০৪ ডিসেম্বর ২০২১, ১৯ অগ্রহায়ন ১৪২৮, ২৮ রবিউস সানি ১৪৪৩ হিজরি
`
কিডনি বেচাকেনার ‘দোকান’

সমূলে ধ্বংস করতে হবে

-

অর্থের জন্য মানুষ কত নিচে নামতে পারে তার সর্বশেষ নমুনা শাহরিয়ার ইমরান আহম্মেদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা কিডনি পাচারচক্রের অপকর্ম। ‘বাংলাদেশ কিডনি ও লিভার পেশেন্ট চিকিৎসাসেবা’ ও ‘কিডনি-লিভার চিকিৎসাসেবা’ নামে দু’টি ফেসবুক পেজের মাধ্যমে ইমরানচক্র মানবতাবিরোধী এ কারবার চলাত। গড়ে তোলে ১৫-২০ জনের শক্তিশালী চক্র। তবে শেষ রক্ষা হয়নি। চক্রের নেতা ইমরানসহ পাঁচ সদস্যকে গ্রেফতার করেছে র্যাব। গ্রামের অভাবী মানুষজনকে নিশানা করে অর্থের লোভ দেখিয়ে কম দামে কিডনি কিনে ১০ গুণ বেশি দামে বিক্রি করত চক্রটি। দেশের পাশাপাশি বিদেশেও কিডনি পাচারে সক্রিয় ছিল। কিডনি কেনাবেচা করে কামিয়েছে বিপুল অঙ্কের টাকা। কয়েক বছরে শতাধিক ব্যক্তিকে প্রতিবেশী দেশে নিয়ে কিডনি বিক্রির মতো জঘন্য অপকর্ম করেছে চক্রটি। এর আগে ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) কিডনি পাচার চক্রের অন্যতম হোতা তারেক আজিম ওরফে বাবুল চৌধুরীকে গ্রেফতার করেছিল। তখন পাদপ্রদীপের আলোয় আসে প্রতিবেশী দেশে কিডনি পাচারের ঘটনা। ওই সময় বাবুল চৌধুরী বলেছিল, ২০০৬ সালে এক আত্মীয়ের জন্য কিডনি চেয়ে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দেন। দেখতে পান, হতদরিদ্র অনেকে কিডনি বিক্রি করতে সাড়া দিচ্ছেন। এর পরই কিডনি কেনাবেচার মতো অবৈধ কারবারে জড়িয়ে পড়েন। বাবুলকাণ্ডের এক দশক পর ইমরান চক্রের সন্ধান পেল আইনশৃঙ্খলাবাহিনী।
গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে র্যাব কর্মকর্তারা বলেছেন, ১৫ থেকে ২০ জনের চক্রটি চারটি ধাপে কিডনিদাতাদের সংগ্রহ থেকে শুরু করে রোগীর দেহে প্রতিস্থাপন পর্যন্ত কাজ করত। প্রতিটি কিডনির জন্য রোগীর কাছ থেকে ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা নিত। চক্রের হোতা ইমরান প্রতিটি কিডনি প্রতিস্থাপনে নিজেই নিত পাঁচ থেকে ১০ লাখ টাকা। বাকি টাকা অন্যদের ভাগবাটোয়ারা করে দিত। আর দাতাকে অগ্রিম দুই লাখ টাকা দিয়ে কিডনি প্রতিস্থাপন শেষে প্রতিশ্রুত অর্থ না দিয়ে ভয়ভীতি দেখাত।
চক্রটি মানবিকতার দোহাই দিয়ে কিডনিদাতাদের সংগ্রহ করত। বলত, নিজের আত্মীয়ের কিডনি লাগবে। এতে দাতা ও গ্রহীতা দু’জনেরই জীবন রক্ষা পাবে। দাতা অনেক টাকাও পাবে। এ ছাড়া কোনো সমস্যা হলে আজীবন পাশে থাকার প্রতিশ্রুতিও দিত; কিন্তু তারা কিডনি নেয়ার পর কেটে পড়ত। ২০১১ সালে বাবুল যখন গ্রেফতার হয়, তখন সে বলেছিল, প্রতিবেশী দেশ ছাড়াও ঢাকায় বেশ কয়েকটি হাসপাতালে গোপনে কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয়। আর এখন ফেসবুকেই কিডনি কেনাবেচার ‘দোকান’ খুলে বসেছে অপরাধী চক্র।
দেশে মানবদেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন আইন-১৯৯৯-এর ৯ ধারায় অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিক্রি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এ আইন অনুযায়ী, কেউ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিক্রি বা ক্রয় বা সহায়তা করলে সর্বনিম্ন তিন বছর থেকে সর্বোচ্চ সাত বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ড এবং কমপক্ষে তিন লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার বিধান রয়েছে। শাস্তির বিধান অপরিবর্তিত রেখে ২০০৯ সালে ভ্রাম্যমাণ আদালত আইনেও এটি সংযোজন করা হয়।
আমরা মনে করি, যারা মানবদেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কেনাবেচার মতো জঘন্য কারবার করে; তারা আসলে মানবতাবিরোধী অপরাধ করছে। এ ক্ষেত্রে নিশানা করা হচ্ছে দরিদ্র অসহায় মানুষজনকে। দারিদ্র্যের অসহায়ত্বকে কিডনি কারবারি হোতারা তাদের অর্থ উপার্জনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। তাদের এমন জঘন্য কারবারের সব নেটওয়ার্ক সমূলে ভেঙে দিতে হবে। একই সাথে জড়িত সবাইকে গ্রেফতার করে আইনের আওতায় এনে শাস্তির মুখোমুখি দাঁড় করাতে হবে। এ ক্ষেত্রে যেন আইনের মারপ্যাঁচে কেউ ছাড়া পেয়ে না যায়।

 



আরো সংবাদ