০২০

যুগে যুগে সিনেমার জন্য লড়াই

-

শুধু বিনোদনের জন্য সিনেমা নয়। সমাজের অসঙ্গতি উপস্থাপনের সবচেয়ে সহজ মাধ্যম বলা যায় সিনেমাকে। কিন্তু অসঙ্গতির গল্প যদি শাসকদের বিপক্ষে যায় তবে বাধার দেয়াল টেনে দেন তারা। এ জন্যই যুগে যুগে নির্মাতারা সিনেমার জন্য লড়াই করেছেন। সুদান থেকে ইরান কিংবা সৌদি আরব, ভেনিজুয়েলার পরিচালকরা সেই লড়াই অব্যাহত রেখেছেন নিয়মিত ভাবে।
সুদানের বিকাশমান চলচ্চিত্র শিল্প ১৯৮৯ সালে বার্লিন দেয়ালের মতো ভেঙে পড়ে। সে বছরের ১ জুলাই ক্যুর মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেন ওমর আল-বশির। ক্ষমতায় বসেই তিনি কঠোর ও রক্ষণশীল শাসন চালু করেন। ২০১৯ সালে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগ পর্যন্ত তার শাসনে সুদানের সিনেমা শিল্প বিশেষভাবে ভুগেছে। বশিরের শাসনামলে সরকারি সিনেমা হলগুলো বিক্রি করে দেয়া হয়। সিনেমা নির্মাণ কিংবা প্রযোজনা হয়ে যায় অলাভজনক কাজ। একদিকে ছিল সেন্সর আইনের রক্তচক্ষু, অন্যদিকে উচ্চ হারের কর। সুদানি পরিচালকরা গ্রেফতার হয়েছেন, কারাবরণ নির্যাতন সয়েছেন। অনেক পরিচালককেই দেশ ছাড়তে হয়। এককথায় সুদানের সিনেমা শিল্প মরে যায়। তবে সত্যিই কি সে মৃত ছিল?
সুদানের প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা শোয়েব গাসমেলবারি তার টকিং অ্যাবাউট ট্রিজ প্রামাণ্যচিত্রে তুলে এনেছেন সুদানের চলচ্চিত্রের এ ইতিহাস। ছবি বানানো যখন অসম্ভব হয়ে যায়, তখন দেশটির চিত্রপরিচালক ইব্রাহিম শাদ্দাদ, সুলেমান মোহামেদ ইব্রাহিম, আলতায়েব মাহদি ও মানার আল-হিলো হানা মিলে প্রতিষ্ঠা করেন সুদানিজ ফিল্ম গ্রুপ (এসএফজি)। সিনেমা নির্মাণ সম্ভব হচ্ছিল না বলে গ্রুপটি ছবি প্রদর্শনের উদ্দেশ্য নিয়ে গঠিত হয়েছিল। সেটা ১৯৮৯ সালের কথা। তারা প্রয়োজনে দেয়ালকে পর্দা হিসেবে ব্যবহার করেও ছবি প্রদর্শন করত। সেসময় সুদানে যেসব ছবি প্রদর্শন নিষিদ্ধ ছিল, যেমন হলিউড-বলিউডের ছবি, তারা প্রদর্শন করত।
২০১৮ সালে সুদানে সিনেমা হল চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়। সাথে প্রথম কোন ছবিটি প্রদর্শন করা হবে, সে বিষয়ে জরিপও করা হয়। ভোটাভুটিতে প্রদর্শনের জন্য সবচেয়ে বেশি ভোট পায় টারান্টিনোর জ্যাঙ্গো আনচেইনড। কিন্তু হলে লাইট জ্বলার আগে বাধা হয়ে দাঁড়ায় আমলাতন্ত্র ও আর্থিক সংকট।
সুদানের প্রবীণ এ চার নির্মাতা ইব্রাহিম শাদ্দাদ, সুলেমান মোহামেদ ইব্রাহিম, আলতায়েব মাহদি ও মানার আল-হিলো হানার মধ্যে দারুণ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। তারা সুদানে বেশ কয়েকটি আলোচিত রাজনৈতিক ছবি নির্মাণ করেছেন। সোভিয়েত মন্তাজ ও ফরাসি নিউ ওয়েভ ছিল তাদের প্রেরণা। এসএফজির নেতা ইব্রাহিম ১৯৭৩-৭৯ সময়কালে মস্কোর ইনস্টিটিউট অব সিনেমাটোগ্রাফিতে পড়াশোনা করেছেন। সে সময় এ প্রতিষ্ঠান ছিল আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের নির্মাতাদের আঁতুড়ঘর। বশিরের শাসনামলে চলচ্চিত্র নির্মাণে রাষ্ট্রের সব ধরনের সহযোগিতা বন্ধ করে দেয়া হয়। ১৯৯৫ সালে সুদানিজ ফিল্ম কমিশন বন্ধ করে দেয়া হয়। আনুষ্ঠানিকভাবে চলচ্চিত্র নির্মাণ বন্ধ না করলেও পরিস্থিতি এমন করে দেয়া হয়েছিল যে সিনেমা নির্মাণ এমনিতেই বন্ধ হয়ে যায়। বশিরের শাসনের অবসান হয়েছে, সুদানের চলচ্চিত্র নতুন করে যাত্রা করেছে। গত বছর ভেনিস ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে সুদানের নির্মাতা আমজাদ আবু আলালা প্রথম ছবির জন্য লায়ন অব দ্য ফিউচার অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন।
১৯৭৯ সালে ইরানে বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে আব্বাস কিয়ারোস্তামি, মোহসেন মাখমালবাফ, জাফর পানাহি, আসগর ফারহাদির মতো আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন নির্মাতাদের আবির্ভাব হয়েছে। সমালোচকরা বলেন, বিপ্লবের পর সিনেমার ক্ষেত্রে রাষ্ট্র যে বিভিন্ন সেন্সরশিপ আরোপ করেছিল, সেটা মোকাবেলা করতে গিয়েই কিয়ারোস্তামি, জাফর পানাহিরা একের পর এক মাস্টারপিস উপহার দিয়েছেন। এক্ষেত্রে সেন্সরশিপ বরং এসব অমূল্য কাজের প্রভাবক হয়ে উঠেছে। জাফর পানাহিসহ অনেক ইরানি পরিচালকই কারাবরণ-নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়েছেন।
মধ্যপ্রাচ্য ছাড়া আরো অনেক জায়গাতেই নির্মাতারা রাষ্ট্রের সাথে বিরোধে জড়িয়েছেন। তেমনই এক দেশ ভেনিজুয়েলা। দেশটিতে সিনেমা নির্মাণ এখন কঠিন কাজ। মাদুরো সরকারের সমালোচনা আরো কঠিন। সুদানের মতো এখানেও ছবি নির্মাণ নিষিদ্ধ নয়, তবে সরকারের পছন্দ হবে না— এমন বিষয়ে ছবি নির্মাণ সম্ভব নয়। গত মাসে রটারডেম ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে প্রিমিয়ার হয়েছে ভেনিজুয়েলার নির্মাতা হোর্হে থিয়েলেনের ছবি লা ফোর্তালেজার।
চলচ্চিত্র নির্মাতা বনাম সরকার
সিনেমার ইতিহাসে সরকারি কর্তৃপক্ষ ও নির্মাতাদের মধ্যে নানা রকম টানাপড়েন সবসময়ই দেখা যায়। ১৯২৪ সালে নির্মিত হয়েছিল রুশ নির্বাক সায়েন্স ফিকশন অ্যালিটা এবং ১৯২৬ সালে বাই দ্য ল। ছবি দুটোর পরিচালক ছিলেন যথাক্রমে ইয়াকোভ প্রোটাজানোভ ও লেভ কুলেশোভ। বলশেভিক বিপ্লবের লক্ষ্যকে উৎসাহ দেয়ার শর্তে ছবিগুলোয় সরকার আর্থিক সহায়তা দেয়। প্রোটাজানোভ অবশ্য তার ছবিতে কমিউনিস্ট মতাদর্শের কিছু সমালোচনা যুক্ত করেছিলেন। ছবি মুক্তির কিছুদিন পর বিষয়টি সোভিয়েত কর্তৃপক্ষের চোখে পড়ে এবং ঠা-া যুদ্ধ শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত ছবিটি আর সহজে প্রদর্শন করা যায়নি। লেভ কুলেশোভ অবশ্য তার ছবিতে সোভিয়েত কর্তৃপক্ষের পক্ষেই কাজ করেছিলেন।
জার্মানির নাৎসি পার্টি ছিল চলচ্চিত্রকে নিজেদের প্রোপাগান্ডায় ব্যবহার করার গুরু। কর্তৃত্বমূলক শাসক হলেও তারা ছবি নিষিদ্ধ করেনি, বরং নিজেদের প্রচারণার শিল্পমাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেছিল। অনেক পরিচালক নাৎসিদের আদর্শের সাথে মিলতে পারেননি বলে ছবি নির্মাণ থেকে সরে গিয়েছিলেন। হিটলারের আগমনের পর জার্মান চলচ্চিত্রের বড় নির্মাতা ফ্রিটজ ল্যাং ও বিলি ওয়াইল্ডার হলিউডে চলে যান।
যুক্তরাষ্ট্রের পরিচালকদেরও অনেক বাধা মোকাবেলা করতে হয়েছে। ১৯৩৪ সালের হেস কোড হলিউডের চলচ্চিত্রে যৌনতা, সহিংসতা প্রদর্শনের ব্যাপারে সীমারেখা টেনে দেয়। তবে সময়ের সাথে সাথে পরিচালকরা এসব আইন এড়িয়ে কাজ এগিয়ে নিয়েছেন। জনগণকে তাদের কাজের স্বাধীনতার সমর্থক করে তুলতে পেরেছেন।
সিনেমা তার ইতিহাসে কী প্রমাণ করেছে? যত কালাকানুন আরোপ করা হোক না কেন চলচ্চিত্র এবং এর নির্মাণ প্রক্রিয়া ধ্বংস হতে পারে না। আজ সুদান ও সৌদি আরব ছবিকে গ্রহণ করে নিয়েছে। তাই বলা যায় রাষ্ট্রের শাসকদের চেয়ে ছবি নির্মাতাদের মনোবল ও সহনশক্তি বেশিই হয়।


আরো সংবাদ

আত্মহত্যার আগে মায়ের কাছে স্কুলছাত্রীর আবেগঘন চিঠি (১৩৫৩০)সিসিকের খাদ্য ফান্ডে খালেদা জিয়ার অনুদান (১২৬০৬)করোনা নিয়ে উদ্বিগ্ন খালেদা জিয়া, শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল (৯৩১৫)ভারতে তাবলিগিদের 'মানবতার শত্রু ' অভিহিত করে জাতীয় নিরাপত্তা আইন প্রয়োগ (৮৪৯০)করোনায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল ইতালির একটি পরিবার (৭৮৬৪)করোনার মধ্যেও ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আরেক যুদ্ধ (৭১৪০)করোনায় আটকে গেছে সাড়ে চার লাখ শিক্ষকের বেতন (৬৯৩১)ইসরাইলে গোঁড়া ইহুদির শহরে সবচেয়ে বেশি করোনার সংক্রমণ (৬৮৯০)ঢাকায় টিভি সাংবাদিক আক্রান্ত, একই চ্যানেলের ৪৭ জন কোয়ারান্টাইনে (৬৭৬১)করোনাভাইরাস ভয় : ইতালিতে প্রেমিকাকে হত্যা করল প্রেমিক (৬২৯৬)