০১ ডিসেম্বর ২০২২, ১৬ অগ্রহায়ন ১৪২৯, ৬ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪ হিজরি
`
হত্যার কারণ নিয়েও মিথ্যাচার

পুলিশের অনৈতিক অবস্থান

-

পুলিশ বিতর্কিত কর্মকাণ্ড চালাবে, তাতে কারো কোনো ধরনের কৌতূহল কিংবা প্রশ্নও থাকে না বর্তমান বাংলাদেশে। চলমান সরকারের আমলে পুলিশের এমন অস্বাভাবিক আচরণ দেখতে দেখতে সবাই অভ্যস্ত হয়ে গেছে। শেষে পুলিশের মধ্যে একেবারে মিথ্যা কথন ও অপরাধের পক্ষে অবস্থান নিতেও এখন স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। পুরো জাতি যখন একটি ঘটনাকে প্রকাশ্যে একভাবে দেখছে পুলিশ সেটি ঠিক তার উল্টোভাবে প্রকাশ করছে। মুন্সীগঞ্জে বিএনপির রাজনৈতিক কর্মসূচিতে মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে খুন হওয়া যুবদলকর্মী শাওনের মৃত্যুর কারণ নিয়ে দায়িত্বশীল পুলিশ কর্মকর্তা এমনই এক বক্তব্য দিয়েছেন সংবাদমাধ্যমে। অথচ তার জানা থাকার কথা, এখন কোনো অঘটন আর লুকানো যায় না। ভিজ্যুয়াল মাধ্যমে ঘটনার জলজ্যান্ত সম্প্রচার পাওয়া যায়। এভাবে আমাদের পুলিশ আসলে কী অর্জন করতে চায় সাধারণ মানুষের কাছে সেটি একটি বড় প্রশ্ন।
মঙ্গলবার মুন্সীগঞ্জের পুলিশ সুপার এক সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেন, নিজেদের দলের সদস্যের ঢিলের আঘাতে শাওনের মৃত্যু হয়েছে। আবার নিজেই বলছেন, ঘটনার সময় পুলিশের সাথে তাদের সংঘর্ষ হয়েছিল। অথচ সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবর থেকে জানা যাচ্ছে সম্পূর্ণ এক ভিন্ন বিবরণ। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে নিবন্ধন খাতায় আহত শাওনের, ‘ব্রেন ইনজুরি-গান শুট’ লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। তার লাশ হস্তান্তরের সময় মেডিক্যাল সনদে লেখা হয়েছে, ‘গুলির কারণে মস্তিষ্কে গুরুতর ক্ষত।’ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার যারা তাকে চিকিৎসা দিয়েছেন তারা এটিকে ‘মাথায় গুলিবদ্ধ হওয়া’ রোগী হিসেবে শনাক্ত করেছেন। পুলিশ সুপারের বক্তব্য তার পুরোপুরি বিপরীত। একজন স্বাভাবিক বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের বিষয়টি বুঝতে কোনো অসুবিধা হয় না।
এর আগে আহত অবস্থায় তাকে সহকর্মীরা যখন উদ্ধার করে নিয়ে যাচ্ছিলেন তারও ভিডিও ফুটেজ ভাইরাল হয়েছে, সেটিও সামাজিক মাধ্যমে রয়েছে। শাওনের মাকে পুলিশের বক্তব্য নিয়ে যখন একটি সংবাদমাধ্যম প্রশ্ন করল তখন তিনি এর উত্তরে জানালেন, ‘যারা বলছে আমার ছেলে ইটের আঘাতে মারা গেছে, তারা ওই ভিডিওটা দেখুক, যেখানে গুলির শব্দ হলো, ধোঁয়াও বের হলো, তখন আমার ছেলে লুটিয়ে পড়ল’। গুরুতর আহত শাওনের বিষয়ে পুলিশের অবস্থান যে সঠিক ছিল না, ঘটনার পরপরই সেটি প্রকাশ হয়ে পড়ে শ্রমিক লীগের একজনের করা মামলা থেকে। ওই মামলায় শাওনকে তারা তিন নম্বর আসামি করে। অথচ ওই রাতেই তিনি হাসপাতালে মারা গেলেন। মামলায় উল্লিখিত অফিস ভাঙচুরের ঘটনা সেটি ছিল না। ঘটনাটি ছিল একটি শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের।
বাংলাদেশে রাজনৈতিক অচলাবস্থা চলছে। পুলিশ প্রশাসনের ভূমিকার কারণে সেটি আরো জটিল হচ্ছে। কিছু দাবি-দাওয়া ও অন্যায়-অনিয়মের বিরুদ্ধে বিরোধী দল বিএনপি সারা দেশে রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করছে। এসব কর্মসূচিকে ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ পর্যায় থেকে আক্রমণ না করার প্রকাশ্য ঘোষণা করা হয়েছে। অথচ মাঠপর্যায়ে দেখা যাচ্ছে তার বিপরীত অনুশীলন। বিশেষ করে পুলিশ এসব রাজনৈতিক কর্মসূচির ওপর চড়াও হচ্ছে। সরকারি দলের পাশাপাশি তারাও হামলা করে এগুলোকে পণ্ড করে দিচ্ছে। আবার পুলিশ এসব ঘটনার জন্য অন্যায়ের শিকার বিরোধী দলকে দায়ী করে মামলা করে হয়রানি করছে। সবচেয়ে ন্যক্কারজনক ঘটনা হচ্ছে- রাজনৈতিক কর্মসূচিতে গুলি করে বিরোধীদের হত্যার ঘটনা। আবার এসব ঘটনা পুলিশ একচেটিয়া বয়ান দিচ্ছে। এর আগে ভোলা ও নারায়ণগঞ্জে পুলিশের ডাহা মিথ্যা বয়ান মুন্সীগঞ্জের মতোই দেখা গেছে।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় পুলিশ রাষ্ট্রের। তারা নির্দিষ্ট কোনো দল কিংবা ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নয়। তাদের কাজ হচ্ছে উদ্ভূত যেকোনো ধরনের পরিস্থিতি সর্বোচ্চ ধৈর্যের সাথে মোকাবেলা করা। আমরা দেখতে পাচ্ছি, পুলিশ শুধু বিরোধীদের কর্মসূচি পণ্ড করছে, তাদের ওপর জীবনঘাতী অস্ত্র প্রয়োগ করছে, সবশেষে তাদের বিরুদ্ধে মামলা দিচ্ছে। এসব করতে গিয়ে তারা আইন নিয়ম কানুন কোনোটির তোয়াক্কা করছে না। তার ওপর সরকারের প্রয়োজনে ডাহা মিথ্যাও বলছে। এতে জাতির ক্ষতি ছাড়া লাভের কিছ্ ুনেই। শেষ পর্যন্ত যারা এমন অন্যায় করছেন তাদের জন্যও সুখকর কিছু থাকবে না।


আরো সংবাদ


premium cement