০৮ ডিসেম্বর ২০২২, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৯, ১৩ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪ হিজরি
`
শিক্ষকদের নৈতিকতা প্রশ্নবিদ্ধ

এখনো ভাবার সময় আছে

-

সমাজে নৈতিক অবক্ষয় এখন ধ্বংসাত্মক রূপ নিয়েছে। রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষাসহ এমন কোনো খাত নেই যেখানে নৈতিকতার লেশমাত্র অবশিষ্ট আছে। সবচেয়ে ক্ষতিকর নিঃসন্দেহে রাজনীতিতে নৈতিকতার অভাব। কারণ, রাজনীতি সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রকে সমানভাবে প্রভাবিত করে। এর পরে সম্ভবত শিক্ষার ভূমিকা। বর্তমানে শিক্ষাক্ষেত্রে বিশেষ করে শিক্ষকদের মধ্যে নৈতিকবোধের যে অভাব দেখা যাচ্ছে; তার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে শিক্ষার্থীদের ওপর।
শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড। যারা ভবিষ্যতে দেশ ও জাতির পরিচালনার দায়িত্ব নেবে সেই শিক্ষার্থীদের গড়ে তোলার দায়িত্ব শিক্ষকদের। সেই শিক্ষকসমাজের অনেকে যদি উন্নত চরিত্র ও নৈতিক বলে বলীয়ান না হন তাহলে শিক্ষার্থীদের অবস্থা কী হতে পারে বর্তমান সমাজ-বাস্তবতায় তা স্পষ্ট। সম্প্রতি সমাজে শিক্ষকদের নৈতিক অধঃপতনের বহু দৃষ্টান্ত সামনে এসেছে। প্রাথমিক থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষকের বিরুদ্ধে পাওয়া যাচ্ছে শিক্ষাকে বাণিজ্যে পরিণত করার অভিযোগ। প্রতিনিয়ত সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশ হচ্ছে- ছাত্রী ধর্ষণ-নিপীড়ন, আর্থিক কেলেঙ্কারি, গবেষণায় জালিয়াতি ও চৌর্যবৃত্তি, প্রশ্নফাঁস, দলবাজিসহ নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ। এসব অপকর্মে জড়িত কোনো শিক্ষক তার শিক্ষার্থীদের সুশিক্ষা, নৈতিকতা, সততা, নিষ্ঠা ও চরিত্রবান আদর্শ নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলবেন এমন আশা করার কারণ থাকে কি? অথচ শিক্ষকের কাছে তা-ই প্রত্যাশিত। যারা জাতির নেতৃত্ব দেবে, প্রশাসনসহ সর্বস্তরে দেশ গড়ার কাজ করবে, তাদের উপযুক্ত শিক্ষার মাধ্যমে গড়ে তোলার দায়িত্ব শিক্ষকের। শিক্ষক হচ্ছেন মানুষ গড়ার কারিগর। কিন্তু করিগর নিজে যদি অদক্ষ, অযোগ্য, অসৎ ও চরিত্রহীন হন তাহলে কী হতে পারে?


শিক্ষার উদ্দেশ্য মানবিক গুণে গুণান্বিত আদর্শ মানুষ তৈরি করা; কিন্তু এখন শিক্ষার উদ্দেশ্য দাঁড়িয়েছে প্রভাব-প্রতিপত্তি ও অর্থ-সম্পদ আয় এবং এর কলাকৌশল আয়ত্ত করা। নমুনা হিসেবে দেখা যাচ্ছে, সমাজের সর্বস্তরে দুর্নীতি দুরাচারে। বিচিত্র কায়দায় দুর্নীতির খবর ছাড়াও ফাঁস হচ্ছে শিক্ষকের হাতে ছাত্রী নির্যাতন, নিপীড়ন ও ধর্ষণের ঘটনা। নিয়োগ পরীক্ষা, পাবলিক পরীক্ষাসহ যত পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে তার বেশির ভাগ ক্ষেত্রে শিক্ষকদের জড়িত থাকার অভিযোগ এসেছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির বিরুদ্ধে আর্থিক ও নিয়োগে অনিয়মের প্রমাণ পেয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন।
চলতি বছর এসএসসি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস করে গ্রেফতার হন পাঁচজন শিক্ষক। যাদের ওপর দায়িত্ব ছিল প্রশ্নপত্র সংরক্ষণের তারা সেটি ফাঁস করেন টাকার লোভে। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব বলেছেন, ‘আমি কার ওপর বিশ্বাস করব? ছাত্ররা কী শিখবে? শিক্ষকদের তো আমরা শাসন করতে পারি না।’
সচিবের এই শেষ কথাটিতে আমাদের আপত্তি। শিক্ষক অন্যায় করলে তাকে শাসন করা যাবে না কেন? তাকে শিক্ষার্থীর মতো চড়চাপড় দিয়ে শাসন করতে হবে এমন কোনো যুক্তি নেই। একটি সমাজে কেউ শৃঙ্খলার ঊর্ধ্বে নন। নিয়মের ব্যত্যয় ঘটালে শুধু শিক্ষক কেন, সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ব্যক্তিকেও আইনের কাঠগড়ায় উঠতে হবে, এটি সভ্য সমাজের বিধান। প্রশ্নপত্র ফাঁস করা সর্বোচ্চ পর্যায়ের অপরাধের মধ্যে পড়ে। দু-চারজন শিক্ষকের দৃষ্টান্তমূলক দণ্ড হলে অন্যরা সাবধান হবেন। সেই আইনি ব্যবস্থার অভাবও নৈতিক বোধ শিথিল হওয়ার অন্যতম কারণ এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই।
গত দেড়-দুই দশকে শিক্ষকদের নৈতিক অবক্ষয়ের সংবাদ প্রকাশ হচ্ছে বেশুমার। শিক্ষার সাথে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এখন শিক্ষক নিয়োগ করা হয় দলীয় বিবেচনা কিংবা আর্থিক লেনদেনে। তাই শিক্ষকরা নিয়োগ পাওয়ার পর শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে না নিয়ে বাণিজ্য হিসেবে কাজে লাগান। একজন শিক্ষাবিদ বলেন, শিক্ষার মানের অবনমনে প্রধানত দায়ী শিক্ষকরা। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হতে তারা রাজনীতিবিদদের পেছনে ঘোরেন।
শিক্ষার মান নিয়ে আলাদা করে বলার মানে হয় না। মেধার পরিবর্তে দলীয়করণ আর বাণিজ্যিকীকরণ যদি নিয়োগের মানদণ্ড হয় তাহলে যোগ্য শিক্ষক পাওয়া যাবে না সেটি বলাই বাহুল্য।
টাকা আর অনৈতিক রাজনীতির কাছে গোটা জাতি আজ বন্দী হয়ে পড়েছে। যদি শুভবোধসম্পন্ন মানুষ দেশে এখনো থেকে থাকেন; তাহলে এই পরিস্থিতির অবসান কিভাবে সম্ভব সেটি নিয়ে জাতিকে ভাবতে হবে।

 

 


আরো সংবাদ


premium cement