২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ১৪ আশ্বিন ১৪৩০, ১৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪৫ হিজরি
`
গুম হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারে এখনো আহাজারি

নিখোঁজদের ফেরানোর উদ্যোগ নেই

-

মানুষের অস্বাভাবিক মৃত্যু কিংবা হত্যার শিকার হওয়ার চেয়েও গুম করুণ পরিণতি বয়ে আনে। একজন মানুষ মারা গেলে তার একটি পূর্ণ সমাপ্তি ঘটে। পরিবারের সদস্য কিংবা বন্ধু সুহৃদরা তার ব্যাপারে আর কোনো আশা পোষণ করেন না বা তাকে নিয়ে নতুন কোনো শঙ্কা থাকে না। অন্য দিকে একজন মানুষ গুম হয়ে গেলে প্রতিদিন তাদের দুশ্চিন্তার মধ্যে কাটে। হারিয়ে যাওয়া ব্যক্তিকে কোন পরিণতির শিকার হতে হচ্ছে এ কথা ভেবে তাদের প্রিয়জনরা সর্বদা বিষণœ থাকেন। বিশ্ব গুমবিরোধী সপ্তাহ উপলক্ষে আয়োজিত এক মানববন্ধনে স্বজনহারা পরিবারের সদস্যদের কণ্ঠে সেই বিষণœতা, অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ ঝরে পড়েছে। বিগত বছরগুলোতে বিরামহীনভাবে তারা এই অসহনীয় অবস্থার মধ্য দিয়ে গেলেও নিখোঁজ ব্যক্তিদের ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে রাষ্ট্রের কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেই।
বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার সূত্র ধরে গুম শুরু হয়। বিশেষ করে নির্বাচনী বছর ঘিরে এ হার আশঙ্কাজনক বাড়ে। স্বজনহারানো ব্যক্তিরা নিজেদের পরিবারের সদস্যদের খোঁজে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে ধরনা দিয়ে কোনো ধরনের প্রতিকার পাননি। মানবাধিকার সংগঠনগুলো তাদের ফিরানো নিয়ে সরকারের প্রতি বরাবর আহ্বান জানিয়েছে। কিন্তু গুম হওয়া নাগরিকদের নিয়ে উদাসীনতা দেখিয়ে গেছে সরকার। শেষ পর্যন্ত বিষয়টি নিয়ে বৈশ্বিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোও সোচ্চার হয়েছে। তারই প্রতিফলন ঘটেছে জাতিসঙ্ঘ মানবাধিকার পরিষদে। তারা পরিস্থিতি সরেজমিন পর্যবেক্ষণে বাংলাদেশে আসতে চেয়েছে। বেশ কয়েক বছর তাদের অনুমতি দিতে সরকার অস্বীকার করেছে। মানবাধিকার সংস্থা নিখোঁজ ব্যক্তিদের একটি তালিকা সরকারের কাছে হস্তান্তর করে। সংস্থাটির প্রধান বাংলাদেশ সফর করে গুমের ঘটনাগুলো উদঘাটনে সুনির্দিষ্ট তাগিদ দেয়ার পরও এ নিয়ে কোনো অগ্রগতি নেই আমাদের দেশে।
স্বজনদের সেই আহাজারি ফুটে উঠল প্রেস ক্লাবে আয়োজিত মানববন্ধনে। ১০ বছর আগে হারিয়ে যাওয়া পারভেজ হাসানের ১২ বছরের শিশুকন্যা আদিবা ইসলাম তার হাতে আঁকা বাবার ছবি নিয়ে উপস্থিত হয়। কল্পনার ওই ছবিতে বাবার হাত ধরে রাস্তায় হাঁটছে সে। জাতির উদ্দেশে সে বলে, আমি বাবাকে ফেরত চাই। আমার বান্ধবীরা যখন বাবার হাত ধরে স্কুলে আসে আমার খারাপ লাগে। স্কুল শেষে বাবারা তাদের ফিরিয়ে নিয়ে যায়, আমার বাবা আসে না। আরো কয়েকটি কোমলমতি শিশু তাদের হারিয়ে যাওয়া বাবাদের নিয়ে দুঃসহ বঞ্চনার কথা তুলে ধরে।
মানববন্ধনে উপস্থিত হয়ে আলোকচিত্রী শহীদুল আলম বলেন, আমাকেও গুম করা হয়েছিল। আমার হাত মুখ চোখ বেঁধে ফেলা হয়। আমার পরিবার থানায় অভিযোগ নিয়ে গেলে তাদের ফিরিয়ে দেয়া হয়। তবে সবাই আওয়াজ তোলায় আমি রক্ষা পাই। এ সংক্রান্ত মামলা নিয়েও তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, যে ‘অপরাধ’ আমি করেছি পাঁচ বছরেও তার অভিযোগনামা দিতে পারেনি। আমাকে নিয়মিত হাজিরা দিতে হচ্ছে। তিনি জানান, আমার সামর্থ্য রয়েছে আমি আইনজীবী নিয়োগ দিতে পারি; কিন্তু দেশে অনেক মানুষ আছে যারা গুম হলেও তাদের পক্ষে কথা বলার কেউ থাকে না। শহীদুল আলমের এই অভিজ্ঞতা স্বজন হারানো বহু মানুষের জন্য এক বাস্তবতা।
গুম হওয়া পরিবারগুলো এখন সামান্য প্রতিকারও যে পায়নি তা উঠে এলো ‘মায়ের ডাক’ নামে সংগঠনের সমন্বয়কারী সানজিদা ইসলামের কণ্ঠে। তিনি জানান, মায়ের ডাকের ভুক্তভোগী পরিবার যতগুলো মামলা করেছেন, তার কোনো তদন্ত হয়নি, বিচার হয়নি। জাতিসঙ্ঘ যে তালিকা দিয়েছে তার একটা বিহিত হতে পারে। তালিকায় অন্তর্ভুক্ত প্রত্যেকটি কেস আলাদা করে সরকার তদন্ত করে দেখতে পারে। এগুলো সারা বিশ্বের কাছে জানা হয়ে গেছে। এ দায় কোনোভাবে সরকার অস্বীকার করতে পারে না। দেশের একজন নাগরিক তার স্বজনের খোঁজ চাইলে একটি গণতান্ত্রিক সরকারের তা দেয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
গুম নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ তদন্ত সরকার ও আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিজেদের স্বার্থে প্রয়োজন। অন্তত যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে একটি সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারের আয়োজনের মাধ্যমে তারা নিজেদের নির্দোষ প্রমাণ করতে পারে। আমরা মনে করি, স্বজনহারাদের কান্না সরকার অনুধাবন করে শিগগির গুম ব্যক্তিদের ব্যাপারে সন্তুষ্ট হওয়ার মতো তথ্য দেবে পরিবারগুলোকে, সবাই সেই প্রত্যাশা করে।


আরো সংবাদ



premium cement