১০ ডিসেম্বর ২০২২, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৯, ১৫ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪ হিজরি
`
চোরাচালানে ভারতের রাজনীতিক-বিএসএফ জড়িত

সীমান্তে শুধু বাংলাদেশী হত্যার হেতু কী

-

সহযোগী এক দৈনিকে পশ্চিমবঙ্গ সীমান্ত হয়ে গরু চালান নিয়ে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে। পত্রিকাটির কলকাতা প্রতিনিধি জানিয়েছেন, দেশটির রাজনৈতিক নেতা ও সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ এ কাজে জড়িত। গরু চোরাচালান করে তাদের অনেকে বিপুল সম্পদের মালিক বনে গেছেন। দেশটির সর্বোচ্চ গোয়েন্দা সংস্থা সিবিআইয়ের তদন্তে এ খবর প্রকাশ পেয়েছে।
খবরে বলা হয়েছে, উত্তর ভারত থেকে গরু আনার এজেন্ট রয়েছেন। তারা পশ্চিমবঙ্গের বাংলাদেশ লাগোয়া জেলাগুলোতে গরু নিয়ে আসেন। এরপর সেটি সীমান্ত পাড়ি দেয়াতে রাজনৈতিক নেতা ও বিএসএফের একটি সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। গরুগুলোর গায়ে সিল মেরে দেয়া হয়। এরপর সেগুলো বিশেষ কায়দায় সীমান্ত পার করে বাংলাদেশে প্রবেশ করানো হয়। এ কাজে গরুপ্রতি সবার জন্য নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থ ভাগ করা আছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ হয়েছে- গরুপ্রতি বিএসএফ পায় দুই হাজার টাকা।
সিবিআই তদন্ত করতে গিয়ে দেখতে পায়, ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেসের এক নেতার গাড়িচালক হঠাৎ কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। ওই গাড়িচালককে গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদের সময় চোরাচালানের সাথে এ নেতার সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পায় সংস্থাটি। এরপর তৃণমূলের ওই নেতাকে গ্রেফতার করা হয়। অবশ্য তার আগে ২০২০ সালে বিএসএফের কমান্ড্যান্ট সতীশ কুমারকে গ্রেফতার করা হয় একই অভিযোগে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, গরু চোরাচালান করে সীমান্তে সিন্ডিকেট হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক হয়েছে। সিবিআই একই অভিযোগে এ পর্যন্ত মোট ১২ জনকে গ্রেফতার করেছে।
বাংলাদেশ সীমান্তে গরু চোরাচালানে দেশটির সীমান্তরক্ষী বাহিনী জড়িত- এ অভিযোগ উত্থাপন করে পশ্চিমবঙ্গের পুলিশ ২০১৩ সালে। পুলিশের তদন্তে দেখা যায়, তারা মাদক ও মানুষও পাচার করছে। পশ্চিমবঙ্গের সেই সময়ের পুলিশ মহানির্দেশক এক প্রতিবেদনে জানিয়েছিলেন, মুর্শিদাবাদ সীমান্তে নিয়োজিত দু’টি ব্যাটালিয়নের কিছু কর্মকর্তা ও সাধারণ সদস্য চোরাকারবারিদের মদদ দিচ্ছে। এদের সুবিধার জন্য কয়েকটি জায়গায় কাঁটাতারের বেড়াও খুলে রাখা হয়েছে। এ ছাড়া রাজ্যের অন্যান্য সীমান্তেও একই ধরনের অবৈধ কাজে বিএসএফ সদস্যরা লিপ্ত রয়েছে বলে পুলিশ উল্লেøখ করেছে। বিবিসির এক প্রতিবেদনে জানা যায়, পুলিশের এ তদন্ত প্রতিবেদন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ও রাজ্য সরকারের স্বরাষ্ট্র সচিবের মাধ্যমে বিএসএফের কাছেও পাঠানো হয়। এর পর থেকে সীমান্তে চোরাচালানের সাথে বিএসএফের সম্পৃক্ততা নিয়ে বহু খবর বেরিয়েছে। সে দেশের সরকারের পক্ষ থেকে অবৈধ কাজে জড়িত থাকা বিএসএফ সদস্যদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে এমন খবর খুব একটা জানা যায় না।
এ দিকে সীমান্তে প্রতিনিয়ত বাংলাদেশীদের হত্যা করছে বিএসএফ। এ জন্য সরাসরি চোরাচালান ও নানা অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িত বাংলাদেশীদের দায়ী করে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী। প্রকৃতপক্ষে ভারতের অভ্যন্তরে সীমান্তরক্ষী ও রাজনীতিকরাসহ বিরাট একটি গোষ্ঠী যে এ কাজে জড়িত তার প্রমাণ সে দেশের আইনশৃঙ্খলাবাহিনী ও সংবাদমাধ্যম সূত্রে প্রকাশ হচ্ছে। অথচ বিএসএফের গুলিতে একচেটিয়া বাংলাদেশীরা প্রাণ হারাচ্ছেন। সীমান্ত হত্যার জন্য চোরাচালান যদি একমাত্র কারণ হতো তাহলে ভারতীয় নাগরিকরাও প্রাণ হারানোর কথা। সুতরাং ভারত সরকারের এ যুক্তি কোনোভাবে ধোপে টেকে না। প্রহসনের বিষয় হচ্ছে- বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক সময়ে ভারত সফর শেষে প্রচারিত যৌথ বিবৃতিতে সীমান্ত হত্যা উল্লেখযোগ্য কমে যাওয়ার জন্য দুই শীর্ষ নেতা সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। অথচ মানবাধিকার সংগঠনের হিসাবে দেখা যাচ্ছে, আগের দশকের চেয়ে গড়ে বছরে সীমান্তে বাংলাদেশী হত্যা বেড়েছে। বিগত দশকে বছরে গড়ে সীমান্তে প্রাণহানি ছিল ১৫০, চলতি দশকে সেটি বেড়ে হয়েছে ২০০ জন।
সীমান্ত হত্যা নিয়ে ভারত সরকারের মূল্যায়ন সঠিক নয়। সীমান্তে বাংলাদেশীদের হত্যার বিষয়টি পাশ কাটাতে হয়তো দেশটি এমন কূটকৌশল নিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের নীতিটি কেন দিল্লির নীতিকে সমর্থন করছে? যেখানে নিজ দেশের নিরপরাধ মানুষ প্রতিনিয়ত প্রাণ হারাচ্ছে সীমান্তে। সীমান্ত হত্যায় এককভাবে যে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ দায়ী সেটি প্রমাণিত সত্য। এ ব্যাপারে আমাদের বাস্তবভিত্তিক নীতি নিতে হবে। সীমান্তের মানুষের প্রাণ রক্ষায় আমাদের প্রতিশ্রুতিবান হতে হবে।

 


আরো সংবাদ


premium cement