০৭ ডিসেম্বর ২০২৩, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪৩০, ২২ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৫ হিজরি
`

ব্যানার শিল্পের যুগবদল

মেহের আফরোজ শাওন - ফাইল ছবি

যুগ বদলেছে। বদলেছে জীবনযাত্রার ধরন। সবকিছুতেই এখন প্রযুক্তির ছোঁয়া। তেমনি হাতে লেখা শিল্পের জায়গা নিচ্ছে বিভিন্ন ধরনের আধুনিক প্রযুক্তি। এ আর নতুন কী? মানুষের রুচি, প্রয়োজন অনুযায়ী প্রতিনিয়ত বদলে যাচ্ছে শিল্পের ধারা। বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশও চলছে এ পরিবর্তনের আবহ।

ঢাকা শহরের অন্যতম ব্যস্ত নগরী পুরান ঢাকা। এখানে নানা ধরনের ব্যবসা করে থাকে স্থানীয়রা । তেমনি হাতে লেখা ব্যানার শিল্প। একটা সময় ছিল যখন রাস্তায় পাশের দেয়ালে হাতে লেখা বাহারি রঙের ব্যানার চোখে পড়ত। এখন আর তেমন দেখা যায় না। বর্তমানে হাতে লেখা ব্যানারের পাশাপাশি এ স্থান দখল করে নিয়েছে ডিজিটাল প্রিন্ট । হাতে লেখা ব্যানারে থাকে রঙের বাহার আর এখনকার সময়ে প্রিন্টের ব্যানারে প্রাধান্য পাচ্ছে কয়েকটি রঙ।

হাতে লেখা ব্যানার শিল্পীদের খুঁজে পাওয়াও এখন দুষ্কর হয়ে উঠেছে। শাঁখারি বাজার, বাংলাবাজার, ওয়াইজঘাট ঘুরে পাঁচজন শিল্পীর দেখা পাওয়া গেছে। যারা আছেন, তারা এখনো এ পেশার মায়া ছাড়তে পারেননি বলেই রয়ে গেছেন। অন্যরা মোটামুটি সবাই অন্য কাজে চলে গেছেন। কেউ আবার চলে গেছেন অবসরে।

নানা প্রতিকূল পরিবেশ মোকাবেলা করে এ পেশায় আছেন শাঁখারি বাজারের ‘সুরুচি আর্ট’-এর শিল্পী সুকুমার সেন (৭২)। হাতে লেখার কারিগর হিসেবে তিনি এ পেশায় আছেন ৫০ বছর। তার দুই ছেলেও এ পেশায় আছেন।

তিনি বলেন, ‘এখনতো হাতে লেখার ব্যানার উঠে গেছে, ডিজিটাল প্রিন্ট এসেছে। আমি ৫০ বছর যাবত এ পেশায় আছি।’

আধুনিক সমাজে সবকিছু দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। এ শিল্পে কী পরিবর্তন এসেছে , জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'মানুষ এখন কম পয়সার চিন্তা করে। ডিজিটাল প্রিন্টে তা হয়ে থাকে। একটি ভালো মানের ব্যানারে আমি চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা পেতাম। ডিজিটাল বেরিয়ে এ সকল কাজের মূল্যায়ন নষ্ট হয়ে গেছে। ডিজিটালে ২০০ টাকা হলে একটি ছবি বের হয়ে যায় । যেখানে তারা কম টাকায় পাচ্ছে সেখানে কেন বেশি টাকায় করবে তারা?'

তিনি আরো বলেন, ‘হাতে লেখার অনেক শিল্পীরা এখন তরকারি বিক্রেতা, কেউ মুদি দোকান দিয়েছে। শিল্পীরা হারিয়ে যাচ্ছে।’

সুকুমার সেন বলেন, এ শিল্পের প্রতি তার বিশেষ ভালোবাসা কাজ করে যার কারণে এত চড়াই-উতরাই পাড় হয়েও তিনি এখনো এ পেশায় টিকে আছেন।

এ যুগে এমন শিল্পী পাওয়া সত্যিই কঠিন, যিনি শিল্পকে ভালোবেসে তাকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চাইছেন।

তিনি জানান, ‘শিল্পীর মূল্য কমে গেছে এ যুগে। পরবর্তী প্রজন্ম এ শিল্পকে ধরে রাখতে পারবে কিনা এটা এখন উদ্বেগের বিষয়।’

'আমরা শাখাড়ি কিন্তু আমার ভালোবাসা এ শিল্পের প্রতি। আমি আমার পূর্বপুরুষের কাজ করিনি।'

এ শিল্পের প্রতি এখনো মানুষের আকর্ষণ আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ' অনেক লোক এখনো আমাদের ডাকে, হাতে লেখার কাজ চায়, মূলত তাদের জন্যই টিকে আছি, কত দিন থাকব জানি না। তবে আগের মতো পরিস্থিতি আর নেই। কখনো কখনো নিজের ক্ষোভ থেকে আর যাওয়া হয়ে উঠে না। সস্তায় সবকিছু চলে যাচ্ছে।’

তিনি আরো বলেন, 'আগে কাজ করে ভালো লাগত যে আমরা একটি শিল্প গড়ে তুলেছি বাংলাদেশে। আমরা রঙের সাথে কথা বলতাম, তুলির সাথে কথা বলতাম । ডিজিটাল যুগে সব হারিয়ে গেছে।'

বাংলাদেশের এ শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে সরকারের সহযোগিতা কামনা করেন এসকল শিল্পীরা।

অনুপভা আর্টের সত্ত্বাধিকারী ছিলেন আরেক শিল্পী। এখন আর নেই। মুদি দোকানি করে চলছে তার জীবন।
তিনি বলেন, '১৯৮৩ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত আমি হাতে লেখা ব্যানারে কাজ করেছি। আট বছর যাবৎ রঙ তুলির কাজ ছেড়ে দিয়েছি। এ সেকশনে কোনো কাজ নেই। '

তিনি আরো বলেন, 'এ শিল্প একদিন হারিয়ে যাবে, নতুন করে কাজ শেখার মতো কেউ নেই। আমাদের পরে আর কেউ শিখছে না। কেননা দু'মাস-তিন মাসে একটা দুইটা কাজ আসে। তেমন কোনো চাহিদা নেই। বাঁচার তাগিদেই আমাকে এ কাজ ছাড়তে হয়েছে।’

তিনি বলেন, প্রিন্টের থেকে হাতে লেখা ব্যানারের খরচ অনেক বেশি হবে। কেননা সবকিছুর দাম বেশি। আগে যে রঙের ডিব্বা পাওয়া যেত ১০০ টাকা, সেটা এখন তিন শ' হয়ে গেছে। দশ-বিশ বছর পর এ শিল্প আর মানুষ চিনবে না। পরিচিত অনেক শিল্পী জীবিকার টানে অন্য কাজে চলে গেছে।'

এভাবেই কালের গহ্বরে একদিন হয়তো হারিয়ে যাবে এ শিল্প। প্রসঙ্গ আনতেই এমনি শঙ্কা নিয়ে আরেক প্রবীণ শিল্পী মো. আলি বলেন, ' এখনকার দিনে সবাই প্রিন্ট চায়, হাতে লেখার শিল্প আর কেউ চায় না। ৩০ বছর এ পেশায় কাজ করেছি। ডিজিটাল যুগে এ শিল্পীদের কদর নেই। সব প্রিন্ট। একইরকম সব।’

মুকুল আর্টের মালিক বলেন, ' হাতে লেখা সবকিছু উঠে গেছে। বিলবোর্ড, ব্যানার, লিফলেট সব কিছুতে ডিজিটাল চলছে। কম সময়ে অনেক সুন্দর জিনিস পাচ্ছে। হাতে লেখার কাজে তাদের আর কোনো ইন্টারেস্ট নেই।'

রিপন আর্টের সত্ত্বাধিকারী রিপন-কে কেমন যাচ্ছে তার ব্যবসার দিনকাল জিজ্ঞেস করতেই তিনি বলেন, 'হাতে লেখার কাজ নাই। আরো নানা ধরনের কাজ করে সংসার চালাতে হচ্ছে তাকে।'

আধুনিকতার ভিড়ে ব্যানার শিল্পের সেই অতীত জৌলুশ আর নেই । তাই তো রাজধানীর ধোলাইপাড়ের বেলায়েত হোসেনের মতো শিল্পীরা তুলি ছেড়ে হাত দিয়েছেন কম্পিউটারের কিবোর্ডে। এখনো তিনি ব্যানারই তৈরি করেন, তবে তা ডিজিটাল মাধ্যমে । যেখানে তিনি হাতে লেখা ব্যানারের সেই অনুভূতি আর পান না। খুঁজে পান না নিজের শিল্পী সত্ত্বা। মেশিন তার কাজে গতি দিলেও অতীতের মন্থরতার সেই দিনের কথা তিনি ভুলতে পারেন না । হাতে লেখার সময়ের পাঁচ দিনের কাজ তিনি এখন কয়েক ঘণ্টায় করে ফেলতে পারেন ডিজিটাল প্রিন্টারের ছাঁচে। তবে জীবনের ছাঁচে তিনি বরাবরই অগোছালো। আয়ের ক্ষেত্রেও পার্থক্যও তিনি অকপটে মেনে নিয়েছেন । কারণ হাতে লেখা ব্যানার নিয়ে তিনি আর প্রতিযোগিতায় টিকতে পারেননি । তাই তো মনোকষ্ট নিয়েও বাস্তবতার ভিড়ে গা ভাসিয়েছেন সময়ের স্রোতে। শিল্পে সবার একটা স্বতন্ত্র জায়গা থাকে, যেখানে কেউ কারোর জায়গা নিতে পারে না । হাতে লেখা ব্যানার শিল্পও তাই । ব্যানারে মেশিনের মাধ্যমে মুহূর্তেই যত পাকা রঙের ছাপ পড়ুক না কেন, তা হাতে লেখা ব্যানারের জায়গা কখনোই নিতে পারেনি। তাই বেলায়েত হোসেনের মতো জাত শিল্পীরাও আধুনিকতায় সৌন্দর্য খুঁজে পান না। কথায় আছে শিল্পী এবং তার শিল্প কখনো মরে না। বেলায়েতের মতো শিল্পীরা চাইলেও আধুনিকতার মধ্যে ডুবে গিয়েও রঙ তুলির কথা ভুলতে পারেন না। তাই এখনো হাতের কাজ পেলেই তা লুফে নেন।

 


আরো সংবাদ



premium cement
মেসির মুখে হঠাৎই সৌদির প্রশংসা কিন্তু কেন? বাংলাদেশে খাদ্য-পুষ্টি নিরাপত্তার উন্নয়নে এফএও ও ইআরডির ৪ প্রকল্প চুক্তি সই নকল ডিটারজেন্ট তৈরির কাঁচামাল ও মেশিনসহ গ্রেফতার ১ কাহালুতে প্রতিবন্ধী তরুণী ধর্ষণ মামলায় বৃদ্ধ গ্রেফতার বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চলে ওষুধ উপকরণ কারখানা স্থাপন করবে চীনা কোম্পানি ফিলিস্তিন ইস্যুতে মুফতি তাকি উসমানির ঐতিহা‌সিক ভাষণ আ'লীগের ক্ষমতা কুক্ষিগত করার মনোবাসনা পূরণ হতে দিবে না জনগণ : এটিএম মা’ছুম সিলেটে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টিতে স্থবিরতা প্রার্থিতা ফিরে পেতে ৩য় দিনে ১৫৫ জনের আপিল নাটোর কারাগারে অসুস্থ বিএনপি নেতার রামেক হাসপাতালে মৃত্যু ঝালকাঠিতে বাস-মাহিন্দ্র গাড়ির সংঘর্ষে নিহত ৩, আহত ৫

সকল