০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ১৯ মাঘ ১৪২৯, ১০ রজব ১৪৪৪
ads
`
শুধু প্রচারণার ডামাডোল

প্রকৃত ও সাধিত উন্নয়নে ফারাক

-

একার উন্নতিতে প্রকৃত উন্নয়ন হয় না। আর সবাইকে যুক্ত করা না গেলে উন্নয়নের সুফল পাওয়া যায় না। এসব কথা উঠে এসেছে একটি সামাজিক সংগঠনের আলোচনায়। এতে সারা দেশের বাছাই করা নাগরিক প্রতিনিধি ও মন্ত্রী এমপি, বুদ্ধিজীবীসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিরা অংশ নেন। তারা বলেছেন, উন্নয়ন হলেও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রয়োজন ও চাহিদামতো উন্নয়ন হচ্ছে না। সরকারের উন্নয়নের অর্থ দুর্নীতি ও অদক্ষতার কারণে প্রান্তিক মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে না।
এর বাইরেও দেশের রাজনীতি, রাজনৈতিক পরিবেশ, শোষণ, বঞ্চনাসহ বিভিন্ন নানা প্রসঙ্গ উঠে আসে আলোচনায়। সবই ঠিক আছে; কিন্তু যেটি অনুক্ত থেকে গেছে তা হলো- সমস্যার উৎস কী, কার উন্নতি হচ্ছে, কারা অন্য সবাইকে বঞ্চিত করে এককভাবে উন্নয়নের সব সুফল কুক্ষিগত করছেন। বলা হয়নি কারা লাগামহীন দুর্নীতির সুযোগ তৈরি করে অর্থনীতিকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে ঠেলে নিয়ে এসেছেন। কারা ঋণের নামে ব্যাংক খালি করে সব অর্থ বিদেশে পাচার করেছেন। বলা হয়নি, কারা নির্বিচার দলীয়করণ, মানবাধিকার হরণ, মানুষের কথা বলার সাংবিধানিক অধিকার খর্ব করে ১৮ কোটি মানুষের বেশির ভাগকে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকে পরিণত করেছেন। সবচেয়ে বড় কথা, দেশে যেসব বড় বড় চোখধাঁধানো অবকাঠামো ঋণের টাকায় খাড়া করা হয়েছে এগুলো আদৌ উন্নয়নের উপাদান কিনা সেটিও আলোচনায় আসেনি। গণমাধ্যমে প্রকাশিত ওই অনুষ্ঠানের রিপোর্টে এমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।


বলা হয়নি, প্রকৃত উন্নয়ন বলতে আসলে কী বোঝায়। একসময় বিপুল রিজার্ভের তথ্য দিয়ে উন্নয়নের ঢোল বাজানো হয়েছে। প্রবৃদ্ধির সত্য-অসত্য তথ্য দিয়ে উন্নয়নের মহাসড়কে উঠে যাওয়ার এবং মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার অলীক কাহিনী গাওয়া হয়েছে; কিন্তু প্রকৃত সত্য কী সেটি এখন এসে স্পষ্ট হতে শুরু করেছে, যখন রিজার্ভ তলানিতে এসে ঠেকেছে, অর্থের অভাবে অর্থনীতির মেরুদণ্ড বলে অভিহিত জ্বালানি আমদানি বন্ধ হয়ে গেছে, স্কুলে পরীক্ষার খাতা সরবরাহ করা যাচ্ছে না এবং স্বয়ং সরকারপ্রধান দেশে দুর্ভিক্ষের আশঙ্কার কথা বলছেন।
প্রকৃত উন্নয়ন নিয়ে অর্থনীতিবিদরা অনেক সংজ্ঞাই দিয়েছেন। সেগুলো অর্থনীতির সাথেই সম্পর্কিত। আমাদের যদি অর্থনৈতিক উন্নয়ন সত্যি হয়ে থাকে সেটি তো নিঃসন্দেহে আহ্লাদের বিষয়, গর্বের বিষয়। দুর্ভিক্ষের ১০ নম্বর সতর্কীকরণ আর অর্থনৈতিক উন্নয়ন কি মেলানো যায় কোনোভাবে?
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার সংজ্ঞায়- উন্নয়ন হলো মানুষের জন্য খাদ্য ও পুষ্টি, মৌলিক শিক্ষা, স্বাস্থ্য পরিচর্যা, স্যানিটেশন, বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ, গৃহায়ন, ইত্যাদি সুবিধা সৃষ্টি করা। বাংলাদেশের কথিত উন্নয়নের জোয়ারের কালে উল্লিখিত খাতগুলোতে অগ্রগতির চিত্রটি যদি খতিয়ে দেখা হয় তাহলে চিত্রটি কিন্তু খুব সুখকর নয়।
প্রকৃত উন্নয়ন বলতে আমরা শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়ন বুঝি না। উন্নয়ন বলতে বুঝি দল-মত-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব শ্রেণীর মানুষের সুসমন্বিত কল্যাণ। একই সাথে মানুষের অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, আত্মিক উন্নয়ন। একজন ধনবান মানুষের আচরণে যদি নীতিনৈতিকতা, মূল্যবোধ, মানবিকতার প্রতিফলন না ঘটে তবে তার আত্মিক উন্নয়ন হয়নি। আধুনিক সমাজে যেটিকে আমরা গণতান্ত্রিক আচরণ বলতে পারি ন্যূনতম সেটুকু তো প্রত্যাশিত প্রত্যেকটি মানুষের মধ্যে। আমাদের রাজনীতিক বা সমাজে সেটি কি দেখা যাচ্ছে?
অমর্ত্য সেন নোবেলজয়ী আধুনিক অর্থনীতিবিদ। তিনি বলেন, ‘উন্নয়ন মূলত মানুষের স্বাধীনতাকে সম্প্রসারিত করার প্রক্রিয়া, উন্নয়ন মানে স্বাধীনতা।’ এ বক্তব্যের আলোকে দেশের চিত্রটি কী? দেশে উন্নয়নের সরকারি প্রচারণা ও সমর্থকদের সমান তালে ঢোল বাজিয়ে যাওয়ার কারণে প্রকৃত উন্নয়নের ধারণা নিয়ে লোকেরা আজ কথা বলার ফুরসত পাচ্ছেন না। কিন্তু সময় আসছে, যখন সত্যের নিরিখে বর্তমান ক্ষমতাসীনদের সাধিত উন্নয়নের বিচার-বিশ্লেষণ হবে। মানুষের চোখে সাময়িক ধুলা দেয়া যায়, চিরদিনের জন্য নজর সরিয়ে রাখা যায় না।

 


আরো সংবাদ


premium cement