০২ এপ্রিল ২০২৩, ১৯ চৈত্র ১৪২৯, ১০ রমজান ১৪৪৪
`
বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রতি বাড়ছে অবহেলা

পারিবারিক মূল্যবোধে অবক্ষয়

-

আমাদের সমাজেও সন্তানরা মা-বাবার প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ করছে। কিছু ক্ষেত্রে অসম্মান, অবহেলা ও মারধরের ঘটনা ঘটছে। এমনো ঘটছে; বয়স্ক মা-বাবাকে রাস্তায় ফেলে দেয়া হচ্ছে। ফলে বৃদ্ধাশ্রমের বিষয়টি এখন দেশে বেশ আলোচিত। যদিও এ ধরনের আশ্রম শুধু আত্মীয়স্বজন ও সন্তানহারা প্রবীণদের অবলম্বন হওয়ার কথা। কিন্তু সেখানে আশ্রয় নিতে হচ্ছে উপযুক্ত সন্তান, আত্মীয়স্বজন থাকা বৃদ্ধদেরও। ওল্ড হোমের ধারণা বাংলাদেশে আগে চিন্তাও করা যেত না। এর প্রধান কারণ, আমাদের শক্তিশালী পারিবারিক বন্ধন ও মূল্যবোধ। যেখানে বৃদ্ধ মা-বাবা পরিবারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। দুর্ভাগ্য সেই বাঁধন হালকা হতে শুরু করেছে। ঘুরেফিরে খবর আসছে, সন্তানদের অবহেলায় মা-বাবা হচ্ছেন আশ্রয়হীন অপাঙ্ক্তেয়।
সহযোগী একটি দৈনিকের খবর, অশীতিপর এক বৃদ্ধাকে ফেলে যাওয়া হয় রাস্তায়। গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর তেজগাঁও শিল্প এলাকায় দেখা মেলে তার। কম্বল জড়িয়ে ফুটপাথে পড়ে ছিলেন তিনি। তাকে ঘিরে উৎসুক মানুষের জটলা। ঘটনার বিবরণে অনুমান করা যায়, অবস্থাসম্পন্ন পরিবারের সদস্য ছিলেন তিনি। বয়সের ভারে অসুস্থতাজনিত অক্ষমতায় পরিবারের সদস্যরা তাকে আর সহ্য করেননি। তিনি স্পষ্ট করে কথা বলতে পারেন না। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দুই ব্যক্তি ওই বৃদ্ধাকে রেখে সটকে পড়েন। আপনজনরা ঘটনাটি ঘটিয়েছেন কিনা নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। তবে এর আগে বৃদ্ধ মা-বাবাকে উন্মুক্ত জায়গায় ফেলে যাওয়ার কিছু ঘটনা আমরা দেখেছি। সন্তান-সন্ততির সচ্ছলতা থাকা সত্ত্বেও মা-বাবাকে নিজেদের সাথে রাখেনি।


বৈষয়িক ব্যস্ততায় আমাদের সমাজের ভেতরে বড় পরিবর্তন ঘটিয়েছে। যেখানে নিজেদের জীবন-জীবিকা বয়স্কদের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত হচ্ছে। প্রতিষ্ঠিত অনেক পরিবারে স্বামী-স্ত্রী উভয়ে চাকরি করেন। কেউ ব্যবসায় নিয়ে ব্যস্ত। আবার দেখা যায়, নিজের শিশুসন্তান লালনপালনের দোহাই দিয়ে বৃদ্ধ মা-বাবাকে সাথে না রাখার যুক্তি খোঁজেন। সক্ষম ছেলেমেয়েও মা-বাবার দায়িত্ব এড়িয়ে যান। সম্পত্তির ভাগাভাগি নিয়েও জটিলতা রেষারেষি মা-বাবাকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে অভাবও বৃদ্ধ মা-বাবার আশ্রয়হীন হওয়ার কারণ হচ্ছে।
বাংলাদেশে প্রবীণ বা ষাটোর্ধ্বরা জনসংখ্যার ৬ শতাংশের বেশি। বিরাট জনসংখ্যার দেশে ৯০ লাখ মানুষ বয়সের ভারে ন্যুব্জ। তারা আয় উপার্জন করতে পারেন না। অনেকে নিজের প্রাত্যহিক কাজকর্মও করতে পারেন না। প্রাকৃতিক কারণে তাদের দেহে শক্তি কমে গেছে। অল্পতে রোগেশোকে কাবু হয়ে পড়েন। এ অবস্থায় তাদের সেবা-শুশ্রুষা ও মানসিক সহায়তা বেশি প্রয়োজন। বাংলাদেশে যে পারিবারিক প্রথা গড়ে উঠেছে; তাতে বয়োজ্যেষ্ঠরা বাকি সদস্যের কাছে গুরুত্ব পান। পরিস্থিতি যত প্রতিকূল হোক না কেন, পরিবার তাদের বোঝা মনে করে না। আন্তরিকতা নিয়ে ভালোবাসা দিয়ে বয়োবৃদ্ধদের সেবা দেয়। দুর্ভাগ্য হচ্ছে- আমাদের সামাজিক ব্যবস্থায় পরিবর্তন সূচিত হয়েছে। এখানেও বৈষয়িক উন্নতি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফলে একটি শ্রেণী বৃদ্ধ মা-বাবাকে আর গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে না।


পশ্চিমা বিশ্ব ও পূর্ব এশিয়ার কথিত উন্নত দেশগুলোতে পারিবারিক প্রথা ভেঙে পড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে তাদের পিতৃ বা বংশপরিচয় গৌণ হয়ে গেছে। সব কিছু অর্থের বিচারে মূল্যায়নের প্রবণতা প্রাধান্য পাচ্ছে। সেখানে বৃদ্ধদের জন্য পরিবারের আশ্রয় সেভাবে মিলে না। উদ্ভব হয়েছে বৃদ্ধাশ্রমের। আমাদের দেশে পরিবারের বয়োবৃদ্ধ সদস্যদের ক্ষেত্রেও তার কিছু প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। যদিও এখনো এটি প্রান্তিক পর্যায়ে; তবে এ প্রবণতা বাড়তে থাকায় উদ্বিগ্ন না হয়ে পারা যায় না। বিষয়টি এখনই গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত। সরকার দারিদ্র্যবিমোচনে একটি অংশকে বয়স্কভাতা দিচ্ছে। তবে মধ্যবিত্ত ও ধনীদের মধ্যে যেখানে বৃদ্ধরা পরিবারের কাছে উপযুক্ত আশ্রয় পাচ্ছেন না; তাদেরও সহায়তায় এগিয়ে আসতে হবে।
বৈশ্বিক পর্যায়ে বয়স্কদের বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে ১৯৯১ সাল থেকে প্রতি বছর ১ অক্টোবর প্রবীণ দিবস পালন করা হয়। ১৯৯৯ সালকে প্রবীণবর্ষ ঘোষণা করা হয়। আমাদের উচিত পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় করতে জাতীয়ভাবে সচেতনতা বাড়াতে কর্মসূচি হাতে নেয়া। তা হতে পারে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও পাঠ্যপুস্তকের মাধ্যমে।


আরো সংবাদ


premium cement