০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ১৯ মাঘ ১৪২৯, ১০ রজব ১৪৪৪
ads
`

বেপরোয়া গতি : প্রাণ হারাচ্ছেন পথচারী

-

বাংলাদেশের সড়ক পথচারীদের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। প্রতিদিন সড়কে পথচারীরা যানবাহনের চাপায় প্রাণ হারাচ্ছেন। ঘটছে নির্দয় ও নিষ্ঠুর অনেক ঘটনাও। যেমন দুই দিন আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রাইভেট কারের চাকায় পিষ্ট হয়ে প্রাণ হারান এক নারী। ঘটনার যে বিবরণ পাওয়া গেছে, তাতে বোঝা যায়- চালক সদয় হলে মৃত্যু থেকে ওই নারী হয়তো বেঁচে যেতেন। কারের ধাক্কায় তিনি ওই গাড়ির নিচে পড়েন। এরপর চালক তাকে পিষ্ট করে এক কিলোমিটারের বেশি পথ গাড়ি চালিয়ে নিয়ে যান। তিনি যদি সাথে সাথে গাড়ি থামাতেন তাহলে ওই নারী চাকায় পিষ্ট হয়ে হাড়গোড় চূর্ণ হওয়া থেকে রক্ষা পেতেন। এ ধরনের আরো বেশ কয়েকজন পথচারীর মৃত্যুর ঘটনা ঢাকায় ঘটেছে। শুধু চালকের ভুলে যেগুলো সংঘটিত হয়েছে।
ঘটনার শিকার নারী ভাইয়ের মোটরসাইকেলে ছিলেন। প্রাইভেট কারের ধাক্কায় তিনি ওই গাড়ির নিচে পড়ে যান। এ অবস্থায় চালক গাড়ি থামালে করুণ পরিণতি হয়তো এড়ানো যেত। এ ধরনের ঘটনায় দেখা যায়, চালক ভীতসন্ত্রস্ত হন। দুর্ঘটনায় পড়া পথচারীকে বাঁচানোর চেয়ে নিজে পালাতে চান। এর মূল কারণ জনমনস্তত্ত্ব। রাস্তায় দুর্ঘটনা ঘটলে প্রথমে নজর যায় চালকের প্রতি। ধরে নেয়া হয় তিনি দুর্ঘটনার হোতা। এ থেকে ঘটে গণপিটুনির ঘটনা। এ ঘটনায়ও তাই ঘটেছে। এটি করতে গিয়ে আহত ব্যক্তিকে চিকিৎসা দেয়ার কথা ভুলে যান। চালক একই বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক। তাকেও পিটুনির শিকার হতে হয়েছে। এ দিকে চাকায় আটকে পড়া নারীকে হাসপাতালে নিতেও বিলম্ব হয়। যে কারণে চালক গাড়ি না থামিয়ে দ্রুত পালাতে চেয়েছিলেন। এমন করুণ মৃত্যু রুখতে হলে এ মনস্তত্ত্বের পরিবর্তন দরকার। চালক যখন বুঝতে পারবেন তার মারধরের শিকার হওয়ার শঙ্কা নেই; তখন তিনি পালিয়ে না গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার ব্যক্তিকে বাঁচাতে সচেষ্ট হবেন।


রাস্তায় যানবাহনের ধাক্কায় প্রায় দেখা যায়, বেপরোয়া গতির বাহনের নিচে পড়ে হতাহতের ঘটনা। কখনো নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তার পাশে বাজারে কিংবা দোকানে উঠে পড়ছে গাড়ি। এতে রাস্তায় না নেমেও বেপরোয়া গাড়ি চলাচলের কারণে মানুষের প্রাণ যাচ্ছে। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য মতে, ২০১৯ সালে দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় এক হাজার ৪৮৭ জন পথচারী প্রাণ হারিয়েছেন। ২০২০ সালে প্রাণ হারান এক হাজার ৫১২ জন। ২০২১ সালে এক হাজার ৫২৩ জন ও ২০২২ সালের নভেম্বর পর্যন্ত প্রাণ হারান এক হাজার ২৫৮ জন।
দুর্ঘটনা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এর প্রধান কারণ- ৬১ দশমিক ৮০ শতাংশ ক্ষেত্রে বেপরোয়া গতি, অন্য দিকে পথচারীদের অসতর্কতা ও অবহেলায় ৩৮ দশমিক ২০ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটছে। এ দুটো ছাড়াও আরো কিছু কারণ রয়েছে। এর কিছুর জন্য চালক, আর কিছুর জন্য পথচারী দায়ী। এ ক্ষেত্রে চলতি পথে মোবাইল ব্যবহার চালক ও পথচারী উভয়ে করে থাকেন। হেডফোনে গান শোনা, কারো সাথে চ্যাটে মনোযোগী হয়ে ওঠা ও মোবাইলে কথা বলায় রাস্তায় চলাচলে তারা পূর্ণ মনোযোগ দিতে পারেন না। গাড়ির গতি ও রাস্তার বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে নির্দেশনা দেয়া থাকলেও তা খেয়াল করেন না। এ ছাড়া সড়ক ব্যবস্থাপনা নিয়ে সরকারের পরিকল্পনার অভাবও বড় কারণ। ফুটওভারব্রিজ না থাকা, রাস্তার পাশে যেখানে সেখানে বাড়ি বানানো ও জনসমাগম হওয়া পথচারীর প্রাণহানির জন্য দায়ী। সরকার চাইলে নীতিগত সিদ্ধান্ত দিয়ে এগুলো মোকাবেলা করতে পারে।
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, একটি গড় হারে পথচারী রাস্তায় প্রাণ হারাচ্ছেন। বিপরীতে চালক ও পথচারীদের সচেতন করে তুলতে কিংবা তাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার সতর্ক ব্যবস্থা নেই। ফলে আগামীতেও যে একটি নির্দিষ্ট সংখ্যক মানুষ রাস্তায় চলাচল করতে গিয়ে প্রাণ দেবেন, তা নিশ্চিত করে বলা যায়। বাস্তবে পথচারীদের জন্য সড়ক একটি মৃত্যুফাঁদ হয়েই থাকছে।

 


আরো সংবাদ


premium cement