৩১ মার্চ ২০২০
একান্ত সাক্ষাৎকারে ইউজিসি চেয়ারম্যান প্রফেসর কাজী শহীদুল্লাহ

সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষায় দুর্ভোগ কমবে বিশ্ববিদ্যালয়ও স্বাতন্ত্র্য হারাবে না

প্রফেসর ড. কাজী শহীদুল্লাহ - ছবি : নয়া দিগন্ত

সমন্বিত বা কেন্দ্রীয় ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকদের দুর্ভোগ যেমন এক দিকে কমবে তেমনি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর স্বাতন্ত্র্যও বজায় থাকবে। দীর্ঘ দিনের প্রচেষ্টার ফলস্বরূপ চলতি বছর থেকেই একযোগে কেন্দ্রীয় ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে স্নাতকপর্যায়ে শিক্ষার্থীরা ভর্তির সুযোগ পাবে। একটি পরীক্ষার মাধ্যমেই ভর্তি ইচ্ছুক শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ মেধা আর যোগ্যতার ভিত্তিতে স্কোর পাবে। পরে এই স্কোর অনুযায়ী নির্ধারণ হবে সে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য নির্বাচিত হবে। নয়া দিগন্তের সাথে একান্ত সাক্ষাৎকারে নতুন এই ভর্তি পরীক্ষার প্রক্রিয়া, পদ্ধতি এবং নানা দিক নিয়ে কথা বলেছেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. কাজী শহীদুল্লাহ।

সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষার বিষয়ে আপনারা তো একাধিকবার মিটিং করেছেন। এখানে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় ভিসিদের কাছ থেকে কী ধরনের মতামত পেয়েছেন?

কাজী শহীদুল্লাহ : আমাদের প্রায় সবগুলো মিটিংয়েই সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষার বিষয়ে সবগুলো বিশ্ববিদ্যালয় ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে। এখানে খোলাখুলিভাবেই ভিসি মহোদয়গণ প্রত্যেকেই তাদের মতামত তুলে ধরেছেন। আমাদের সভায় কেউ কোনো আপত্তি বা অনাগ্রহের বিষয়ে কোনো কথা বলেননি। আমাদের আগের যে সিদ্ধান্ত ছিল অর্থাৎ আমরা কেন্দ্রীয়ভাবে ভর্তি পরীক্ষা নেব, এখনো সেই সিদ্ধান্তই আছে। তবে কিছু কিছু বিষয়ে কাজ চলছে।

কবে নাগাদ একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসতে পারবেন বলে মনে করছেন?

কাজী শহীদুল্লাহ : এখন তো ফেব্রুয়ারি মাস। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সবাই এই ভাষা আন্দোলনের মাসে একটু ব্যস্ত থাকেন। তবে আমরা আশা করি এ মাসের পরেই অর্থাৎ মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকেই আমরা পুরোদমে কার্যক্রম শুরু করতে পারব। ইনজেনারেল এখনো সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষার বিষয়েই আমাদের সিদ্ধান্ত বলবৎ আছে।

কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় এ বিষয়ে তাদের নিমরাজির (আপত্তি) কথা জানিয়েছে

কাজী শহীদুল্লাহ : না, বিষয়টি এ রকম নয়। তারা কেউই আমাদের সিদ্ধান্তের সাথে দ্বিমত বা অমত ছিলেন না। সবাই আমরা সেখানে ছিলাম। আশা করছি সবাই আমাদের সাথে আসবে। এখনো তো কেউ কোনো আপত্তি বা অনাগ্রহের কথা জানাননি।
নয়া দিগন্ত : তাহলে কি এটা বলা যায় যে, এ বছর থেকেই আপনারা সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষার আয়োজন করছেন?
কাজী শহীদুল্লাহ : হ্যাঁ, আমরা নীতিগতভাবে এই সিদ্ধান্তেই এখনো আছি। তবে যেহেতু আমাদের হাতে এখনো আরও সময় আছে এর মধ্যে আরও অনেক কিছুই হয়তো যুক্ত হতে পারে। তবে আমরা শতভাগ চেষ্টা করব আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকেই এই পদ্ধতি চালু করতে। ‘উই আর ট্রায়িং আওয়ার বেস্ট’।

ডাকসুর নেতারা বলেছেন তারা এখনো এটার বিষয়ে কিছুই জানেন না। তারা আপত্তি জানিয়েছেন। তারা সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষার একটি খসড়া রূপরেখাও চেয়েছেন। সেটির প্রস্তুতি কত দূর?

কাজী শহীদুল্লাহ : একটি রূপরেখা তৈরির কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। এটা অবশ্য আন্ডার প্রসেজ। এ মাসের মধ্যেই হয়তো এটা তৈরি হয়ে যাবে। তারপরেও হয়তো অনেকের অনেক প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকবে। একবারেই তো আর সব ঠিক হয়ে যাবে না। সময় লাগবে। আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হবে। তারপরেই চূড়ান্তভাবে হয়তো একটি জিনিস (রূপরেখা) আমরা হাতে পাবো।

ভর্তি পরীক্ষা আসলে কয়টি হবে, পদ্ধতিটাই বা কী?

কাজী শহীদুল্লাহ : পরীক্ষা হবে তিনটি। তিনটি বিভাগের জন্য তিনটি আলাদা আলাদা পরীক্ষা। বিজ্ঞান, আর্টস্ ও বাণিজ্য। পরীক্ষা একই দিনে অথবা ভিন্ন ভিন্ন দিনেও হতে পারে। আমরা এখনো সর্ট আউট করিনি। তবে একজন শিক্ষার্থী তার বিভাগ অনুযায়ী একটি পরীক্ষাতেই অংশ নেবে।

ভর্তির যোগ্যতা বা মেধাতালিকা কিভাবে তৈরি করা হবে?

কাজী শহীদুল্লাহ : এখানে পরীক্ষার্থীর আলাদা কোনো মেধাতালিকা বা যোগ্যতার তালিকা তৈরি করা হবে না। ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে প্রত্যেক শিক্ষার্থী ফলাফলের ভিত্তিতে একটি স্কোর পাবে। এটিই হবে ভর্তির ক্ষেত্রে যোগ্যতা। বিশ্ববিদ্যালয়ের চাহিদা বা রিকোয়ারমেন্ট অনুযায়ী নির্দিষ্ট স্কোরের শিক্ষার্থীরাই ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারবে। এই স্কোর হবে এক থেকে এক শ’র মধ্যে। ভর্তি পরীক্ষায় প্রাপ্ত নম্বর এবং এসএসসি ও এইচএসসির প্রাপ্ত গ্রেডের (জিপিএ) ভিত্তিতেই মূলত এই স্কোর নির্ধারণ করা হবে।

কোনো বিশ্ববিদ্যালয় যদি এই প্রক্রিয়ার সাথে না আসে তাহলে কিভাবে এগোবেন?

কাজী শহীদুল্লাহ : এখন পর্যন্ত কেউ তো আমাদের না বলেনি। তারা আসবে না এ কথা কিন্তু কেউ বলেনি। সবাই তো আসতে চায়। তবে আমরা এখন যে পর্যায়ে পৌঁছে গেছি সেখান থেকে ব্যাক ডাউন বা ফেরত আসার কোনো সুযোগ নেই। কেউ না এলে তাদেরকে বাদ রেখেই আমরা সামনে এগিয়ে যেতে চাই। তবে আমরা আশা করছি, তারা সবাই আসবে। আর এ জন্যই তো মার্চ মাস পর্যন্ত আমরা সময় নিয়েছি। মার্চের প্রথম সপ্তাহ থেকেই ‘উই শেল গো এহেড’।

পরীক্ষার নামটি আসলে কী হবে?

কাজী শহীদুল্লাহ : পরীক্ষার এই নামটি প্রচার হচ্ছে সমন্বিত বা গুচ্ছ পদ্ধতির ভর্তি পরীক্ষা নামে। এই নামটি নিয়ে কয়েকজনের বিকল্প প্রস্তাব এসেছে। আমরা সেই বিকল্প নামটিই সিলেক্ট করেছি। তাই এখন থেকে এই পরীক্ষার নাম হবে ‘পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের কেন্দ্রীয় ভর্তি পরীক্ষা’। সংক্ষেপে সেন্ট্রাল এডমিশন টেস্ট বা ‘ক্যাট’।

পরীক্ষায় অর্জিত স্কোরের বাইরেও কি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বাড়তি কোনো কোয়ালিফিকেশন বা রিকোয়ারমেন্ট ডিমান্ড করতে পারবে?

কাজী শহীদুল্লাহ : এটা নির্ভর করবে শিক্ষার্থীর চাহিদার সাবজেক্টের ওপর। যেমন ধরুন, একজন শিক্ষার্থী নাট্যকলা বা চারুকলায় ভর্তি হতে চায়। তাহলে ওই বিভাগ চাইলে স্কোরধারী ওই শিক্ষার্থীর নাচ, অভিনয় বা ছবি আঁকার দক্ষতা যাচাই করতে আলাদা একটি পরীক্ষা নিতে পারবে। আবার ধরুন, কোনো শিক্ষার্থী আর্কিটেকচার বা ডিজাইনের ওপর কোনো বিষয়ে ভর্তি হতে চায়। এ ক্ষেত্রেও দক্ষতা যাচাইয়ের জন্য ওই বিশ্ববিদ্যালয় স্বল্প মার্কের একটি পরীক্ষা নিতে পারবে। এরপরেও তাদের যদি আলাদা কোনো রিকোয়ারমেন্ট থাকে তাহলে সেই স্বাধীনতাও তাদের থাকবে। তবে জেনারেল সাবজেক্টগুলোতে এসব রিকোয়ারন্টের কোনো প্রয়োজন নেই। শুধু স্কোরে টিকলেই শিক্ষার্থী ওই সাবজেক্টে ভর্তি হতে পারবে।

অনেক বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষায় ইংরেজিতে শিক্ষার্থীর ন্যূনতম একটি মার্ক ডিমান্ড করে। সে ক্ষেত্রে কী হবে ?

কাজী শহীদুল্লাহ : হ্যাঁ, এটা নির্ভর করবে ওই বিশ্ববিদ্যায়ের ওপরেই। তারা চাইলে আলাদা একটি পরীক্ষা নিতে পারবে। তবে যেহেতু বিষয়গুলো এখনো আলোচনার পর্যায়ে আছে তাই এখনি সব ঠিক করে বলা যাবে না। তবে এগুলোও আমরা ওয়ার্কআউট করব। বিষয়গুলো নিয়ে কাজও চলছে। একটি কমিটিকে দায়িত্ব দিয়ে এসব ক্রিটিক্যাল বিষয় চূড়ান্ত করা হবে।

অনেক বিশ্ববিদ্যালয় তো তাদের স্বকীয়তা হারাতে পারে এমন আশঙ্কা করছে। কারণ কী?

কাজী শহীদুল্লাহ : দেখুন, এমন আশঙ্কার কোনো অবকাশ নেই। প্রত্যেক বিশ্ববিদ্যালয় তাদের স্বকীয়তা রক্ষা করেই ভর্তি কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বকীয়তা বা ইচ্ছাগুলো আমরা ধরে রাখার চেষ্টা করব।

কাজগুলো কিভাবে এগিয়ে নিতে চান?

কাজী শহীদুল্লাহ : আমরা প্রত্যেকটি বিষয়ে আলাদা আলাদা কমিটি করে দিচ্ছি। তারাই বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করবে।

পরীক্ষা নেবে কারা?

কাজী শহীদুল্লাহ : পরীক্ষা নেবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। আমরা শুধু কো-অর্ডিনেশন করব। কোন বিশ্ববিদ্যালয়কে কী দায়িত্ব দেবো সেটি মার্চ মাসেই সিদ্ধান্ত হবে। আমরা প্রত্যেকটি বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি ছাতার নিচে নিয়ে আসতে চাই।

পরীক্ষায় আবেদন কিংবা ভর্তির প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে শিক্ষার্থীদেরকে কি স্বশরীরে হাজির হতে হবে?

কাজী শহীদুল্লাহ : না, শুধু পরীক্ষায় অংশ নেয়া ছাড়া আর কোনো পর্যায়েই কোনো শিক্ষার্থীকে স্বশরীরে হাজির হতে হবে না। সব কার্যক্রমই চলবে অনলাইনে। আবেদনপত্র সংগ্রহ, জমা কিংবা স্কোর নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রেও সে অনলাইনে আবেদন করতে পারবে। আমরা মনে করি, এই প্রক্রিয়ায় শিক্ষার্থী এবং অভিভাবক সবারই দুর্ভোগ কমবে। অর্থের অপচয়ও রোধ করা যাবে। বিশেষ করে মেয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য অনেক উপকার হবে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেয়ার জন্য হন্যে হয়ে সারা দেশে ঘুরে বেড়াতে হবে না।

আপনাকে ধন্যবাদ

কাজী শহীদুল্লাহ : আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ

 


আরো সংবাদ