০৯ ডিসেম্বর ২০২১
`
রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে প্রচারণা নয়

অধিকার আদায়ের পথ করে দিন

-

কোনো জাতিগোষ্ঠীকে নিশ্চিহ্ন করার প্রধান কৌশল হলো নেতৃত্বশূন্য করা। মিয়ানমারের সামরিক জান্তা রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে অত্যন্ত ঠাণ্ডামাথায় ঠিক সেই কাজটিই করেছে। রোহিঙ্গা নেতৃত্বকে ধারাবাহিকভাবে নির্মূল করেছে। আরাকান থেকে সমূলে যখন উচ্ছেদ করা হচ্ছিল তাদের কোনো প্রতিষ্ঠিত নেতা সেখানে ছিল না। এমন একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিও ছিলেন না যিনি রোহিঙ্গাদের বিষয়ে মুখপাত্রের ভূমিকা পালন করতে পারেন। তাদের মধ্যে কোনো রাজনৈতিক দলও ছিল না, যে দল রোহিঙ্গা জনমতের ইচ্ছা আকাক্সক্ষা ও স্বার্থের প্রতিফলন ঘটাবে। তবে কিছু রাজনৈতিক গোষ্ঠীর নাম শোনা যায়, যাদের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি নেই। এই রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলো রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর উপকার দূরে থাক, তাদের উৎখাতের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। রোহিঙ্গাদের দফায় দফায় সামরিক অভিযান চালিয়ে তাড়িয়ে দেয়ার পেছনে মিয়ানমার বরাবর ওই সব রাজনৈতিক গোষ্ঠীকে ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে উল্লেখ করে পূর্ণ ফায়দা নিয়েছে।
সম্প্রতি রোহিঙ্গাশিবিরে খুন হয়েছেন তাদের নেতা মোহাম্মদ মুহিবুল্লাহ। ২০১৭ সালে উদ্বাস্তু হিসেবে আসার পর তিনিই রোহিঙ্গাদের পক্ষে কথা বলেছেন। নেতৃত্বশূন্যতার মধ্যে স্বল্প সময়ে তিনি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে রোহিঙ্গাদের মুখপাত্র হয়ে উঠছিলেন। একটি নিপীড়িত জাতির জন্য ঠিক যেমন নেতা দরকার তার ভূমিকা ছিল তেমনি। রোহিঙ্গারা নিজেদের কথা বলতে ও সাহায্য সহযোগিতা পেতে তাকে পেয়েছিলেন একজন আস্থাশীল ব্যক্তি হিসেবে। তাকেই খুন করা হলো। এখন রোহিঙ্গাশিবিরে বিবদমান দলের তৎপরতার খবর মিলছে। তারা অন্তর্কলহে লিপ্ত। এ ধরনের অপতৎপরতা রোহিঙ্গা স্বার্থ হাসিল ও বাংলাদেশ উভয়ের জন্য ক্ষতিকর। অন্য দিকে এর মাধ্যমে সহজে লাভবান হবে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর জেনোসাইড স্টাডিজ রোহিঙ্গাদের নিয়ে কাজ করছে। তাদের কাজের অংশ হিসেবে রোহিঙ্গাশিবিরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে। তাতে দেখা যাচ্ছে, গত চার বছরে টেকনাফ ও উখিয়ার রোহিঙ্গাশিবিরগুলোতে ১০৮ জন নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৭৮ জনকে অতর্কিত হামলা করে খুন করা হয়। বিবদমান পক্ষগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ ও গোলাগুলিতে প্রাণ হারায় ২২ জন। বিভিন্ন ঘটনায় বাকিদের ছয়জন খুন হন। রোহিঙ্গাশিবিরের মধ্যে রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আরাকান রোহিঙ্গা সালভেশন আর্মি (আরসা), রোহিঙ্গা সলিডারিটি অরগানাইজেশন (আরএসও) ও ইসলামী মাহাতের নাম শোনা যাচ্ছে। এ সংগঠনগুলো চিহ্নিত করা হচ্ছে সন্ত্রাসী হিসেবে। এগুলো শক্তি অর্জন করে সেটি একে অপরের বিরুদ্ধে ব্যবহার করছে। প্রশ্ন হচ্ছে, রোহিঙ্গাদের মধ্যে যখন কোনো রাজনৈতিক শক্তি দানা বাঁধতে দেয়া হচ্ছে না, তাদের সম্মিলিত কণ্ঠস্বরকে জাগিয়ে দেয়ার সুযোগ দেয়া হচ্ছে না, তখন এ ধরনের সংগঠনের নামে প্রচারণাকে উসকে দেয়া যাচ্ছে। যেসব প্রচারণা রোহিঙ্গা স্বার্থকে লুণ্ঠিত করে।
খবরে প্রকাশ, রোহিঙ্গাশিবিরে অপহরণ, ধর্ষণ, ডাকাতি, মাদক চোরাচালানসহ আরো নানা অপরাধ দিন দিন বাড়ছে। অবহেলিত বঞ্চিত উৎখাত হওয়া সম্প্রদায় হিসেবে রোহিঙ্গারা নিরীহ। সামান্য অনুগ্রহ পাওয়ার আশায় সবসময় বিনীত। এমনকি রোহিঙ্গারা জাতিগতভাবে দুষ্কৃতকারী নয়। মূলত শিবিরগুলোতে এমন পরিস্থিতির তৈরি হয়েছে, ফলে তারা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। অপরাধজগতে প্রবেশে সবসময় সেখানে দরজা খোলা। চোরাচালান চক্রসহ বিভিন্ন মন্দ লোক তাদের এ ধরনের কাজে জড়িত করছে। সরকারের উচিত হীনস্বার্থ অর্জনকারীদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া।
বাংলাদেশ সরকারকে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে রোহিঙ্গা ইস্যু মোকাবেলা করতে হবে। রোহিঙ্গাদের ভেতর রাজনৈতিক সচেতনতার উত্থান খারাপ কিছু নয়। এটা তাদের অধিকার আদায়ে জরুরি। তবে আরসা ও আরএসওর মতো নানা গোপন সংগঠনের তৎপরতা বন্ধ করতে হবে। এগুলো মূলত মিয়ানমারের সুবিধা লাভের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বরং বাংলাদেশের উচিত রোহিঙ্গাদের ভেতর গোপন সংগঠিত রাজনৈতিক কোনো সংগঠন থাকলে প্রকাশ্যে নিয়ে আসা। বৈধতা দিয়ে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর অধিকার আদায়ে অবদান রাখার পথ করে দেয়া।

 


আরো সংবাদ