০৯ ডিসেম্বর ২০২১
`
বিশ্বনেতাদের গোপন তথ্য ফাঁস

বাংলাদেশের কারো নাম আসেনি

-

বিশ্বের নামীদামি ব্যক্তিদের আর্থিক কেলেঙ্কারির তথ্য আবারও ফাঁস হয়েছে। এবার ফাঁস হওয়া এসব নথির নাম দেয়া হয়েছে ‘প্যান্ডোরা পেপারস’। অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের আন্তর্জাতিক সংস্থা আইসিআইজের প্রকাশিত এই রিপোর্ট যথারীতি আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। যেমনটা করেছিল ২০১৬ সালে এই সংস্থারই প্রকাশিত পানামা পেপারস। বলা হচ্ছে, এক কোটি ১৯ লাখ নথি বিশ্লেষণ করে এসব তথ্য প্রকাশ করেছে ওয়াশিংটন-ভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল কনসোর্টিয়াম অব ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্টস (আইসিআইজে)।
তদন্তে বিখ্যাত ব্যক্তিদের বিদেশী প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ, ছদ্মবেশী ব্যাংক অ্যাকাউন্টসহ বিভিন্ন গোপন আর্থিক লেনদেনের তথ্য উন্মোচিত হয়েছে। বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, ধনী ও প্রভাবশালীদের গোপন অর্থ লেনদেনের তথ্য ফাঁস হয়েছে। করস্বর্গ হিসেবে পরিচিত পানামা, দুবাই, মোনাকো, সুইজারল্যান্ড ও ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডের মতো দেশ ও অঞ্চলের কোম্পানিতে বিভিন্ন দেশের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঞ্চিত অর্থ ও গোপন লেনদেনের তথ্য ফাঁস করে দিয়েছে সংস্থাটি। বিশ্বনেতা ও তারকাদের কে কে বিদেশে নিজেদের নাম-পরিচয় গোপন করে ব্যক্তিগত উড়োজাহাজ, বাড়ি, ইয়াট ইত্যাদি কিনেছেন, তারও তথ্য আছে। এমনকি এতে বিখ্যাত শিল্পীদের (পিকাসো, বাঙ্কসি) চিত্রকর্মের গোপন মালিকদের তথ্যও আছে।
প্যান্ডোরা পেপারসে বিশ্বনেতাদের পাশে নাম এসেছে ভারতীয় ক্রিকেট কিংবদন্তি শচীন টেন্ডুলকারেরও। এসেছে পপ তারকা শাকিরা, সুপার মডেল ক্লদিয়া শিফারের নামও। এমনকি ইতালির কুখ্যাত মাফিয়া ডন রাফায়েল আমাতোও আছেন।
জর্দানের বাদশাহ ছাড়াও এই তালিকায় রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন, যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার, আজারবাইজানের প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিয়েভ ও চেক প্রজাতন্ত্রের প্রধানমন্ত্রী আন্দ্রে বাবিসের মতো নেতাদের নাম এসেছে। ফাঁস হওয়া তথ্যে ১৩০ জনেরও বেশি ধনকুবের রয়েছেন, সেই সাথে আছেন সেলিব্রিটি, রক স্টার, খেলোয়াড় ও ব্যবসায়ী নেতাদেরও নাম। এসেছে ৭০০ জনের বেশি পাকিস্তানির নাম। তাদের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের মন্ত্রিসভার সদস্যসহ ঘনিষ্ঠ লোকজন রয়েছেন। সামরিক নেতাদের নামও এসেছে। যদিও প্রতিবেদনে স্পষ্ট করেই বলা হয়েছে, ইমরান খান নিজে কোনো অফশোর কোম্পানির মালিকÑ এমন তথ্য পাওয়া যায়নি।
লক্ষণীয় বিষয় হলো, বিশ্বের বহু দেশের শীর্ষনেতাদের নাম উঠে এলেও রিপোর্টে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে মুসলিম দেশগুলোর নেতাদের ওপর। জর্দানের বাদশাহর বিষয়টি সবিস্তারে তুলে আনা হয়েছে। পাকিস্তান পেয়েছে বিশেষ গুরুত্ব। টনি ব্লেয়ার বা পুতিনের ব্যাপারে বিস্তারিত না দিয়ে আনা হয়েছে আজারবাইজানের প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিয়েভের নামটি, যিনি নিজের দেশে রীতিমতো হিরো। এ রহস্য হয়তো ক্রমে উন্মোচিত হবে।
বাংলাদেশের কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নাম আসেনি প্যান্ডোরা পেপারসে। যে দেশ দুর্নীতিতে বিশ্বের অন্যতম সেরা সেই দেশের কারো নাম তালিকায় না থাকা শুধু বিস্ময়কর নয়, রহস্যজনকও। ২০১৬ সালে প্রকাশিত পানামা পেপারসে কিন্তু বাংলাদেশের ৩৪ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নাম ছিল। তার মধ্যে ছিল ক্ষমতাসীন দলের সাথে ঘনিষ্ঠ কিছু নামও। এ নিয়ে তখন দেশে তোলপাড় হলেও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কোনো তদন্ত হয়েছে এমন নয়। তবে এটি নিশ্চিত যে, ইতোমধ্যে দেশে দুর্নীতি যেমন বেড়েছে, তেমনি হাজার হাজার কোটি টাকা তসরুপ ও পাচারের খবর প্রকাশ পেয়েছে। মানিলন্ডারিংয়ের অভিযোগ বিস্তর।
খোদ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন তথ্য প্রকাশ করেন যে, বাংলাদেশ থেকে কানাডায় টাকা পাচারের বিষয়ে কিছু সত্যতা তিনি পেয়েছেন। ২০২০ সালের নভেম্বরে তিনি বলেন, মনে করেছিলাম অর্থপাচারে জড়িতদের মধ্যে রাজনীতিকের সংখ্যা বেশি হবে; কিন্তু দেখা গেল, সরকারি কর্মচারীর সংখ্যা বেশি। এ ছাড়া কিছু ব্যবসায়ী আছেন। তিনি ২৮টি মানিলন্ডারিংয়ের ঘটনার তথ্য পেয়েছেন বলে তখন জানান। বিস্ময়কর হলেও সত্য, এসব বিষয়ে দুদক বা রাষ্ট্রীয় অন্য কোনো সংস্থাকে তদন্তের দায়িত্ব সরকারিভাবে দেয়া হয়নি। তখনকার দুদক চেয়ারম্যান বলেছিলেন, কানাডায় কারা বিনিয়োগ করেছেন, সে সম্পর্কে খোঁজ দিতে কমিশন আগেই মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছিল। তথ্য পেলেই তিনি তদন্ত শুরু করবেন। এরপর আর কোনো অগ্রগতি আমরা দেখিনি।
টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান ওই সময় বিবিসিকে বলেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কথায় প্রমাণিত যে, দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ পাচারের অভিযোগ সত্য।

 


আরো সংবাদ