০১ ডিসেম্বর ২০২১, ১৬ অগ্রহায়ন ১৪২৮, ২৫ রবিউস সানি ১৪৪৩ হিজরি
`
শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতি

নৈতিকতা বলে কিছু থাকছে না

-

আমাদের সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে দুর্নীতি ছড়িয়ে আছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও তার বাইরে নয়। তবে ব্যাপ্তিটা বাইরে থেকে টের পাওয়া যায় না। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) গবেষণায় দেখা গেল সেই ভয়াবহ চিত্র। মাধ্যমিক শিক্ষা কার্যক্রম বাস্তবায়নবিষয়ক এক প্রতিবেদনে টিআইবি জানাচ্ছে, এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে (স্কুল ও কলেজ) অধ্যক্ষ, প্রধান শিক্ষক ও সহকারী প্রধান শিক্ষক নিয়োগে অবাধে চলছে ঘুষবাণিজ্য। হচ্ছে বড় অঙ্কের টাকার লেনদেন। এসব পদের বিপরীতে ঘুষ দিতে হচ্ছে সাড়ে তিন লাখ থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত। সেই ঘুষের টাকা নিচ্ছেন স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, স্কুল ম্যানেজিং কমিটি ও কলেজের গভর্নিং বডির (জিবি) সাথে সংশ্লিষ্টরা।
টিআইবির প্রতিবেদনে বলা হয়, বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানে এমপি বা প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তির হস্তক্ষেপে সভাপতি মনোনীত করা হয়। ফলে অনেকাংশে যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনায় সম্পৃক্ত হতে পারেন না, যা শিক্ষার মানোন্নয়নে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। কমিটির সভাপতি/সদস্য হওয়ার ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতার বাধ্যবাধকতা না থাকায় ক্ষেত্রবিশেষে অক্ষরজ্ঞানহীন ব্যক্তিও কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত হন। এতে করে শিক্ষকদের সাথে কমিটির সদস্যদের কার্যক্রম পরিচালনায় বিভিন্ন সমস্যা ও দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। বিষয়টি সহজবোধ্য। কারণ এমপি বা রাজনৈতিক নেতারা দলীয়করণের ঊর্ধ্বে উঠে যোগ্যতম ব্যক্তিকে মনোনয়ন দেবেন, বর্তমান ক্ষমতাসীনদের কাছে সেটি আশা করার কোনো কারণ নেই। তাদের কাছে শিক্ষার মান বা অগ্রগতির চেয়ে দলীয় প্রভাব বজায় রাখা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তার চেয়েও বড় কথা যেখানে অর্থের লেনদেন মুখ্য হয়ে ওঠে সেখানে অন্য কোনো বিবেচনাই আমলে নেয়া হয় না।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) সুপারিশ নিয়ে একজন সহকারী শিক্ষককে নিয়োগ পেতে ৫০ হাজার থেকে সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা পর্যন্ত দিতে হয়। সহকারী গ্রন্থাগারিক পদে নিয়োগ পেতে দিতে হয় দুই থেকে সর্বোচ্চ তিন লাখ টাকা। এই অর্থ যায় এনটিআরসিএর কর্মকর্তাদের পকেটে।
দুর্নীতির রাহুগ্রাসে নিমজ্জিত একটি সমাজে এ বাস্তবতা অস্বীকারের উপায় নেই। কিন্তু ভাবার বিষয় এই যে, ঘুষ দিয়ে যে শিক্ষক নিয়োগ পাচ্ছেন, তার কাছে শিক্ষার্থীরা কী শিখবে। অনৈতিক উপায়ে কর্মজীবন শুরু করা একজন মানুষ কিভাবে শিক্ষার্থীদের নৈতিকতার পাঠ দেবেন? দিলেও সেটি ছাত্রছাত্রীদের কতটুকু প্রেরণা সঞ্চার করবে? কারণ নীতিনৈতিকতাহীন যেকোনো মানুষের দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড, কথাবার্তা, আচরণ এমনকি প্রতিটি অঙ্গভঙ্গির মধ্যেও অজান্তেই দূষিত চরিত্রের কিছু না কিছু প্রতিফলন ঘটবেই। সেটি শিক্ষার্থীরা সহজাত বিচার-বুদ্ধির মাধ্যমেই উপলব্ধি করতে পারবে। এর ফল হবে এই যে, যেসব শিক্ষার্থী ঘরে বাবা-মার কাছ থেকে নৈতিকতার শিক্ষা পাবে না তারা শিক্ষকের চরিত্র অনুসরণ করে বেড়ে উঠবে। কারণ বাবা-মার পরই শিক্ষার্থীদের কাছে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ও অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব হলেন তার শিক্ষক।
এ জন্যই শিক্ষকদের মধ্যে অনৈতিকতার বিস্তার চরম উদ্বেগের, হতাশার। বিষয়টি যেহেতু অনেক দিন ধরেই চলে আসছে তাই অনৈতিকতা ছড়িয়ে গেছে সর্বত্র। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সদ্য বিদায়ী একজন ভিসির যেসব অনৈতিক কর্মকাণ্ডের কাহিনী দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে সেটি তো দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। অন্য আরো কিছু সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিরাও প্রায় একই রকম দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন। সবই নৈতিকতার ভয়াবহ অবক্ষয়ের নমুনা তুলে ধরে। দুর্নীতিতে বিশ্বের অন্যতম একটি দেশ হিসেবে বাংলাদেশে শিক্ষকদের পক্ষে দুর্নীতির বাইরে অবস্থান করে শতভাগ সৎ থাকা আদৌ সম্ভব কি না তা আমাদের জানা নেই। তবে আমাদের চার পাশেই এমন বহু দৃষ্টান্ত আছে, জীবন বাজি রেখেও মানুষ শতভাগ সৎ থেকেছেন। সমাজে এমন মানুষেরও অভাব নেই যারা খেয়ে, না খেয়ে পরিবার পরিজন নিয়ে কষ্ট করছেন; কিন্তু দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েননি। তাই শিক্ষকদের কাছে ন্যূনতম সততা আশা করা নিশ্চয়ই বাড়তি চাওয়া নয়।



আরো সংবাদ