৩০ মে ২০২০

সরকারি অনুদান নেবে না কওমি মাদরাসা

সরকারি অনুদান নেবে না কওমি মাদরাসা - সংগৃহীত

সরকারের দেয়া আর্থিক সহায়তা (অনুদান) গ্রহণ না করার ব্যাপারে একাট্টা হচ্ছে দেশের প্রায় সব কওমি মাদরাসা। কওমি মাদরাসাগুলোর বড় শিক্ষাবোর্ড বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া শনিবার এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তাদের সর্বোচ্চ সংস্থা আল হাইআতুল উলায়াও এমন সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে।

বেফাক ও হায়াতুল উলায়ার শীর্ষ কর্মকর্তা মাওলানা মাহফুজুল হক নয়া দিগন্তকে বলেন, বেফাকের সভায় অনুদান না নেয়ার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হয়েছে। হাইআতুল উলয়ার নেতাদের অনেকে ঢাকায় নেই। কো-চেয়ারম্যান ফোনে তাদের সঙ্গে কথা বলছেন। সিদ্ধান্ত জানানো হবে এই সর্বোচ্চ সংস্থার পক্ষ থেকেও।

এর আগে ছয় হাজার ৯৫৯টি কওমি মাদ্রাসার জন্য আট কোটি ৩১ লাখ ২৫ হাজার টাকা সরকারি অনুদানের তাৎক্ষনিক প্রতিক্রিয়ায় গত বৃহস্পতিবার আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী, মাওলানা মহিবুল্লাহ বাবুনগরীসহ ৭২জন এটিকে কওমি মাদরাসার নীতি আদর্শ বিরোধী আখ্যায়িত করে মাদসাসার দায়িত্বশীলদের প্রতি তা গ্রহণ না করার অনুরোধ জানান।

শুক্রবার সন্ধ্যায় হাটহাজারি মাদরাসার ফেসবুকে পেইজে সরকারি অনুদান গ্রহণ না করার ঘোষণা দেয়া হয়।

‘দারুল উলূম হাটহাজারী স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ও স্বকীয়তার উপর বহাল : সরকারি অনুদানের প্রয়োজন নেই’ শিরোনামে এক পোস্টে বলা হয়, জামেয়া দারুল উলূম হাটহাজারী ও তার (মুলহাকাহ) অনুসারী মাদরাসাসমূহ সরকার কর্তৃক ঘোষিত কোন অনুদান গ্রহণ করবে না। তাই কোনো কওমি মাদরাসা কর্তৃপক্ষ যেন এই অনুদানের বিষয়ে সংশয় ও সন্দিহানের মধ্যে না থাকে। (এরপরও যদি কেউ যদি গ্রহণ করে থাকেন এটা একান্তই তাদের ব্যক্তিগত ব্যাপার।)
জানতে চাইলে হাটহাজারি মাদরাসার সহকারি শিক্ষা সচিব ও মাদরাসার মহাপরিচালক আল্লামা শাহ আহমদ শফির ছেলে মাওলানা আনাস মাদানী নয়া দিগন্তকে বলেন, এ ব্যাপারে আমরা আগের সিদ্ধান্তের ওপরই অটল আছি। পুরনো সিদ্ধান্তই নতুন করে করে জানানো হয়েছে পেজে।

অন্যদিকে কওমি মাদরাসার অনুদানের জন্য বেফাক বা হাইআতুল উলয়ার পক্ষ থেকে সরকারকে কোনো তালিকা দেয়া হয়নি বেফাকের নেতারা জানিয়েছেন।

তবে অন্য সূত্র জানিয়েছে, মুলত জেলা প্রশাসকদের পক্ষ থেকে পাঠানো একটি তালিকা থেকে কওমি মাদরাসাগুলোকে করেনা পরিস্থিতি ও রমজান উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী উক্ত আর্থিক বরাদ্দ দেন। এই বরাদ্দ দেয়ার জন্য ইসলামিক ফাউন্ডেশনকেও একটি তালিকা দিতে বলা হয়। তবে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের তালিকা দীর্ঘ হওয়ারয় সেটি অনুসরণ না করে জেলা প্রশাসকদের তালিকা অনুয়ায়ী বরাদ্দ দেয়া হয়। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সংশ্লিস্ট এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বাদপড়া মাদরাসাগুলোর নামও পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে।

এর আগে ছয় হাজার ৯৫৯টি কওমি মাদ্রাসার জন্য বরাদ্দ করা আট কোটি ৩১ লাখ ২৫ হাজার টাকা ইতিমধ্যে ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফারের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠিয়ে দেয়ার কথা জানা যায়।

বেফাকের সিদ্ধান্ত ও আহবান : বেফাকের বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, সংস্থার মজলিসে খাসের এক সভা সিনিয়র সহসভাপতি (ভারপ্রাপ্ত) মাওলানা আব্দুল কুদ্দসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সিদ্ধান্ত হয়, সরকারি অনুদান গ্রহণ, কওমী মাদরাসার দেড়শত বছরের ইতিহাস ঐতিহ্য এবং দারুল উলূম দেওবন্দের নীতি আদর্শকে বিসর্জন দেয়া। তাই এধরনের অনুদান গ্রহণ থেকে বিরত থাকার জন্য সকল কওমি মাদরাসার দায়িত্বশীলদের প্রতি আহবান জানানো হয়। বেফাক নেতৃবৃন্দ বলেন উপমহাদেশব্যাপী বিস্তৃত কওমী মদরাসাসমূহ ভারতের বিখ্যাত দারুল উলূম দেওবন্দের নীতি-আদর্শ ও শিক্ষাক্রম অনুসরণ করেই পরিচালিত হয়ে আসছে। দারুল উলূম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠাকালে অলঙ্ঘনীয় যে ‘উসূলে হাশতেগানা’ তথা আট মূলনীতি নির্ধারণ করে, তার অন্যতম একটি হলো ‘যে কোনো পরিস্থিতিতে সরকারী অনুদান গ্রহণ থেকে বিরত থাকা। সুতরাং এই মূলনীতিকে বিসর্জন দিয়ে দেশের কোনো কওমি মাদরাসা সরকারী অনুদান গ্রহণ করতে পারে না। অতীতেও বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও কঠিন সঙ্কটকালে আমাদের পূর্বসূরিরা অনুদানের জন্য সরকারের দ্বারস্থ হননি।

বিবৃতিতে তারা আরো বলেন, এই উপমহাদেশে ইসলাম, মুসলমান তথা দ্বীনের হেফাজতের জন্য আকাবির ও আসলাফগণ এক কঠিন পরিস্থিতিতে যে ৮ মূলনীতির উপর ভিত্তি করে দারুল উলূম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকার হুবহু ওই মূলনীতিসমূহের ভিত্তিতেই কওমি মাদরাসার সনদের স্বীকৃতি দিয়েছে এবং স্বীকৃতি সংক্রান্ত আইনের ২(১) ধারায় কওমি মাদরাসার সংজ্ঞায় বলা হয়েছে “মুসলিম জনসাধারণের আর্থিক সহায়তায় উলামায়ে কেরামের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত ইলমে ওহীর শিক্ষা কেন্দ্রই হলো কওমী মাদরাসা। তাই ঐতিহাসিক সেই মূলনীতি এবং কওমী মাদরাসার সংজ্ঞাকে উপেক্ষা করে আমরা কোনোভাবেই সরকারি অনুদান গ্রহণ করতে পারি না। বৈঠক থেকে বেফাকের সম্মানিত সভাপতি আল্লামা আহমদ শফির সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি এই সিদ্ধান্তকে অনুমোদন করেন।

বৈঠকে যারা উপস্থিত ছিলেন হযরত মাওলানা আব্দুল কুদ্দুস, হযরত মাওলানা নূর হোসাইন কাসেমী, হযরত মাওলানা আতাউল্লাহ ইবনে হাফেজ্জী, হযরত মাওলানা আব্দুল হামিদ (পীর সাহেব মধুপুর), হযরত মাওলানা ছফিউল্লাহ, হযরত মাওলানা মাহফুযুল হক, হযরত মাওলানা বাহাউদ্দিন যাকারিয়া, হযরত মাওলানা মুফতি নূরুল আমিন, হযরত মাওলানা মনিরুজ্জামান।

 


আরো সংবাদ