১৯ জানুয়ারি ২০২২
`
এসএসসিতে বিপুল পরীক্ষার্থী অনুপস্থিত

শিক্ষাব্যবস্থায় অশনিসঙ্কেত

-

করোনায় আমাদের দেশে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত খাতগুলোর মধ্যে শিক্ষা অন্যতম। মহামারীর কারণে দীর্ঘ দিন দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর সম্ভাবনাময় শিক্ষাজীবনের করুণ সমাপ্তি ঘটেছে; বিশেষ করে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে যেটি জাতীয় জীবনে অপূরণীয় ক্ষতি। এ ক্ষতি কবে নাগাদ কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে; বলা মুশকিল। দেখা যাচ্ছে, দেশে মাধ্যমিক পর্যায়ের বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী শিক্ষাজীবন থেকে ঝরে পড়ায় এবারের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় অনুপস্থিতি। একটি সহযোগী দৈনিকের এক প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
নির্ধারিত সময়ের অনেক পরে চলতি বছর এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা ১৪ নভেম্বর শুরু হয়ে ২৩ নভেম্বর শেষ হয়েছে। শিক্ষা বোর্ডগুলো সূত্রে জানা যায়, ২০২১ সালে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় সারা দেশের মোট ২২ লাখ ২৭ হাজার ১১৩ পরীক্ষার্থীর অংশ নেয়ার কথা ছিল। তাদের মধ্যে সেকেন্ডারি স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষায় ১৮ লাখ ৯৯৮ জন, দাখিলে তিন লাখ এক হাজার ৮৮৭ জন এবং ভোকেশনালে এক লাখ ২৪ হাজার ২২৮ জন রেজিস্ট্রেশন করেছিল। পরীক্ষার কন্ট্রোল রুমের পাঠানো তথ্য অনুসারে, মাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশ নেয়ার জন্য নিবন্ধন করেও এবার সারা দেশের মোট ৭৮ হাজার ৬২৭ জন পরীক্ষার্থী কেন্দ্রে অনুপস্থিত ছিল।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে টানা দীর্ঘ ছুটি থাকায় এবার সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় এসএসসি ও সমমানের। কেবল নৈর্বাচনিক তিনটি বিষয়ের পরীক্ষা দিতে হয়েছে শিক্ষার্থীদের। আবশ্যিক পরীক্ষা এ বছর নেয়া হয়নি। তবু এই বিশালসংখ্যক ছাত্রছাত্রী পরীক্ষায় অংশ নেয়নি। কী কারণে তাদের পরীক্ষা দেয়া হয়ে ওঠেনি, তার কারণ অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে দেশের শিক্ষা খাতের নির্মম বাস্তবতার নানা চিত্র। করোনার অভিঘাতে কর্মক্ষেত্রে আয়ের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ায় চরম অর্থসঙ্কটে বিপুল জনগোষ্ঠী। এসব পরিবার করোনায় অর্থনৈতিকভাবে যে ক্ষতির শিকার হয়েছে তা এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অবস্থা যে বড়ই করুণ, তা বোঝা যায় খোদ সরকারি হিসাবেই। বাংলাদেশে নতুন করে আড়াই কোটির মতো মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে। আগে ছিল আরো আড়াই কোটি। সব মিলিয়ে দেশে দরিদ্রের সংখ্যা প্রায় পাঁচ কোটি। এই বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবনমান নেমে যাওয়ায় তারা ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়ার সামর্থ্য হারিয়েছে। পরিণামে, মাধ্যমিকেই পৌনে এক লাখের বেশি শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন হারিয়েছে, যা আগে কখনো দেখা যায়নি।
দারিদ্র্যের কারণে করোনাকালে বিপুলসংখ্যক মেয়ে পরীক্ষার্থীকে বিয়ে দিয়েছেন অভিভাবকরা। উঠতি বয়সী মেয়েকে ঘরে বসিয়ে রাখা ‘নিরাপদ নয়’ ভেবে ভালো সম্বন্ধ পেয়ে অভিভাবক তাদের কন্যাশিশুদের বিয়ে দিয়েছেন। দ্বিতীয় যে কারণটি উঠে এসেছে, তা হলোÑ ছাত্রছাত্রীদের অনেককে জীবিকার সন্ধানে পড়াশোনা ছেড়ে যোগ দিতে হয়েছে নানা কাজে। করোনায় দীর্ঘ দিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় ছাত্ররা বিভিন্ন পেশায় জড়িয়ে পড়েছে। দারিদ্র্য ও বাল্যবিয়ে এসব শিক্ষার্থীর পরীক্ষার হলে অনুপস্থিত থাকার মূল কারণ।
বহু দিনের প্রচেষ্টায় দেশ থেকে বাল্যবিয়ে এবং দারিদ্র্যের অভিশাপ কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছিল; কিন্তু করোনাকালে প্রান্তিক পরিবারে আয় কমে যাওয়ায় অভিভাবকরা তাদের কন্যাসন্তানদের বাল্যবিয়ে দিয়ে ভরণপোষণের দায় থেকে মুক্ত হতে চেয়েছেন। ছাত্ররাও শিশু বয়সে জড়িয়ে পড়েছে শ্রমে। এটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থার জন্য একধরনের অশনিসঙ্কেত। এ থেকে উত্তরণের পথ হলোÑ সবার আগে দরকার দেশে কসমেটিক উন্নয়নের পরিবর্তে দ্রুত আয়বৈষম্য কমিয়ে এনে অর্থনৈতিক ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা। তা হলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়বে এবং তারা তাদের সন্তানদের আবার বিদ্যালয়ে পাঠানোর ব্যাপারে আগ্রহী হবেন।


আরো সংবাদ


premium cement