২৮ নভেম্বর ২০২১, ১৩ অগ্রহায়ন ১৪২৮, ২২ রবিউস সানি ১৪৪৩ হিজরি
`
সরকারের ওপর অযৌক্তিক চাপ প্রয়োগ

প্রয়োজন আফগান নাগরিকের দুর্দশা লাঘব

-

বিগত ৪০ বছরের বেশি সময় ধরে আফগানিস্তান বিশ্বের একটি ট্র্যাজেডি। তার আগেও আফগানিস্তান বিপর্যস্ত হয়েছে। তবে চার দশক ধরে বিরতিহীন একের পর এক আগ্রাসনের শিকার হয়েছে দেশটি। এই সময় দেশটির সাধারণ মানুষ একদণ্ডের জন্যও স্বাভাবিক জীবনযাপনের সুযোগ পায়নি। এর মূল কারণ আফগানিস্তানের জনগণের সমস্যা সমাধানের পরিবর্তে বহিঃশক্তিগুলো অনেক বেশি নিজেদের স্বার্থ হাসিলে তৎপর ছিল। সর্বশেষ আক্রমণকারী আমেরিকা পরাজিত হয়ে পাততাড়ি গুটিয়ে নেয়ার পরও দেশটিতে আশু শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বড় শক্তিগুলো আজো একই ধরনের নীতি অবলম্বন করে আসছে। দারিদ্র্যপীড়িত মানুষেরা সে দেশে কঠিন অবস্থার মধ্যে রয়েছেন। এসব মানুষের সাহায্য সহযোগিতার বদলে বহিঃশক্তিগুলো অনেক বেশি তৎপর আফগানদের রাষ্ট্র ও সরকারব্যবস্থা নিয়ে। তারা মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলো মেটাতে সাহায্য দেয়ার ক্ষেত্রে শর্ত আরোপ করতে চায়।
আফগানিস্তানের বর্তমান শাসক তালেবানদের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলো নানা মাত্রায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে রেখেছে। আফগান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিপুল অর্থ যুক্তরাষ্ট্র ‘ফ্রিজ’ করে দিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাদের দাতব্য কর্মকাণ্ড অনেকটাই বন্ধ করে হাত গুটিয়ে বসে আছে। গত মঙ্গলবার প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয়দের একটি যৌথ গ্রুপ কাতারে তালেবান প্রতিনিধিদের সাথে বৈঠক করেছে। সেখানে ইইউ-এর পক্ষ থেকে ১২০ কোটি মার্কিন ডলারের সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তারা। কিন্তু এসব সাহায্য তারা সরকারের বদলে নিজস্ব বিকল্প পন্থায় সরবরাহ করতে চান। তালেবান সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকি বৈঠকে বলেছেন, আফগান সরকারকে দুর্বল করা উচিত নয়। এর ফলে কোনো ধরনের ইতিবাচক কিছু হবে না। ব্যাংক কার্যক্রম সক্রিয় করা, দাতব্য কার্যক্রম বেগবান এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে সহযোগিতা করার জন্য এক বিবৃতিতে তিনি আহ্বান জানান। মোট কথা, পরিস্থিতি এখনো কোনোভাবে আফগান জনগণের অনুকূলে নয়।
আফগান জনগণের ওপর যে বিপর্যয় নেমে এসেছে এর জন্য বহিঃশক্তি বড় দাগে দায়ী। প্রথমে সোভিয়েত ইউনিয়ন, পরে আমেরিকা দেশটিতে সামরিক অভিযান চালিয়ে তছনছ করে দিয়েছে। এর ফলে দেশটির বিপুল জনগোষ্ঠী পাশের পাকিস্তান ও ইরানে আশ্রয় নেয়। মোট মিলিয়ে রেজিস্টার্ড উদ্বাস্তু ২৬ লাখ। এদের মধ্যে দেশ দু’টি আশ্রয় দিয়েছে ২২ লাখ। সেই হিসাবে আফগান ট্র্যাজেডির সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্ত দেশ পাকিস্তান ও ইরান।’ মধ্য এশিয়ার সাথে আফগানিস্তানের দীর্ঘ সীমান্ত থাকলেও সেখানকার দেশগুলো উদ্বাস্তু হওয়া মানুষকে গ্রহণ করেনি। দেশের অভ্যন্তরে প্রায় ৩৫ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। এই বিপুল উদ্বাস্তু গোষ্ঠীকে নিজ বাসভূমে ফেরানোর উদ্যোগটি এখনো গ্রহণ করা হয়নি।
দেশটির ভেতর প্রধানত মৌলিক চাহিদার বিরাট সঙ্কট চলছে। এটি মূলত খাদ্য ও চিকিৎসাকেন্দ্রিক। পশ্চিমা দেশগুলো দাতব্য কাজে এগিয়ে না এসে যেভাবে অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করার চেষ্টা করছে সেটি যুক্তিযুক্ত নয়। আফগানিস্তানের শাসনপ্রক্রিয়া কেমন হবে সেটি তারা নিজেরা ঠিক করে নিতে পারবে। একজন মানুষের জীবন বাঁচানোর চেয়ে শাসন কাঠামো বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে না। আমরা মনে করি, আগে আফগান জনগণের দুঃখ-দুর্দশা লাঘবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আন্তরিক হতে হবে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে সেগুলো নিয়ে তারা আরো বেশি দরকষাকষি করতে পারে। তালেবানকে দুর্বল করে দিলে তার বিকল্প সেখানে থাকতে হবে। কিন্তু সেটি আপাতত দেখা যাচ্ছে না। তাই বিদ্যমান অবস্থায় সবাইকে আফগান জনগণের পাশে দাঁড়ানো উচিত।



আরো সংবাদ