০৭ ডিসেম্বর ২০২২, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৯, ১২ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪ হিজরি
`
ত্যাগের মহিমায় উজ্জ্বল আশুরা

সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোই মর্মবাণী

-

ইসলামী পঞ্জিকা বা হিজরি বর্ষের পয়লা মাস মহররম। এ মাসের ১০ তারিখ বিশ্বমুসলমান যথাযথ মর্যাদায় দিনটি পালন করে থাকেন। মানবজাতির ইতিহাসে ১০ মহররম ঘটনাবহুল দিন। তবে গত চৌদ্দ শ’ বছরে কারবালার বিয়োগান্ত ও মর্মন্তুদ উপাখ্যান আশুরাকেন্দ্রিক আলোচনায় মূল প্রতিপাদ্য হয়ে উঠেছে। তখনকার সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের সাথে বর্তমান বিশ্ববাস্তবতার অনেক মিল থাকায় আশুরার দিবসে কারবালায় হোসেন রা:-এর শাহাদতের তাৎপর্য ও প্রাসঙ্গিকতা এতটুকুও হ্রাস পায়নি। সত্যের স্বার্থে শিশুপুত্র ও সহচরসমেত জীবন বিলিয়ে দিয়ে সর্বোচ্চ ত্যাগের নজির রেখে গেছেন তিনি। তবু অত্যাচারী শাসকের অন্যায় চাওয়ার কাছে মাথানত করেননি। তাই বেইনসাফি ও অসত্যের বিরুদ্ধে প্রাণপণ সংগ্রাম করে যাওয়ার আহ্বান ও শিক্ষা হচ্ছে আশুরার মর্মবাণী।
মুসলিম জাহানে প্রচলিত আছে, প্রাচীনকাল থেকে আশুরার পবিত্র দিনে আল্লাহ এমন অনেক ঘটনা সংঘটিত করেছেন, যা বিশেষত ইসলামের দৃষ্টিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেগুলো সম্পর্কে আমাদের জানা থাকা দরকার। ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, আশুরার দিনটিতে যেসব ঘটনা ঘটেছিল, এর মধ্যে আছে- প্রথম মানব আদম আ:-এর তওবা কবুল হওয়া, মহাপ্লøাবন থেকে নুহ আ:-এর মুক্তি, সদলবলে অত্যাচারী ফিরাউনের সমুদ্রে নিমজ্জিত হওয়া এবং এভাবে মুসা আ: ও তার অনুসারীদের মুক্তি লাভ, মাছের পেট থেকে ইউনুস আ:-এর পরিত্রাণ, ইবরাহিম আ:-এর জন্ম, কূপের অন্ধকার গহ্বর থেকে ইউসুফ আ:-কে উদ্ধার, ইয়াকুব আ:-এর দৃষ্টিশক্তি প্রত্যাবর্তন, দাউদ আ:-এর তওবা কবুল হওয়া, ঈসা আ:-এর জন্ম ও আকাশে উত্থান, আল্লøাহর কাছ থেকে রাসূল সা:-এর পূর্ণাঙ্গ ক্ষমাপ্রাপ্তি প্রভৃতি। এ দিনে আইয়ুব আ:-এর দীর্ঘকালীন ও জটিল রোগমুক্তি এবং সুলাইমান আ:-কে রাজত্ব ফিরিয়ে দেয়ার ঘটনাও ঘটেছিল। মহররম তথা আশুরা তাই মুসলিম উম্মাহর কাছে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এ দিনে ধর্মপ্রাণ মুসলমান সবাই আল্লøøাহতে সমর্পিত থেকে ইবাদতে মশগুল থাকেন। তাদের প্রত্যাশা, আল্লøাহর রহমত ও বরকতের ফল্গুধারায় সিক্ত হওয়া। ইতিহাস এসব ঘটনার বর্ণনা দিচ্ছে। একটি নির্ধারিত তারিখে এসব সংঘটিত হওয়ায় এর মধ্যে আমরা বিশেষ মহিমা খুঁজে পাই। এ আবেগের মূল্য মুসলমানরা মহান আল্লাহর কাছে প্রত্যাশা করেন।
প্রখ্যাত চিন্তাবিদ ও কবি মাওলানা মোহাম্মদ আলী জওহর বলেছেন, ‘প্রতি কারবালার ঘটনার পরে ইসলাম প্রাণ ফিরে পায়’। অর্থাৎ ন্যায়নিষ্ঠ ও সত্যানুসারী সাহসী সংগ্রামী হজরত হোসেন রা:-কে হত্যার মাধ্যমে মূলত ইয়াজিদের মিথ্যা ধ্যানধারণা তথা অন্যায়-অনাচারের পরাজয় ঘটেছে। কারবালার মতো করুণ উপাখ্যানগুলোতে অপরিমেয় ত্যাগ ও কষ্ট স্বীকার করার মধ্য দিয়ে ইসলামের অনুসারীরা তাদের আদর্শিক নবজীবন লাভ করেন। এভাবে যুগে যুগে ইসলামের অবিনশ্বর চেতনা প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।
পবিত্র আশুরার শিক্ষা হলো- জীবনের সর্বস্তরে যেকোনো মূল্যে আল্লাহ প্রদত্ত এবং রাসূল সা:-এর প্রদর্শিত পথ অনুসরণ করে ইসলামকে দুনিয়ায় বিজয়ী আদর্শরূপে সুপ্রতিষ্ঠিত করা। আজ আত্মসমালোচনা করা উচিত, আশুরা নিছক দায়সারাভাবে পালিত হচ্ছে কি না। মনে রাখতে হবে, সর্বোচ্চ মাত্রার ত্যাগের মাধ্যমে ইসলামকে জীবনের সর্বক্ষেত্রে বাস্তবায়নের যথাসাধ্য প্রয়াসে আশুরা পালনের সার্থকতা নিহিত। যদিও আজ মুসলমানরা অনেকটা দিশেহারা। তাদের নিজেদের দুর্বলতার কারণে তারা পদে পদে লাঞ্ছিত অপমানিত হচ্ছেন। এ দিন তারা শপথ নিতে পারেন। তারা ত্যাগের সর্বোচ্চ পরাকাষ্ঠা প্রদর্শনের শপথ নিতে পারেন। আর তারা কুরআনকে আঁকড়ে ধরার শপথ নিতে পারেন। এর মাধ্যমে তাদের অবমাননা লাঞ্ছনাকর জীবন থেকে উত্তরণ ঘটতে পারে।

 

 


আরো সংবাদ


premium cement