২২ মে ২০২২
`
প্রশ্নফাঁসে জনপ্রতিনিধিও জড়িত

দোষীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেই

-

পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস বন্ধ করতে পারেনি সরকার। প্রথমে হতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস। এ অপসংস্কৃতি এখন এতটাই বিস্তার লাভ করেছে, কোনো ধরনের পরীক্ষা আর বাদ থাকছে না। এমনকি সরকারের স্পর্শকাতর বিভাগের নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্রও না। সর্বশেষ প্রতিরক্ষা মহাহিসাব নিরীক্ষকের কার্যালয়ের অধীনে ‘অডিটর’ নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে। এ ঘটনায় জড়িতদের তালিকায় সংযুক্ত হয়েছেন একজন জনপ্রতিনিধি। তিনি আবার সরকারি দলের ছাত্রনেতা থেকে বর্তমানে উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান। সরকারি দলের ছাত্রসংগঠনের সাবেক নেত্রীর পাশাপাশি জনপ্রতিনিধি হওয়ার দু’টি পদ ব্যবহার করে অপরাধ চক্র পরিচালনা করেছেন। প্রশ্নপত্র ফাঁসের অসাধু কর্মকাণ্ডে দেখা যাচ্ছে, খোদ শিক্ষকরাও জড়িয়ে পড়ছেন। যিনি প্রশ্নপত্র তৈরি ও মডারেশনের মূল দায়িত্বপ্রাপ্ত তিনিই জালিয়াত চক্রের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। অথচ সরকার অপরাধীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিচ্ছে না। ফলে নিয়োগ পরীক্ষাগুলো হয়ে উঠছে দুর্নীতিবাজদের গুরুত্বপূর্ণ দফতরে চাকরি পাওয়ার হাতিয়ার।
গত শুক্রবার অডিটর নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস চক্রে বগুড়ার দুপচাঁচিয়া উপজেলা পরিষদ মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান মাহবুবা নাসরিনের সংযোগ মিলেছে। গোয়েন্দা পুলিশের একটি দল এ চক্রের ১০ সদস্যকে আটক করেছে। তাদের দেয়া বর্ণনা থেকে জানা যায়, মাহবুবা নাসরিন ও তার চক্রের সদস্যদের একটি অংশ খোদ এ পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন। তারা একটি ডিজিটাল ডিভাইস নিয়ে কর্তৃপক্ষকে ফাঁকি দিয়ে পরীক্ষার হলে প্রবেশ করেন। প্রশ্নপত্র বিতরণের কয়েক মিনিটের মধ্যে সেটা কপি করে বাইরে থাকা সিন্ডিকেটের সদস্যদের কাছে পাঠিয়ে দেন। তারা প্রশ্নের সমাধান করে আবার দ্রুত চক্রের অন্য সদস্যদের কাছে পৌঁছে দেন। আগে থেকে একদল পরীক্ষার্থীর সাথে চুক্তি করে রাখে দুর্বৃত্তচক্র। চক্রের সদস্যরা জানাচ্ছেন, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় পাস করিয়ে দিতে ১৬ লাখ টাকা চুক্তি করা হতো। দুই থেকে পাঁচ লাখ টাকা অগ্রিম নেয়া হতো। গোয়েন্দারা রেলওয়েসহ বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষায় মাহবুবা নাসরিনের জড়িত থাকার তথ্য পেয়েছেন। তিনি মূলত রাজনীতিতে যুক্ত থাকার সুযোগকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে জালিয়াতি করছিলেন।
গত বছরের শেষের দিকে রাষ্ট্রায়ত্ত পাঁচ ব্যাংকের নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস নিয়ে তদন্তে বেরিয়ে আসে রক্ষকই সেখানে ভক্ষক হয়েছেন। বুয়েটের ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড প্রোডাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রধান নিখিল রঞ্জন প্রশ্নফাঁসের সাথে জড়িত। প্রতিটি প্রশ্ন ছাপা হওয়ার পর প্রেস থেকে তা নিয়ে যেতেন তিনি। এরপর এসব প্রশ্ন চক্রের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ত। তার ব্যাংক হিসাবে অস্বাভাবিক লেনদেন পাওয়া গেছে। অথচ তিনি নিজে বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র প্রণয়ন কমিটির শীর্ষ দায়িত্বশীল। ঘটনা সব জানাজানি হওয়ার পর তাকে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়। প্রশ্নপত্র ফাঁস একটি ফৌজদারি অপরাধ। তার ওপর তিনি এর অভিভাবকের দায়িত্ব থেকে জালিয়াতি করেছেন। এ ছাড়া সরকারি দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রশ্নপত্র ফাঁস ও নিয়োগ জালিয়াতি ও ঘুষ গ্রহণের হাতেনাতে ধরা পড়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। তাদের বিরুদ্ধেও শুধু বদলি আদেশ দিয়ে কর্তৃপক্ষ দায় সেরেছে।
সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো মেধাবী, সৎ ও যোগ্য প্রার্থী বাছাইয়ে নিয়োগ পরীক্ষার আয়োজন করে। অথচ বিভিন্ন পর্যায়ে দুর্নীতির কারণে অসৎ ও দুর্নীতিপরায়ণরা সুযোগ নিচ্ছেন। তাহলে এমন পরীক্ষা আয়োজনের কী প্রয়োজন আছে? আমরা দেখতে পাচ্ছি প্রশ্নফাঁস ও অনিয়ম দুর্নীতি করা হচ্ছে সরকারি প্রভাব কাজে লাগিয়ে। একই কারণে এসব অপরাধের হোতাদের বিচারও হচ্ছে না। গোয়েন্দা পুলিশ এভাবে একটির পর একটি চক্রকে পাকড়াওয়ের পরও প্রশ্নফাঁস বন্ধ হচ্ছে না। সরকারের পক্ষ থেকে প্রথমে একটি নীতিগত অবস্থান নেয়া প্রয়োজন। এসব অপরাধ যারাই করুন; দল-মত নির্বিশেষে তাদের সবার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার পথ উন্মুক্ত করতে হবে। তাহলে চক্রের হোতারা এমন অপরাধ করতে সাহস পাবে না। নতুন নতুন অপরাধী চক্রও গড়ে উঠবে না।


আরো সংবাদ


premium cement